আত্মপরিচয়ের সন্ধানে

Ngũgĩ wa Thiong’o  (এনগুগি ওয়া থয়াঙ্গো ১৯৩৮-২০২৫) আমাদের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করান যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আমাদের ভাইয়েরা প্রাণ দিয়েছেন বায়ান্নতে। এখনো উত্তর খুঁজছি ভাষার উপনিবেশ, ভাষার অর্থনৈতিক মুক্তি কি সংগঠিত হয়েছে? এনগুগি জন্মেছিলেন ঔপনিবেশিক কেনিয়ায়। প্রথম জীবনে লিখতেন জেমস নগুগি নামে। ইংরেজিতে উপন্যাস লিখে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পান। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে শুরু করেন ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা ক্ষমতার কাঠামো। ভাষা মানসিক উপনিবেশের অস্ত্র।

তিনি অধ্যাপনা করেছেন University of California, Irvine-এ। পড়িয়েছেন Yale University, New York University  এবং University of Nairobi-সহ বহু প্রতিষ্ঠানে। তবু তার মূল প্রশ্ন ছিল নিজস্ব ভাষার মর্যাদা ও ক্ষমতা কাঠামোয় মাতৃভাষার ব্যবহার।

১৯৭৭ সালে কমিউনিটি থিয়েটারের কাজের জন্য তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৭৮ সালে কঠোর নিরাপত্তা কারাগারে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি থাকেন। জেলের ভেতরেই তিনি আত্মসমালোচনায় নিমগ্ন হন। তিনি পড়েন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। দূর থেকে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সান্নিধ্যে আসেন।

রবীন্দ্রনাথের একটি কথোপকথনের গল্প তাকে আলোড়িত করে। এক লেখক বহু ভাষা জানার গর্ব করেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করেন, মাতৃভাষায় লেখার অবস্থা কী? বাংলা ভাষা জানেন কিনা? উত্তরে লেখক বলেন, মাতৃভাষা জানি না। তখন রবীন্দ্রনাথ বলেন, তবে তুমি কোনো ভাষাই আদতে জানো না।

এই উক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য গভীর। ভাষা কেবল শব্দভাণ্ডার নয়। ভাষার ভেতরে নিহিত একটি জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক শিকড়। ভাষা জীনানুক্রমিক স্মৃতি বহন করে। ভাষা অনুভবের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্মৃতির গৃহ। মাতৃভাষা ছাড়া জ্ঞান অর্জন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। হৃদয়ের কথা কতটুকু অনুবাদ করা যায় অন্য ভাষায়?

কারাগারে বসে এনগুগি উপলব্ধি করেন, তার লেখালেখির ভেতরের অন্তর্গত শক্তি ফিরে পেতে হলে তাকে তার মাতৃভাষা গিকুয়ু ভাষায় লিখতে হবে। তিনি নিজের নাম থেকে ‘জেমস’ বাদ দেন। গ্রহণ করেন মাতৃভাষার নাম, Ngũgĩ wa Thiong’o নামের পরিবর্তন ছিল প্রতীকী বিপ্লব। এটি আত্ম-উপনিবেশমুক্তির প্রথম ঘোষণা।

একটি ঘটনার কথাও প্রচলিত আছে এনগুগি সম্পর্কে। বিখ্যাত এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষার উপনিবেশ নিয়ে বক্তৃতার সময় এক শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধা তাকে প্রশ্ন করেন, তোমার নাম জেমস কেন? ধর্ম কী ? খ্রিস্টান কেন? শাসকদের গালি দাও অসুবিধে নাই; তবে তা ইংরেজিতে কেন? নিজের ভাষা কী? সেই ভাষায় প্রতিবাদ করো না কেন?

এই প্রশ্নে তিনি ভেতরে বাইরে পাল্টে যান। বুঝতে পারেন তার প্রতিবাদও ঔপনিবেশিক ভাষায় বন্দি।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে ফিরে যান কেনিয়ায় তার গ্রামের শিকড়ে। শুরু করেন গিকুয়ু ভাষায় নাটক ও উপন্যাস লেখা। লেখেন ‘Devil on the Cross’ কারাগারের কাগজে। ভাষাকে করেন সংগ্রামের হাতিয়ার।

১৯৬৮ সালে  University of Nairobi--এর এক সভায় তিনি ইংরেজি বিভাগের প্রাধান্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, আফ্রিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে আফ্রিকান ভাষা ও সাহিত্য কেন প্রান্তিক? কেন শুধু ব্রিটিশ সাহিত্য হবে কেন্দ্র? কেন আফ্রিকার ভাষা-সংস্কৃতি নয়?

তিনি কয়েকটি স্পষ্ট প্রস্তাব দেন।

প্রথমত, কেনিয়া ও আফ্রিকার ভাষাসমূহকে পাঠক্রমের কেন্দ্রে আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় সাহিত্যকে তুলনামূলক পাঠ হিসেবে পড়াতে হবে, প্রভুত্ব হিসেবে নয়।

তৃতীয়ত, আমেরিকান, ক্যারিবিয়ান, আফ্রিকান ও কমনওয়েলথ সাহিত্যের বহুস্বরকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

চতুর্থত, আফ্রিকাকে ইউরোপীয় ভাষার ‘সংস্করণ’ হিসেবে দেখা যাবে না।

পঞ্চমত, একক সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা যদি জরুরি হয়, তবে আফ্রিকান সাহিত্যই সেই ভিত্তি হতে পারে।

এই ভাবনা আমাদেরও নাড়া দেয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে ভাষা মানে অস্তিত্ব। ভাষার মধ্যেই স্বাধীনতার বীজ রুপিত ছিল বলে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পেয়েছি লাখ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে। আমাদের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম ছিল আত্মমর্যাদার লড়াই। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তারই স্বীকৃতি।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়। উচ্চশিক্ষায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? ইংরেজি ভার্সন, ইংলিশ মিডিয়াম, মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠক্রম এসবের ভেতর কি নতুন ধরনের উত্তর ঔপনিবেশিক মানসিক বিভাজন তৈরি হচ্ছে না? কেন ও কাদের স্বার্থে নব্য উপনিবেশ?

ইংরেজি জানা অপরাধ নয়। বরং বৈশ্বিক যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন ইংরেজি হয় মর্যাদার প্রধান মানদণ্ড। যখন মাতৃভাষা হয় ‘কম-মানের’ অবহেলার প্রতীক। তখন জন্ম নেয় মনের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হীনম্মন্যতা।

ক্যাডেট কলেজে এক সময় শুধু ইংরেজি পাঠ ইংরেজিতে হতো। এখন উল্টো চিত্র। এই পরিবর্তন কি নীতিগত চিন্তার ফল? নাকি নীতিহীন দোলাচল? শিক্ষা-নীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া ভাষা-প্রশ্নে সুস্থ দিশা পাওয়া যায় না।

এনগুগি আমাদের শেখান ভারসাম্যের কথা। মাতৃভাষা হবে জ্ঞানের ভিত্তি। বিশ্বভাষা হবে সেই সেতুবন্ধনের মূল ভিত্তি । ভিত্তি ছাড়া সেতু ঝুলে থাকে। সেতু ছাড়া ভিত্তি বিচ্ছিন্ন থাকে।

ভাষার -উপনিবেশ মানে কেবল বিদেশি ভাষা নয়। এটি নতুন চিন্তার কাঠামো। যখন আমরা নিজের সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়ন করি, তখনই উপনিবেশ টিকে থাকে মননে মেধায় ও সমাজে। যখন আমরা ভাবি উন্নত মানেই ইংরেজি, তখনই আত্মবিস্মৃতি ঘটে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাই আত্মসমালোচনা জরুরি। বাংলাদেশের আদিবাসী ও অন্য নৃভাষাগোষ্ঠীর শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপারে আমরা কী কী উদ্যোগ নিয়েছি। তারা তো আরও বিপন্ন। আমরা কি সত্যিই জ্ঞানের মূলভিত্তি মাতৃভাষায় গড়ছি? বিজ্ঞান, দর্শন, প্রযুক্তি এসবের পরিভাষা কি আমরা তৈরি করছি? নাকি অনুবাদের ওপর নির্ভরশীল?

রবীন্দ্রনাথের উক্তি ও এনগুগির সিদ্ধান্ত আমাদের একই বার্তা দেয়। মাতৃভাষা জ্ঞানের প্রথম পাঠশালা। এখানেই জন্ম নেয় সৃজনশীলতা। এখানেই মানুষ নিজের কণ্ঠ খুঁজে পায় খুঁজে পায় মাকে।

উত্তরণ একদিনে হয় না। এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নীতি, অনুবাদ, গবেষণা, পাঠ্যক্রম সবখানে সচেতন পরিকল্পনা চাই। ভাষাকে রাজনীতির হাতিয়ার নয়, মুক্তির উপায় করতে হবে।

আজকের দিনে প্রশ্ন করা মানে বিভাজন নয়। প্রশ্ন মানে জাগরণ, মানসিক পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। এনগুগির মতো সাহসী আত্মসমালোচনা আমাদেরও প্রয়োজন।

মাতৃভাষা মানে আত্মপরিচয়। আত্মপরিচয় ছাড়া বিশ্বায়ন শূন্য। তাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক মাতৃভাষাকে জ্ঞানের ভাষা করব। একই সঙ্গে বিশ্বভাষার সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাব।

ভাষার মুক্তি মানে জনমানুষের মুক্তি। ভাষার মর্যাদা মানে জাতির মর্যাদা। এই বোধই হোক আমাদের অন্তর্নিহিত মননের একমাত্র চাওয়া।

লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ