চরিত্র গঠনের কঠোর সাধনা

রমজান আমাদের সামনে গভীর আত্মসমালোচনার দুয়ার খুলে দেয়। দিনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মানুষকে কেবল শারীরিক অনুশীলনে আবদ্ধ রাখে না, বরং তাকে নিজের ভেতরের মানুষটির মুখোমুখি দাঁড় করায়। রোজা তখন শুধু আহার বিরতি নয়, বরং চরিত্র গঠনের এক কঠোর সাধনা হয়ে ওঠে। জিহ্বার সংযম, দৃষ্টির হেফাজত, অন্তরের পরিশুদ্ধি, সবকিছুর সম্মিলিত নামই রোজা। অনেক সময় আমরা ইবাদতের বাহ্যিক রূপটুকু আঁকড়ে ধরি, কিন্তু ভেতরের সংশোধনকে গুরুত্ব দিই না। অথচ রোজার মূল শিক্ষা হলো গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং খোদাসচেতন জীবন গড়ে তোলা। রমজান আমাদের শেখায়, পাপ ত্যাগ ছাড়া কোনো ইবাদত পূর্ণতা পায় না।

হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ। যখন তোমাদের কেউ রোজা থাকে, সে যেন গর্হিত কথা না বলে এবং মূর্খের ন্যায় কাজ না করে। কেউ যদি তাকে গালি দেয় বা ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।’ (সহিহ বুখারি) অন্য হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ বর্জন করল না, তার (রোজা রেখে) পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি)

বর্ণিত দুই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, রোজা কেবল পানাহার ত্যাগের নাম নয়। বরং রোজার মর্যাদা রক্ষার জন্য আরও কিছু করণীয় রয়েছে। রোজার মর্যাদা রক্ষার্থে শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে অপছন্দনীয় সব কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। নতুবা এই রোজা আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না এবং রোজার কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, রোজার প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়া তথা খোদাভীতি অর্জন। আর খোদাভীরুর প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনেক উপহার। যে ব্যক্তি খোদাভীরু তথা আল্লাহর ব্যাপারে সদা সচেতন হন, তার গোটা মন-মানসিকতা পুরোপুরি বদলে যায়। তিনি তখন সব ধরনের ব্যথা-বেদনা, প্রতিকূলতা এবং বিপদ-আপদ সুন্দরভাবে মোকাবিলা করতে পারেন। তার জন্য তখন সবকিছু সহজ হয়ে যায়।

বান্দাকে মনে রাখতে হবে, আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে যা কিছু আসে তার সব কিছুকেই তিনি তখন মঙ্গলময় ও কল্যাণকর বলে মনে করেন এবং দৃশ্যত কোনো কিছু কঠিন ও পীড়াদায়ক মনে হলেও তিনি তাকে মহান আল্লাহর পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেন। ফলে তার জন্য সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সহজ হয়ে যায়। খোদাসচেতন ব্যক্তি মনে করেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব বিপদ-আপদ, রোগ-শোক ও কঠিন দায়িত্ব আসে তা বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালোবাসারই প্রকাশ। আল্লাহতায়ালা চান, এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলা ও ধৈর্যের মাধ্যমে বান্দা শক্তিশালী হয়ে উঠবেন এবং আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে উঠবেন।

তাকওয়ার নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। হাদিসেও রয়েছে তাকওয়া অর্জনের নানা দিক। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘পবিত্র কোরআন এমন এক মহাগ্রন্থ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যা কেবল খোদাভীরুদেরই পথ দেখায়।’ অর্থাৎ কোরআন মাজিদ থেকে দিকনিদের্শনা পেতে হলে খোদাসচেতন হতে হবে। সুরা বাকারায় খোদাসচেতনদের পরিচয় তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘মুত্তাকি তারা যারা অদেখা বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুজি দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের ওপর, যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের ওপর, যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে।’

দেখুন, আমরা কেউই সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহকে দেখছি না, কিন্তু বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ রয়েছেন এবং তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা। আমরা এ যুগের মানুষরা তো আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল তথা নবী কারিম (সা.)-কেও দেখিনি। তবুও আমরা বিশ্বাস করি, তিনি আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল। সর্বশক্তিমান আল্লাহ এ কারণে শেষ জামানার মুমিনদের জন্য বিশেষ পুরস্কারও রেখেছেন।

লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা