গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য লোকজ সংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র ইসলাম উদ্দিন পালাকার পাচ্ছেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক। ২০২৬ সালের জন্য নাট্যকলা বিভাগে তার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নাম ঘোষণার পর থেকে প্রতিদিনই তার বাড়িতে দেখতে আসছেন জেলা ও জেলার বাহির থেকে লোকজন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে এক বিফ্রিংয়ে এই ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম। এখন পুরস্কারটি হাতে পাবার প্রহর গুনছেন ইসলাম উদ্দিন। দীর্ঘদিন ধরে লোকসংগীত ও গ্রামীণ পালাগানকে জনপ্রিয়তা আখড়ে আছেন তিনি। ঢাকা কোক স্টুডিও ব্যানারে ”হাত ছাইড়া দেও সোনার দেওড়া রে” এ গানটি রিলিজ হওয়ার পর থেকে ইসলাম উদ্দিনের জনপ্রিয়তা দেশ-বিদেশে আরও ছড়িয়ে পরেছে তার জনপ্রিতা।
এলাকাবাসি ও একাধিক সূত্রে জানা যায়, ইসলাম উদ্দিন পালাকার ছিলেন একজন কিচ্ছাকার/কিচ্ছাদার। এরপর জনপ্রিয়তা পেতে পেতে হয়ে গেলেন একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি পালাকার ও লোকসংগীতশিল্পী। পালাগানে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০২৬ সালে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক প্রদানের জন্য মনোনীত করেন। তিনি ২০২৩ সালে কোক স্টুডিও বাংলার ‘হাতে লাগে ব্যথ্যারে হাত ছাইড়া দেও প্রাণের দেওরা রে’ গানে কণ্ঠ দিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পালাগান পরিবেশন করে আসছেন।
ইসলাম উদ্দিনের প্রারম্ভিক জীবন
ইসলাম উদ্দিন পালাকার ১৯৬৯ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার নোয়াবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মক্তব পর্যন্ত। শৈশবে তিনি গ্রামীণ সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। সে সময়ে গ্রামে বিদ্যুৎ বা টেলিভিশনের প্রচলন না থাকায় যাত্রাপালাই ছিল বিনোদনের মূল উৎস। তার বড় দুই ভাই গ্রামের ‘ঝুমুর যাত্রা’ দলে অভিনয় করতেন। ভাইদের অভিনয় এবং হাওরাঞ্চলে পালাগানের আসর দেখে তিনি যাত্রাপালার প্রতি আকৃষ্ট হন।
১৯৮১ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি প্রথম যাত্রাপালায় অভিনয় শুরু করেন। তার অভিনীত প্রথম যাত্রাপালা ছিল ‘কাশেম মালা’ ও ‘দস্যু বাহরাম’। ‘কাশেম মালা’ নাটকে মূল অভিনেতা অনুপস্থিত থাকায় চাচাতো ভাইয়ের সুপারিশে তিনি ‘কাশেম’ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। অভিনয়ের পাশাপাশি গানেও তিনি সুর মেলাতেন, যা শুনে স্থানীয়রা তার গলার স্বরের প্রশংসা করে তাকে পালাগানে আসার পরামর্শ দেন। কৈশোরের শেষভাগে, আনুমানিক ১৭ বছর বয়সে তার নিজ এলাকায় পালাকার প্রখ্যাত লোকশিল্পী ওস্তাদ কুদ্দুস বয়াতির পরিবেশনা দেখে মুগ্ধ হয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে নেত্রকোণায় কুদ্দুস বয়াতির বাড়িতে যান। কুদ্দুস বয়াতি তাকে ৬,০০০ টাকা সম্মানী এবং এক বছর সময়কালের বিনিময়ে কিচ্ছাগান শেখাতে রাজি হন। তবে দীর্ঘ ছয় মাস গুরুর সেবা করার পরেও তিনি কাঙ্কিত শিক্ষা পাচ্ছিলেন না। পরবর্তীতে তিনি দলের প্রধান সহকারী বিষ্ণুপদ এবং তবলচি হাশেমের সহায়তায় গোপনে পালাগানের কাহিনিগুলো ডায়েরিতে লিখে আয়ত্ত করেন এবং মাত্র তিন মাসে সব গান রপ্ত করেন।
চৈত্র মাসে ওস্তাদের হাতে কাজ না থাকায় তিনি ওস্তাদের অনুমতি নিয়ে হারমোনিয়াম বাদক নিজাম উদ্দিন, তবলচি নিমাই ও বিষ্ণুপদকে নিয়ে নেত্রকোণার কদমশ্রী গ্রামে নিজের প্রথম শো করতে যান। পূর্ণিমা রাতে হ্যাজাক বাতির আলোতে ‘গুলে হরমুজ’ পালার মাধ্যমে তিনি প্রথম মূল গায়েন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর টানা ২৪ দিন কালিয়াজুরির বিভিন্ন গ্রামে শো করে তিনি ২,৮৩০ টাকা আয় করেন এবং গুরুদক্ষিণা হিসেবে পুরোটাই ওস্তাদের হাতে তুলে দেন। কিন্তু পারিশ্রমিক সংক্রান্ত বিষয়ে অভিমান করে তিনি ওস্তাদের দল ত্যাগ করে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
কর্মজীবন পালাগান ও মঞ্চ
১৯৮৯ সালে ২০ বছর বয়সে তিনি ‘ইসলাম উদ্দিন কিচ্ছাকার ও তার দল’ (পরবর্তীতে ‘ইসলাম উদ্দিন পালাকার ও তার দল’) গঠন করেন। নিজের দল গঠনের পর তিনি প্রথম দিকে ‘উথুলা সুন্দরী’ ও ‘কাকাধরের খেলা’ এই দুটি পালা পরিবেশন করতেন। নব্বইয়ের দশকে তার ব্যাপক চাহিদা হয়। সে সময় তিনি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি পালাগানের আসরে অংশ নিতেন।
ইসলাম উদ্দিন পালাকার মঞ্চে অভিনয়ের জন্য নিজের নকশা করা বিশেষ ধরনের পোশাক ব্যবহার করেন। পালাগানে একজন অভিনেতাকে রাজা, রানী বা দস্যুর মতো ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে দ্রুত রূপান্তর হতে হয়। তিনি এমন একটি পোশাকের মডেল তৈরি করেছেন যা মাত্র ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে পরিবর্তন করে নারী বা পুরুষ চরিত্রে প্রবেশ করা সম্ভব। তিনি সাধারণত লোকমুখে প্রচলিত পালাগুলো পরিবেশন করেন। তার পরিবেশিত উল্লেখযোগ্য পালাগুলোর মধ্যে হলো: কমলা রানীর সাগর দিঘি, জাহাঙ্গীর বাদশা, মতিলাল, রূপকুমার, উথুলা সুন্দরী, কাকাধরের খেলা, আমির সাধু, সুন্দরমতি, রাম বিরাম, ফিরোজ খাঁ প্রভৃতি। তিনি ১৯৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল এ পালাগান পরিবেশন করেন। এছাড়াও তিনি ভারত ও অস্ট্রেলিয়াতেও পালাগান পরিবেশন করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে অতিথি প্রশিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পালাগানের ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ২০১৬ সালে তিনি ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্টে ‘উথুলা সুন্দরী’ পালা পরিবেশন করেন।
চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যম
২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নির্মাতা আবু সাইয়ীদের কিত্তনখোলা চলচ্চিত্রে তিনি গান পরিবেশন করেন এবং অভিনয় করেন। পরবর্তীতে নুহাশ হুমায়ুনের নির্দেশনায় পেট কাটা ষ-এর দ্বিতীয় মৌসুম ‘২ষ’তে ‘বেসুরা’ পর্বে তিনি অভিনয় করেন। এটি ছিল ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তার প্রথম কাজ। ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পটু সিনেমার গানেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন, যেখানে তিনি ‘বিয়ে কেন হলো না’ শিরোনামে একটি প্লেব্যাক গান করেন। এছাড়া হানিফ সংকেতের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে তিনি গুরু কুদ্দুস বয়াতির সঙ্গে দ্বৈত পরিবেশনায় অংশ নিয়েছেন। ২০২৩ সালে কোক স্টুডিও বাংলার দ্বিতীয় সিজনে প্রীতম হাসানের সুর ও সংগীতায়োজনে ‘দেওরা’ গানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। গানটিতে সারি গান, জাগ গান এবং পালাগানের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। এই গানটি তাকে দেশব্যাপী এবং আন্তর্জাতিকভাবে নতুন পরিচিতি এনে দেয়।
ব্যক্তিগত জীবন ও দর্শন
ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম উদ্দিন একজন ধর্মপরায়ণ ও সংসারী মানুষ। তিনি নিজেকে শুধুই ‘পালাকার’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার মতে, বাউল গান এবং পালাগান এক নয়। বাউল গান সংক্ষিপ্ত হয় কিন্তু পালাগান দীর্ঘ সময়ের কাহিনি নির্ভর পরিবেশনা। তিনি মানবপ্রেমের সঙ্গে আল্লাহ ও রাসুলে বিশ্বাসকে নিজের ধর্মীয় দর্শনের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইসলাম উদ্দিন পালাকার (পূর্বপরিচয়. ইসলাম উদ্দিন কিচ্ছাকার/কিচ্ছাদার) হলেন একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী পালাকার ও লোকসংগীতশিল্পী। পালাগানে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০২৬ সালে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক প্রদানের জন্য মনোনীত করা হয়।
একুশে পদক প্রাপ্তি প্রসঙ্গে পালাকার ইসলাম উদ্দিন বলেন, আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ একটি পুরস্কার পাচ্ছি। এটা পেয়ে অনেক গর্ববোধ করছি। কিন্তু অপেক্ষা আর দিন কাটছে না। জীবদ্দশায় এমন একটি রাষ্ট্রীয় সম্মাননার প্রত্যাশা ছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমি কখনো এমন পদক পাবো স্বপনেও দেখিনাই। একুশে পদক পাবো আমি কখনো ভাবতেও পারি নাই। হয়তো আল্লাহ আমাকে দয়া করেছেন। আর আমার ভক্তগণদের দোয়ায় এমন একটি সু-সংবাদটি পেয়েছি। তবে পদক আমার নামে ঘোষণা করা হয়েছে, যদি একুশে পদক পাই তাহলে জীবনটা ধন্য হতো। সেই অপেক্ষায় আছি, এ সব কথা বলছেন আর তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছে।
সবশেষে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়কে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, পুরস্কারটি আমার নামে ঘোষণা করার জন্য সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানাই।