দেশের ঐতিহ্যবাহী ও বিনোদন শাখার সবচেয়ে অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হলো নৃত্যকলা। যেকোনো আনন্দঘন পরিবেশ, অনুষ্ঠানে নাচই হয়ে ওঠে সবার প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ক্রমশ অবহেলিত এই শিল্প। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা-অভিমান এবং অভিযোগ তুলে আসছেন দেশের খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পীরা। প্রশ্ন উঠেছে নাচ এগিয়ে যাচ্ছে, নাকি পিছিয়ে পড়ছে? তবে এবারের একুশে পদকে বৃহত্তম এই শিল্পকে যেভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে, তাতে নাচের অস্তিত্বকেই যেন বিলীন করা হচ্ছে এমনই মন্তব্য করেছেন মুনমুন আহমেদ, শামীম আরা নিপাসহ বেশ কয়েকজন নন্দিত শিল্পী। বিশেষ করে এবারের তালিকায় নৃত্যকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অপেক্ষাকৃত তরুণ নৃত্যশিল্পী অর্থী আহমেদের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট করার পাশাপাশি নিজের অভিমতও ব্যক্ত করেছেন অভিনেত্রী এবং গুণী নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদ। তার মতো আরও কয়েকজনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে নৃত্যকলায় অবদান রাখা প্রবীণ শিল্পীদের পাশ কাটিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননার মানদণ্ড ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
এ প্রসঙ্গে মুনমুন আহমেদ তার পোস্টে উল্লেখ করেন, একুশে পদক দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা, যা ১৯৭৬ সাল থেকে ভাষাশহীদদের স্মরণে প্রদান করা হচ্ছে। ভাষা আন্দোলন, শিল্পকলা, শিক্ষা, সাহিত্য, গবেষণা, বিজ্ঞান, সাংবাদিকতা, অর্থনীতি ও সমাজসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে অনন্য ও অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে এই পদক প্রদান করা হয়। তিনি বলেন, নৃত্যকলায় প্রতিবছর পদক দেওয়া হয় না এ বছর দেওয়ায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা রয়েছে। তবে যাকে এ বছর নৃত্যকলায় জাতীয় পর্যায়ের অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পদক দেওয়া হয়েছে, তাকে ঘিরে নৃত্য সমাজসহ বৃহত্তর শিল্পী সমাজে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
নিজের দীর্ঘ ৫৩ বছরের নৃত্যজীবনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মুনমুন আহমেদ লেখেন, ‘পদক ঘোষণা থেকে এ পর্যন্ত নানা জনের নানা ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাকেও, কে এই অর্থী? তার নাচ তো কোথাও দেখিনি, তাকে তো চিনিই না, জাতীয় পর্যায়ে সে কী করেছে, কী কারণে তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হলো, কী অবদান তার নৃত্যকলায়, তার কি আরও অন্য গুণ আছে? অগ্রজ গুণী নৃত্যব্যক্তিত্বদের উপেক্ষা করে কেন এমনটা করল সরকার? আরে ভাই, এত উত্তর আমি দেব কীভাবে? জানি ১৯৭৩ সাল থেকে অর্থাৎ দীর্ঘ ৫৩ বছর যাবৎ মঞ্চ ও টেলিভিশনে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করে চলেছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকে আমাকে প্রশ্ন করছেন, কিন্তু আমি ভীষণ বিব্রতবোধ করছি এসব প্রশ্নে।’
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, ‘অল্প বয়সে যে কেউ তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে পুরস্কৃত হতেই পারেন। তাছাড়া সরকার কাকে পুরস্কৃত করবে সেটা একেবারেই সরকারের বিজ্ঞ বিচারকম-লীর সিদ্ধান্ত। আমার কিছুই করার নেই এখানে। তবে এই একুশে পদকের একটি সম্মানজনক অবস্থান রয়েছে যা মাত্র তিন চার বছর আগে একটি নাচের স্কুল খুলে দু-তিনটি অনুষ্ঠান করেই যদি এ পদকে কেউ ভূষিত হন, তাহলে যারা দীর্ঘদিন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত থেকে সাধনা, শ্রম দিয়ে এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের এক অর্থে অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা ও অপমানই করা হয়, যা নৃত্যশিল্পী সমাজ, সুধী সমাজ ও নৃত্যপ্রেমীদের কাম্য নয়।’
ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তাব দিয়ে মুনমুন আহমেদ জানান, সম্ভব হলে নৃত্যকলায় প্রতিবছর একুশে পদক দেওয়া উচিত এবং এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে শক্তিশালী বিচারক কমিটি গঠন
করা প্রয়োজন। এতে প্রকৃত যোগ্যজন নির্বাচিত হবেন, বিতর্কও কমবে এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে।’
অন্যদিকে, চলতি বছরের নৃত্যকলায় একুশে পদকের মনোনয়ন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করাসহ ৬ দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন নৃত্যশিল্পী। গত সোমবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে দাবিগুলো জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পীদের পক্ষ থেকে এ সব
দাবি জানান নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যপরিচালক ফারহানা চৌধুরী বেবি।