দেশবরেণ্য চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা। অভিনয়ের পাশাপাশি কয়েকটি ব্যবসাসফল সিনেমা প্রযোজনা করলেও অভিনয়শিল্পী হিসেবেই সবাই তাকে চেনেন ও জানেন। উপমহাদেশের সিনেমা মহলের কারও কারও কাছে তিনি ‘অনঙ্গ বউ’ নামেও পরিচিত। প্রায় এক যুগ হয়ে গেল অভিনয়ের বাইরে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ তারকা। ২০১৫ সালে নারগিস আকতারের ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ সিনেমায় অভিনয়ের পর আর কোনো সিনেমায় দেখা যায়নি তাকে। চলচ্চিত্রের অসুস্থ পরিবেশ, পছন্দসই গল্প ও চরিত্র না পাওয়ায় অনেকটা অভিমানেই চলচ্চিত্র থেকে দূরে রয়েছেন তিনি। আগামীতে আর নতুন কোনো সিনেমায় অভিনয়ে দেখা যাবে কি না সেটিও নিশ্চিত নন ‘আজীবন সম্মাননা’সহ একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই কিংবদন্তির। অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও এখনো তিনি প্রাসঙ্গিক। নিজস্ব আলোর জ্যোতিতে চলচ্চিত্রাকাশে উজ্জ্বল তারা হয়েই জ্বলবেন তিনি। এবার তার ক্যারিয়ারের ঝুলিতে জমা হচ্ছে আরেক অর্জন। অভিনয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার দরুন এবার পাচ্ছেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক।
খবরটি প্রকাশ হওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ববিতা জানিয়েছিলেন, দেরিতে হলেও অবশেষে একুশে পদকপ্রাপ্তিতে তিনি ভীষণ উচ্ছ্বসিত। একুশে পদকপ্রাপ্তির খবরে ববিতার দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী যেমন খুশি, তেমনই আনন্দিত তার পরিবার, চলচ্চিত্র পরিবারসহ গণমাধ্যমের কর্মীরাও। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া শোনার পর প্রথমবার এই পদকপ্রাপ্তির আগাম অনুভূতি, নির্বাচন এবং নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা জানতে ববিতার বাসায় হাজির হয় দেশ রূপান্তর। শুরুতেই একুশে পদক প্রসঙ্গ তুললে ববিতা বলেন, ‘মহান আল্লাহর কাছে অসীম শুকরিয়া যে তিনি আমাকে সুস্থ রেখেছেন, ভালো রেখেছেন। অনেক অনেক ভালো লাগার বিষয় এটাই যে, আমি জীবদ্দশায় একুশে পদক পেতে যাচ্ছি। জীবদ্দশায় এমন রাষ্ট্রীয় পদক পাওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার। আমি রাষ্ট্রের প্রতি এবং যারা আমাকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করেছেন, তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। অনেক অনেক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা আমার সব ভক্ত-দর্শকের প্রতি। কারণ তারা সবসময়ই আমার সব কাজের অনুপ্রেরণা দিয়ে এসেছেন। অভিনয়ে থাকি কিংবা না থাকি তারাই আমার ভালো-মন্দের খোঁজ নিয়েছেন। তারা আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে আজকের এই পর্যায়ে নিয়েছে এসেছেন। কৃতজ্ঞতা সংবাদমাধ্যমের প্রতি। কারণ আমার অভিনয় জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যম সবসময় আমার পাশে ছিল, এখনো আছে। একুশে পদকপ্রাপ্তিতে সংবাদমাধ্যমেরও যে উচ্ছ্বাস, তা অনুভব করছি এই খবরপ্রাপ্তির পর থেকেই।’
তার আগেই ববিতা জানিয়েছিলেন, শহীদ জহির রায়হানের হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসার কারণে তার সম্মানার্থে এই একুশে পদক তাকেই উৎসর্গ করছেন। নতুন সরকারের কাছে নিজের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে এই শিল্পী বলেন, ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, শিল্পীরাই দীর্ঘস্থায়ী। শিল্পীদের রাজনৈতিক বলয়ে টেনে না আনার আহ্বান জানান নতুন সরকারের কাছে। পাশাপাশি শিল্পীদের প্রতি তার বক্তব্য তারাও যেন ব্যক্তিগত সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা রক্ষায় রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। আর সরকারের কাছে আমার একটাই চাওয়া, যেটা আমি আগেও বলেছি, সারা দেশে আধুনিক ও মানসম্মত সিনেমা হল নির্মাণ বা পুনরুদ্ধারে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। মফস্বল শহরগুলোতে আবারও প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক সংস্কৃতির জাগরণ ঘটুক, এ নিয়ে সরকারের কার্যকর ভূমিকা দেখতে চাই।’
অভিনয়ে ফেরা নিয়েও কথা হয় এই ববিতার সঙ্গে। ববিতা বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, এ সময়ে এসে আর এমন কোনো গল্পে অভিনয় করতে চাই না, যেখানে শুধু নামে মাত্র অভিনয় করা হবে। আমি আমার সারা জীবনের অভিনয়ে যে অর্জন, তা হারাতে চাই না। যদি শুধু আমাকে কেন্দ্র করেই গল্প আবর্তিত হয় এবং গল্প যদি আমার ভালো লাগে, তবেই সিনেমায় অভিনয় করতে রাজি। গল্প আর চরিত্র যদি ভালো না লাগে, তবে আর কোনো দিন অভিনয়ে ফেরা হবে না। আর যদি কোনো দিন সিনেমায় অভিনয়ও না করি, তবু আমার আফসোস থাকবে না। যারা এখনো আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পকে ভালোবেসে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের জন্য শুভ কামনা রইল।’
ববিতা জানান, সিনেমায় অভিনয়ের প্রবল আগ্রহ আছে তার; কিন্তু যে গল্প তাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করবে, সে ধরনের গল্প নিয়ে এখনো তার কাছে কেউই যেতে পারেননি। যে কারণে আজও তার নতুন কোনো সিনেমায় অভিনয় করা হয়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, ‘আমার সময়কালটাতে যে ধরনের মেধাবী, গুণী কাহিনিকার ছিলেন, পরিচালক ছিলেন এখন আমার তা চোখে পড়ে না। নেই জহির রায়হান, নেই খান আতাউর রহমান, নেই আমজাদ হোসেন, নেই চাষী নজরুল ইসলামসহ অনেকে। যাদের নাম আমি নিয়েছি তারা যে কত মেধাবী ছিলেন, কতটা জিনিয়াস ছিলেন, তা আমরা বেশ ভালো করেই জানি। তারা সময়ের চেয়েও এগিয়ে ছিলেন।’
ববিতা অস্কারজয়ী বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনিসংকেত’ সিনেমায় অভিনয় করে দেশ-বিদেশে বাংলা ভাষাভাষী দর্শকের কাছে এক অনন্য উচ্চতায় চলে গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ২০২৩ সাল থেকে ৫ আগস্ট ববিতা ডে হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। ববিতা সর্বশেষ নারগিস আক্তারের ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। সিনেমাটি ২০১৫ সালে মুক্তি পায়। এরপর আর তাকে নতুন কোনো সিনেমায় দেখা যায়নি। তবে ববিতা জানিয়েছেন, প্রায় ৩০০ সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন। ববিতার প্রযোজনা সংস্থার নাম ছিল ‘ববিতা মুভিজ’। ‘ফুলশয্যা, ‘ আগমন’, ‘লটারী’, ‘চণ্ডিদাস রজকিনী’, ‘পোকা মাকড়ের ঘরবসতি’ ও ‘লেডি স্মাগলার’ তার প্রযোজিত সিনেমা। ববিতার একমাত্র ছেলে অনিক কানাডাতে ডেলয়েডে চাকরি করছেন। অনিক একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সিনেমায় ববিতা নায়ক রাজরাজ্জাক, জাভেদ, ওয়াসীম, ফারুক, সোহেল রানা, জাফর ইকবালসহ বেশ কয়েকজন নায়কের বিপরীতে অভিনয় করেছেন।