স্বপ্নযাত্রা

দেশের ১৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেধেব তারেক রহমান শপথ নিয়েছেন গতকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর সূচনা হলো তার প্রথম সরকারের যাত্রা। আমরা এ যাত্রাকে ‘স্বপ্নযাত্রা’ হিসেবে দেখছি। কেননা, বিগত সরকারের আমলে তিনি নির্যাতিত হয়েছিলেন। দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। সেই থেকে তিনি বিদেশে, লন্ডনেই অবস্থান করেছেন। ১৬ বছরের নির্বাসিত জীবনে জনগণের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। বিশেষ করে গ্রামবাংলার তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। মা খালেদা জিয়া দেশে নির্মম নির্যাতন ও জেল খাটতে খাটতে এমন এক আপসহীন নেতৃত্বের ইমেজ সৃষ্টি করেছিলেন, যা তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতীয় নেতার মর্যাদা লাভ করে। আর স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শহীদ জিয়ার যে অমর ইমেজ সৃষ্টি হয়েছে, তারই আরেক ধাপ তারেক রহমানের নেতৃত্বে এবারকার নির্বাচনে ২০৯ আসনে বিজয় প্রমাণ করে, তৃণমূলের মানুষের মনে তারা কেমনভাবে বেঁচে আছেন।

আপাতত মনে হতে পারে, তারেক রহমান পারিবারিক ক্ষমতার রশি ধরে জনগণের রায় পেয়েছেন। সাদা চোখে সেটাই মনে হতে পারে। তবে, জিয়া থেকে খালেদা জিয়া যেমন তিলে তিলে নিজেকে সৃষ্টি করে এগিয়েছেন, তেমনি তারেক রহমান মায়ের ক্ষমতার হাত ধরে দলের নেতৃত্বে আসেননি। দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে, সহকারী মহাসচিব, সিনিয়র মহাসচিব, তারপর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিটি ধাপেই ছিলেন একজন ইনোভেটিভ কর্মী। এই কর্মোদ্দীপনাই তার রাজনৈতিক পুঁজি। সেই পুঁজির আশি ভাগই ইতিবাচক। গণমানুষের প্রতি কমিটেড এবং তাদের জীবনকে উন্নয়ন ধারায় স্নাত করা যায় কীভাবে, সেই পরিকল্পনায় থাকতেন ব্যস্ত। তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে হাত লাগিয়ে কাজ করার যে প্রেরণা, তা তিনি ইনহ্যারিট করেছেন বাবা ও মায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষা থেকে। তার এই প্রীতি মানুষের প্রতি দায়িত্ব তাকে এই নতুন যাত্রার প্রধান মাল্লায় পরিণত করেছে। সরকার নামক তরণীকে যোগ্যতার সঙ্গে চালনা করা অনেক কষ্টের, কারণ বিক্ষুব্ধ জলতরঙ্গে নৌকা চালানো প্রাজ্ঞ ও দক্ষ মাল্লা না হলে, সবুজ বাংলার বন্দরে পৌঁছা কঠিন। তিনি সেই কঠিনেরে ভালোবেসেছেন স্বেচ্ছায় এবং জনগণের প্রণোদনায়।

তারেক রহমানের এই স্বপ্নযাত্রা কণ্টকাকীর্ণ। কারণ তার সামনে ভঙ্গুর গণতন্ত্র, গুঁড়িয়ে দেওয়া অর্থনীতি, হতাশাগ্রস্ত শিল্প ও উদ্যোক্তা, আইনশৃঙ্খলার নারকীয় পরিবেশ-পরিস্থিতি, বাণিজ্যের দুরবস্থা, বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতা, মানবিক পরিবেশ এতটাই অস্থির ও চোরাস্রোতে আকীর্ণ যে তিনি কোনটার হাল ধরবেন? তার পরিকল্পনার সহযোগী হিসেবে যারা মন্ত্রী হলেন, তারা তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবেন। সততার সঙ্গে জনগণের আশাকে ধারণ করে উন্নয়নকাজ শুরু হবে, তাতে কোনো ভুল নেই। তবে, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা আর দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরার পাশাপাশি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। সেক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সচল করতে হবে সমাজ ও প্রশাসন থেকে অবৈধ এবং অন্যায়ের শেকড় উপড়ে ফেলার কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে। সেখানে দলীয় লোক ও সমাজবিরোধী, চাঁদাবাজ প্রভৃতি একই সমতার দৃষ্টিতে দেখতে হবে তাকে। দলের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা অসৎ ও তদবিরবাজদের দূরে ঠেলে দিতে হবে। এতে করে দলের কিছু লোক নাখোশ হলেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এ-কাজে সরকারকে অটল থাকার আহ্বান জানাই। আমরা একটি নতুন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে দেওয়া অঙ্গীকার যেন শাসন কাঠামোর কাজে প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তার স্বপ্নযাত্রা সফল হোক। আমরা যেন একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে পারি, সেই লক্ষ্যে পৌঁছাই হবে তারেক রহমানের প্রথম ১০০ দিনের কর্মধারা। বিজয় অর্জিত হোক গণমানুষের।