পশ্চিমা জলদস্যুতায় রাশিয়ার উদ্বেগ

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের যখন চতুর্থবার্ষিকী ঘনিয়ে আসছে, ঠিক তখনই পশ্চিমা জলদস্যুতা থেকে নিজেদের জাহাজ রক্ষার জন্য রাশিয়া নৌবাহিনী মোতায়েনের হুমকি দিয়েছে। রাশিয়ার মেরিটাইম বোর্ডের প্রধান ও সাবেক এফএসবি পরিচালক নিকোলাই পাত্রুশেভ দেশটির পত্রিকা আর্গু মেন্টি আই ফ্যাক্টিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও শিপিং বিষয়ক এই উপদেষ্টা জানিয়েছেন রাশিয়ার নৌবাহিনীকে পশ্চিমা জলদস্যুতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। তিনি আরও বলেন, যদি এই পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা না যায়, তাহলে নৌবাহিনী যে কোনো অবরোধ ভেঙে তা দূর করার পদক্ষেপ নেবে। সেইসঙ্গে তিনি পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন আমরা যেন ভুলে না যাই, অনেক জাহাজ ইউরোপীয় পতাকার নিচে সমুদ্রে চলাচল করে আমরাও তাদের বহন করা দ্রব্য এবং কোথায় যাচ্ছে সে বিষয়ে আগ্রহী হতে পারি। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার ওপর সামুদ্রিক অবরোধ আরোপের যে কোনো প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ। জেনেভায় ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার জন্য জ্যেষ্ঠ ইউক্রেনীয় এবং রাশিয়ান কর্মকর্তাদের বৈঠকের সময়ই তিনি এই মন্তব্য করেছেন।  আলোচনার আগে, রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন অংশে ভারী বিমান হামলা চালায়। ফলে দক্ষিণ বন্দর শহর ওডেসার বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। সেখানকার হাজার হাজার মানুষ আলো এবং পানি ছাড়া মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে ৬০০টিরও বেশি জাহাজকে ইইউ, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ রাশিয়ার তেল রাজস্ব হ্রাস করতে সহায়তা করেছে। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও, ইউরোপীয় সরকারগুলো জাহাজগুলোকে বন্ধ বা বাজেয়াপ্ত করার জন্য একটি সুসংগত আইনি ব্যবস্থা তৈরি করতে লড়াই করছে। পশ্চিমা মিত্ররা সতর্ক করে দিয়েছে যে, যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া জাহাজগুলোকে রাষ্ট্রহীন জাহাজ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে, যা সমুদ্রে হস্তক্ষেপের সুযোগকে আরও বিস্তৃত করবে।

যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ইরান থেকে অনুমোদিত তেল বহনকারী ছায়া নৌবহরের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকটি ট্যাঙ্কারকে সরাসরি বাধা এবং আটকের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে পাত্রুশেভের মন্তব্য মূলত ইউরোপের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে মনে হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়া নির্ধারিত মূল্যসীমার ওপরে তেল বিক্রির জন্য শত শত পুরনো, প্রায়ই বিদেশি পতাকাধারী, নিবন্ধনহীন বা ছদ্মবেশী ট্যাঙ্কারের একটা ‘ছায়া নৌবহর’ গড়ে তুলেছে। পশ্চিমা দেশগুলো এই জাহাজগুলোকে স্যাংকশন ফাঁকি দেওয়ার হাতিয়ার মনে করে। এ কারণে এগুলোকে ক্রমাগত জব্দ, জরিমানা এবং কালো তালিকার অন্তর্ভুক্ত করছে। দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ‘ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ যখন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করছে, তখন যে অর্থনীতি এটিকে টিকিয়ে রেখেছে তা এমনভাবে রূপান্তরিত হয়েছে যে, আরেকটি সংকট ছাড়া তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন সম্ভবত অসম্ভব। পশ্চিমারা রাশিয়ার অর্থনীতির পতনের জন্য অপেক্ষা করছে। তা হবে না। কিন্তু এটি পুনরুদ্ধারও হবে না।’

নিকোলাই পাত্রুশেভ সাক্ষাৎকারে যে বিষয়টা উল্লেখ করেছেন তা হলো, ‘পশ্চিমারা যদি এখন জাহাজ জব্দ করে, তাহলে পরবর্তী ধাপ হবে বাল্টিক সাগর বা অন্যান্য এলাকায় সমুদ্রপথে রাশিয়ার প্রবেশাধিকার পুরোপুরি বন্ধ করা। এটা ঘটলে রুশ নৌবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং যে কোনো ব্লকেড ভেঙে ফেলা হবে’। রাশিয়ার কাছে ‘পশ্চিমা জলদস্যুতা’ মানে আইনি ছদ্মবেশে সমুদ্রপথে জোর করে অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালানো। তারা এটাকে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও সমুদ্রে সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে দেখছে। তাই তারা নৌবাহিনী দিয়ে প্রতিরোধের হুমকি দিচ্ছে এবং এই ভাষা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মতামত গড়ে তুলতে চাইছে। এটা মূলত রাজনৈতিক-প্রচারমূলক ভাষা, কিন্তু এর পেছনে খুব বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামরিক উদ্বেগ কাজ করছে। পাত্রুশেভ জোর দিয়ে বলেছেন, রাশিয়ার অর্থনীতি সচল রাখতে তেল, শস্য ও সার রপ্তানি অব্যাহত রাখা জরুরি। পশ্চিমারা রাশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘শিপিং’ বা নৌ-পরিবহন খাতকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পাত্রুশেভ আরও বলেন, ‘রাশিয়া থেকে দূরবর্তী অঞ্চলসহ প্রধান সামুদ্রিক এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি স্থায়ীভাবে মোতায়েন করতে হবে, যাতে পশ্চিমা জলদস্যুদের আস্ফালন কমিয়ে দেওয়া যায়।’ ভেনেজুয়েলা ও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ বা যুদ্ধজাহাজ দেখিয়ে ভয় দেখানোর নীতি চালাচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। এই রুশ কর্মকর্তার আশঙ্কা, ন্যাটো সামরিক জোট বাল্টিক সাগরে অবস্থিত রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ বিচ্ছিন্ন অঞ্চল অবরোধের পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, ‘নৌ-অবরোধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইউরোপীয়রা পরিকল্পিতভাবে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে, আমাদের ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করছে এবং সক্রিয় প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ উসকে দিচ্ছে।’

প্রাচীন যুগে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে জলদস্যুতা ছিল ব্যাপক। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে সিলিসীয় জলদস্যুরা রোমান জাহাজ আক্রমণ করলে রোম শক্ত প্রতিক্রিয়া জানায়। শেষ পর্যন্ত রোমান সেনাপতি পম্পেই বিশাল নৌ অভিযান চালিয়ে জলদস্যুদের দমন করেন। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যে জলদস্যুতা একদিকে অপরাধ, অন্যদিকে কখনো কখনো যুদ্ধনীতির অংশ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। মধ্যযুগে উত্তর আফ্রিকার বারবার উপকূলে গড়ে ওঠে কুখ্যাত জলদস্যু ঘাঁটি। বিশেষ করে বারবারি কস্ট অঞ্চল থেকে মুসলিম ও অটোমান-সমর্থিত জলদস্যুরা ইউরোপীয় জাহাজ আক্রমণ করত। এ সময় ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিকে জলদস্যুতা ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গেও যুক্ত। ১৬১৮ শতককে জলদস্যুতার ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। ক্যারিবীয় সাগর ও আটলান্টিকে ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের সময় বহু নাবিক জলদস্যুতে পরিণত হন। ইংল্যান্ড, স্পেন ও ফ্রান্স কখনো কখনো প্রাইভেটিয়ার তথা রাষ্ট্র অনুমোদিত জলদস্যু ব্যবহার করত, যারা শত্রু দেশের জাহাজ লুট করত। কিন্তু এই আধুনিক যুগেও জলদস্যুতা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। আজ আন্তর্জাতিক আইন ও নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে তা অনেক কমেছে, কিন্তু সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি এবং মাঝে মাঝে আঞ্চলিকভাবে মাথাচাড়া দেয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চরম উত্তেজনার মুহূর্ত, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে যা করা হচ্ছে তা কোন পর্যায়ের দস্যুতা সেটা ইতিহাসই বলে দেবে। তবে উভয় দেশের উত্তেজনার পারদ যে বাড়ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক :  সাংবাদিক

mshossain.sujan@gmail.com