একুশের চেতনা মানে কী

ভাষা কেবল রাজনীতির হাতিয়ার নয়, ভাষা নিজেই রাজনীতির প্রতিমূর্তি। ভাষার যেমন জেল্লা বাড়ে, তেমনি ভাষা জীর্ণও হয়। জেল্লা বা জীর্ণতা দুই-ই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল।

আমিরের ও গরিবের ভাষায়, শাসকের আর শাসিতের ভাষায় থাকে দুস্তর ব্যবধান। ভাষা কেবল শব্দ সম্ভার নয়। ভাষা আধিপত্যের এবং অধস্তনতার মূর্তপ্রতীক। ভাষা হিসেবে বাংলাও এই চক্করের বাইরে নয়।

এক প্রস্থ মহাভারত...

কুরু বংশের আদিগল্পের সঙ্গে আজকের ভাষার আলাপের খানিক মিল রয়েছে।

কুরু বংশের আদি জননী সত্যবতী একবার পড়লেন মহাবিপদে। নিঃসন্তান অবস্থায় পুত্র বিচিত্রবীর্যের মৃত্যু হয়েছে। রাজ্য রক্ষায় পুত্র চাই। পুত্র কোথায় পাই! মাতা জননী স্মরণ করলেন তার আদিপুত্র ঋষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়নকে। সেকালের নিয়ম মেনে নিয়োগ প্রথা অনুসারে সত্যবতী তার পুত্র ব্যাসকে আদেশ করলেন ভ্রাতৃবধূদের সন্তানবতী করতে।

ঋষির সঙ্গে ‘মিলন’ হবে বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রী অম্বিকা ও অম্বালিকার। কিন্তু চুল-দাড়ি-জটাধারীওয়ালা ঋষিকে দেখে মিলনের সময় ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে অম্বিকা। তাই তার সন্তান ধৃতরাষ্ট্র হবে জন্মান্ধ। আর চুল-দাড়ি-জটাধারীওয়ালা ঋষির সঙ্গে মিলনের সময় ভয়ে একেবারে পা-ুরবর্ণ হয়ে যায় অম্বালিকা। তাই, তার সন্তান হবে পান্ডুর। এই হলো ভবিতব্য। বলে রাখা ভালো, ধৃতরাষ্ট্র আর পান্ডুরের ছেলেরাই হলো যুযুমান কৌরব আর পাণ্ডবকুল।

অম্বিকার চোখ বন্ধ ছিল, তাই ছেলে হবে অন্ধ। এই কথা জেনে শাশুড়ি সত্যবতী অম্বিকাকে আবারও তখনই ঋষির সঙ্গে মিলিত হতে বলেন। কিন্তু এবার অম্বিকা নিজে যায় না। এক দাসীকে পাঠায়। ব্যাসদেবের মতো মহান ঋষির সঙ্গে মিলন হবে জেনে দাসী অভিভূত হলো। মিলনের সময় দাসী ঋষিকে গভীর ভক্তি ভরে গ্রহণ করল। তাই তার সন্তান বিদুর হলো ধার্মিক ও প্রজ্ঞাবান।

ভাষা হলো এই গল্পের ঋষির বীর্যের মতো। সে বীজ বয়ে আনে। কিন্তু ভাষার জেল্লা বা জীর্ণতা নির্ভর করে ভাষাটিকে সেই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা কীভাবে গ্রহণ করছে তার ওপর।

তাবত জ্ঞানের সম্ভারসহ পৃথিবীর বহু ক্ষীরনদীসম ভাষা লুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের দেশেও আদিবাসীদের গ্রামে ভাষারা আছে ক্রমে হারিয়ে যাবার না-লেখা তালিকায়।

ভাষার একুশ, একুশের ভাষা...

আমরা বলি, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। অর্থাৎ একুশ আমাদের চৈতন্যের ভেতরে জে¦লে রাখে এক শিখা অনির্বাণ। কী সেই চৈতন্য? ভাষা প্রেম? বটে! এই প্রেম কেবল বাংলার জন্য নয়। জবরদস্তিমূলক কেবল ‘বাংলার ঝাণ্ডা ওড়ানো’ নয়। জগতের সব নিপীড়িত ও নিমজ্জিত ভাষার বাঁচার আকুতিকে হৃদয়ঙ্গম করাও একুশের চেতনা। পাহাড়ে মৃত্যুপথযাত্রী হয়েছে যে ভাষা, তার জন্যও দরদ দিয়ে সুরক্ষা বলয় তৈয়ার করা একুশের মর্মকথা।

ভাষার এই প্রেমের অর্থ এমনকি ‘আমার শত্রুর ভাষা’র মধুপান থেকেও আমি বিরত থাকব না। ‘শত্রুদেশের ভাষা’ বলে উর্দুতে গাওয়া কাওয়ালীর মধু আমি নেবো না, ইয়ে নেহি হো সাত্তা! গত ছয় বছরে এমন দিন হাতেগোনা যেদিন আমার কানে নুসরাতজির কাওয়ালির মধুবর্ষণ হয়নি।

কিন্তু তাই বলে কায়দা করে ‘স্বাধীনতা টু পয়েন্ট জিরো’র ইন্টেরিমের মতো যদি বাংলাদেশে ‘উর্দু’কে সংস্কৃতির লেনাদেনার নামে ‘আলগা পিরিতি’র রাজনীতি শুরু হয়, তা তো বরদাশত করা যায় না।  

বাংলা, আমার দুঃখিনী বাংলা...

নিজের ভাষা! আহা! ‘বিনা স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা’! কিন্তু বাংলাভাষা তো আজও তার নিজের দেশেই হয়ে আছে পরবাসী, হয়ে আছে নমশুদ্রসম।

ভাষার টিকে থাকা এবং শক্তি অর্জন করা আজকের যুগে নির্ভর করে ভাষার অর্থনৈতিক উপযোগিতার ওপর। যে ভাষার অর্থনৈতিক উপযোগিতা যত কম, সে ভাষা তত তার গুরুত্ব হারায়। ১৯৪৮ সাল বা ১৯৫২ সালের পূর্বপাকিস্তান আমলের কথা নয়, আজকের যুগেও বাংলা ভাষা বাংলাদেশে যারপরনাই রকম অবহেলিত। এদেশে বাংলার চেয়ে এখনো ইংরেজির গুরুত্ব শত গুণ বেশি। কেননা আমাদের উপনিবেশিত মনের ভাঁজে ভাঁজে ওঁৎ পেতে আছে ফিরিঙ্গীদের ভূত।

ফ্রান্জ ফানোন খুব দারুণভাবে দেখিয়েছেন, ভাষা কী করে উপনিবেশী শক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। উপনিবেশী শক্তির ভাষা রপ্ত করার ভেতর দিয়ে ‘উপনিবেশিত’রাও কখনও ভাবে ‘জাতে ওঠা গেলো বুঝি’!  অথচ ‘লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে’!

 ভূ-ভারত তথা বাংলার কিবলা গত কয়েক শতক ধরেই পশ্চিমমুখী। এই পশ্চিম ওয়েস্টের ক্ষমতার কেন্দ্র অর্থেও, এই পশ্চিম ধর্মীয় কিবলা অর্থেও। বাংলার ওপরে একদিকে আছে ইংরেজির আছর। আরেক দিকে আছে আরবি।

বিলাতের গোলামির জিঞ্জির ছিন্ন হলেও, মনের গোলামি যায়নি। দাসের মন মনিব খোঁজে কেবল। বিলাতের গরিমার দিন ফুরালেও ইউরোপ-আম্রিকার ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে জুলোজুলো চোখে তাকিয়ে থাকা বাঙালির হীনম্মন্যতার অন্ত নেই। 

দেওয়ালে আরবিতে যদি লিখে রাখা হয়, ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন না। করিলে জরিমানা ৫০ টাকা।’ তাহলে সেখানে প্রস্রাব তো বন্ধ হবেই, উপরন্তু সেটিকেও বাঙালের দল সুরা-কালাম ভেবে পারে তো দূর থেকেই সালাম দেওয়ার দশা। আর ইংরেজির ব্যাপারে কী বলব! এদেশের আপামর মানসিকতা হলো, ‘যেহেতু ইংরেেিত বলেছে, ঠিকই বলেছে’!

এই হলো উপনিবেশিত অজ্ঞ মনের চিত্র। ভাষা হলো একটা দুনিয়াবী ব্যাপার। এর সঙ্গে প্রেম-কাম-রাজনীতি ইত্যকার জাগতিক ব্যাপার জড়িত। সেই ভাষাকেই যখন কায়দা করে একটানে দুনিয়াবী জিন্দেগী থেকে আখিরাতের বন্দোবস্ত পর্যন্ত মিলিয়ে দেওয়া হয় এরচেয়ে বড় শয়তানি এবং বড় রাজনীতি আর হয় না। 

বিশ^ায়নের যুগে সব ভাষা ও সংস্কৃতি জগতের সব ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে নেবে, বিকশিত হবে। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, ‘দেবে আর নেবে, মিলাবে মিলিবে’ এতে প্রাণ আছে, সম্মান ও আনন্দ আছে।

কিন্তু যখন আপনি বড়মুখ করে বলবেন, ‘আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না’, তখন আপনার প্রতি কেউ যদি শ্লেষ ভরে ছুঁড়ে দেয় ‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গ বাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’, তাকে আটকাবেন কীভাবে?

ভাষাকেও দাও প্রেম...

বাংলা ভাষাকে শক্তি মান করতে হলে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন করতে হবে। ভাষা হিসেবে বাংলার অর্থনৈতিক উপযোগিতা বাড়াতে হবে।

জার্মান, ফরাসি, জাপানিজ, রাশান বা চীনারা বঙ্গদেশের লোকের চেয়ে ইংরেজি কম জানে না। কিন্তু নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি প্রশ্নে তাদের নীতিগত অবস্থান হলো, অন্যের প্রতি অশ্রদ্ধা বা অভক্তি না রেখেও, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিই তাদের কাছে সর্বাগ্রে। দুনিয়ার জ্ঞান ও বিজ্ঞানকে তারা নিজেদের ভাষায় পরিভাষা করে নিয়েছে। পরিভাষা তৈরিতে আমাদের পরিকল্পনা কই? 

বাংলা আদিতে ছিল ব্রাত্যজনের ভাষা। কিন্তু নিজে হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার পরও ভাষাটিকে শক্তিমান করার পরিকল্পনা দেখা যায়নি। মূল কারণ চিন্তার দৈন্য।

আজকের বাস্তবতায় আমার কাছে একুশের চেতনার অর্থ হলো, এদেশে আরবি ও ইংরেজির আধিপত্য ভাঙা; অর্থপূর্ণভাবে সব স্তরে বাংলাভাষার প্রচলন করা; পরিভাষা তৈরিতে লগ্নি করা; ভাষা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা করা এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক চৈতন্যকে মুছে দেওয়ার পাঁয়তারাকে শক্ত হাতে সম্মিলিতভাবে রুখে দেওয়া।

এই কাজগুলো করা না গেলে একুশে ফেব্রুয়ারির উদযাপন তো আনুষ্ঠানিকতামাত্র। তাই নয় কি?

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক