চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্যের বাজার রমজানের আগে সহনশীল

দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র রমজান মাস। তবে অন্যান্য বছরের মতো এবার রমজানের আগে চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্যের বাজারে ভোক্তাদের জন্য বড় কোনো দুঃসংবাদ নেই। খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারের তথ্যে দেখা যায়, ছোলা-ডালসহ রমজানে যেসব ভোগ্যপণ্যের বাড়তি চাহিদা থাকে, সেগুলোর দাম মোটামুটি সহনশীল পর্যায়ে রয়েছে। তবে, কোথাও কোথাও খুচরা ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ, চিনিসহ কোনো কোনো পণ্যে বাড়তি দাম নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুচরাবাজারে প্রশাসনের যথাযথ মনিটরিং থাকলে এবারের রমজানে কোনোভাবেই পণ্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা নেই। এদিকে, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কর্মকর্তাদের মতে, ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে হলে পাইকারি এবং খুচরা উভয় বাজারেই কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।

খাতুনগঞ্জ পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, রমজান মাসে ছোলা, মসুর ডাল, মটর ডাল, চিনি, চিড়া, তেল, পেঁয়াজ, খেজুর ইত্যাদি নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের বাড়তি চাহিদা থাকে। এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে অন্যান্য বারের মতো এবারও পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য আমদানি হয়েছে। তবে বন্দরে ধর্মঘট ও জাতীয় নির্বাচনের কারণে দু-একটি আইটেমের পণ্য সরবরাহ কিছুটা ব্যাহত হলেও এখন তা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

গত সোমবার খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন পণ্য ছোলা প্রতি কেজি মানভেদে ৭২ থেকে ৮৪ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে এই ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা মোটা দানা কেজি ৭৭ এবং ভারতীয় চিকন দানার মসুর ডাল প্রতি কেজি ১৫৭ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। মটর ডাল কেজি ৫১ টাকা ৫০ পয়সা ও মটর ৫০ টাকা ৫০ পয়সা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি ও তৈয়বিয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সোলায়মান বাদশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি বছর রমজান সামনে রেখে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে এবং বাজারেও সরবরাহে ঘাটতি নেই। বিশেষ করে ছোলা, মটর ডাল, মটর, মসুর ডাল, খেজুর, চিনি ইত্যাদির কোনো বাজার সংকটের শঙ্কা নেই। যে কারণে অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় এবারের বাজার সহনশীল রয়েছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় কম রয়েছে।

এদিকে, এক সপ্তাহ আগের তুলনায় রমজানের আগ মুহূর্তে চিনি ও পেঁয়াজের দাম কিছুটা বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগে পাইকারিতে প্রতি কেজি চিনি ৯২ এবং পেঁয়াজ ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গতকাল প্রতি কেজি চিনি ৯৬ ও পেঁয়াজ ৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়।

খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের পাইকারি বাজার হামিদুল্লাহ মিয়ার বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনের কারণে কয়েক দিন খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে রমজানকে সামনে রেখে চাহিদাও বেড়েছে। যে কারণে পেঁয়াজের বাজার এক সপ্তাহ আগের তুলনায় কিছুটা বাড়তি রয়েছে। তিনি বলেন, রমজানের শুরুতে চাহিদা বেশি থাকলেও কয়েক দিন যাওয়ার পর চাহিদা কমে আসবে। তখন আবার দাম নিম্নমুখী হয়ে পড়তে পারে।

এদিকে নগরীর ফলমন্ডি ও রেয়াজউদ্দিন বাজার ঘুরে দেখা যায়, সৌদি আরব, দুবাই, ইরাক, ইরান, তিউনিসিয়া, মিসরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা খেজুরের প্রচুর সরবরাহ রয়েছে দোকানগুলোয়। এসব খেজুরের মধ্যে রয়েছে জাহেদি, মরিয়ম, আজওয়া, আমবার, মাশরুক ইত্যাদি। আজওয়া খেজুর বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১ হাজার টাকায় আর কেজি ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে আমবার খেজুর। নিম্নবিত্তের কাছে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন খোলা জাহেদি খেজুর বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকায়।

রেয়াজ উদ্দিন বাজারের বিক্রেতারা জানান, দুই সপ্তাহ আগেও খোলা জাহেদি খেজুর প্রতি কেজি ১৭০-১৭৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাইকারিতে দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন তা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, একমাত্র জাহেদি খেজুর ছাড়া বাকি সব ব্র্যান্ডের খেজুরের বাজারে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এসব খেজুরের দামও গত বছরের তুলনায় কম। তিনি বলেন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের কাছে জাহেদি খেজুরের চাহিদা বেশি। ১০ কেজির জাহেদি খেজুরের কার্টন বর্তমানে ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর রমজানেও প্রায় একই রকম দাম ছিল। এ ছাড়া বস্তাভর্তি খেজুর বর্তমানে পাইকারিতে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

বাজারে জাহেদি খেজুরের বাড়তি দাম প্রসঙ্গে তিনি জানান, রমজান সামনে রেখে সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমাবে এই আশায় অনেক আমদানিকারক এলসি না খুলে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সরকার থেকে যখন শুল্ক হ্রাসের ঘোষণা আসে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে জাহেদি খেজুরের দাম বেড়ে যায়। যে কারণে আমদানিকারকের অনেকেই শেষ পর্যন্ত খেজুরের জন্য এলসি খুলেনি। এ ছাড়া, সম্প্রতি থাইল্যান্ড উপকূলে চট্টগ্রাম বন্দরমুখী একটি কনটেইনার জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে। ওই জাহাজে প্রায় দেড়শ কনটেইনার খেজুর ছিল বলে জানা যায়। এসব কারণে বাজারে জাহেদি খেজুরের কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়।

এদিকে, নগরীর একাধিক বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্যেও দামে পাইকারি বাজারের সঙ্গে খুচরা বাজারের বেশ তফাত রয়েছে। লালখান বাজার নিউ আজিজ স্টোরের মূল্য তালিকায় দেখা যায়, চিনির কেজি ১০৫ টাকা ও ছোলা ৯৫ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। মোটা দানার মসুর ডাল ৮৫ টাকা ও চিকন দানা বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়। মটর ডাল কেজি ৬০ ও খেসারি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। দেশি পেঁয়াজের কেজি ৬০, রসুন ও আদা ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। চিড়া বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজিতে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে অন্যবারের মতো রমজানকেন্দ্রিক বাজার মনিটরিং বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তিনি বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সরকারের পালাবদলের শিথিল পরিস্থিতিতে রমজানের বাজারে তারা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ভোগ্যপণ্যের বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে। নতুন সরকারকে শুরুতেই এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।