রমজানকে কাজে লাগানোর আহ্বান

মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. আবদুল্লাহ ইবনে আওয়াদ আল-জুহানি রমজান মাসে নেক আমলের গুরুত্ব, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং এ মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তার বান্দাদের কল্যাণের জন্য এমন বরকতময় মৌসুম দান করেছেন, যা প্রতি বছর তাদের কাছে ফিরে ফিরে আসে। তিনি এ সময় ও দিনগুলোকে অন্যান্য সময়ের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এই মাসেই তিনি মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও নেতা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর কোরআন নাজিল করেছেন এবং নেককারদের জন্য ইহসানের মেঘমালা প্রেরণ করেছেন। সুতরাং আমলকারীদের পুরস্কার কতই না চমৎকার! যেন এর মাধ্যমে তিনি তাদের গুনাহ ক্ষমা করেন, অপরাধসমূহ মোচন করেন এবং শান্তির বাগানে (জান্নাত) তাদের সওয়াব ও মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি করেন।

আমি ইমান ও ইসলামের নেয়ামতের জন্য তার প্রশংসা ও শোকরিয়া জানাই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক এবং তার কোনো শরিক নেই। তিনি সর্বদা প্রশস্ত দান ও অফুরন্ত অনুগ্রহ দানকারী। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও তার রাসুল, যিনি সকল সম্মানিত রাসুলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তার ওপর, তার পরিবারবর্গ ও সাহাবিদের ওপর এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করবে, তাদের সবার ওপর অজস্র দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।

হে লোক সকল! আপনারা আপনাদের রবকে ভয় করুন, তার ইবাদত করুন এবং তিনি আপনাদের যা নেয়ামত দিয়েছেন সেটার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। জেনে রাখুন, আপনাদের আঙিনায় এক মহিমান্বিত মাস ও মহান মৌসুম উপস্থিত হয়েছে। এর মধ্য থেকে ইতিমধ্যে দুটি দিন অতিবাহিত হয়েছে এবং দিনগুলো একের পর এক গত হচ্ছে। বিগত বছরগুলোর মতোই এটি দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। এই মাসটি ছায়ার মতো হালকা, কিন্তু কল্যাণে ভরপুর। মহান আল্লাহ এই মাসটিকে অন্য সকল মাসের ওপর মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন এবং মুমিনদের ওপর এর রোজা ফরজ করেছেন।

মুমিনদের কাছে এর চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি। আর মুনাফিকদের কাছে এর চেয়ে কষ্টের কোনো মাস আসেনি। এটি মুমিনের জন্য গণিমত এবং তার পক্ষে সাক্ষী। অন্যদিকে মুনাফিকের জন্য এটি আফসোসের কারণ এবং তার বিপক্ষে সাক্ষী।

হে আল্লাহর বান্দারা! রমজানে নবীজি (সা.) এবং তার সাহাবিদের জীবন ছিল মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান, উম্মতের কল্যাণ এবং তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে নাজাতের পথে ডাকার জীবন। তাদের রাত কাটত তাহাজ্জুদে এবং দিন কাটত কর্মব্যস্ততায়। তাদের জীবন কেবল ঘুম, অলসতা, নির্জীবতা কিংবা অনর্থক কাজে রাত জাগার নাম ছিল না।

মহান আল্লাহ সকলকে হেফজত করুন। জেনে রাখুন, রোজা কেবল এজন্যই প্রবর্তন করা হয়েছে, যেন মুমিন তাকওয়া অর্জন করতে পারে। এটি ইমানের অন্যতম ভিত্তি, মুমিনের অনন্য গুণ এবং আমল কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের আমল কবুল করেন। একজন মুসলমানের উচিত, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সকল হারাম করা কাজ থেকে দূরে রাখা। তাই সে সকল হারাম কাজ যেমন জুলুম, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, অন্যের অধিকার হরণ এবং হারাম জিনিসের দিকে তাকানো বা শোনা বর্জন করবে। সে সকল মিথ্যা কথা, গিবত, চোগলখোরি ও গালিগালাজ ত্যাগ করবে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা মন্দ কথা বলে, তবে সে যেন বলে ‘আমি রোজাদার’ এবং প্রতিউত্তরে গালি না দেয়।

হে রোজাদার! আপনার রোজার দিন এবং সাধারণ দিন যেন এক সমান না হয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা, মন্দ কাজ ও মূর্খতা পরিহার করল না, তার পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (সুনানে আবু দাউদ ২৩৬২) যখন কোনো মুসলিম জানবে যে, রোজা তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম, তখন সে তার রোজাকে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সকল ত্রুটি থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হবে। একজন মুসলিমের জন্য এটাই সমীচীন যে, সে তার পুরো সময় আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ ও তার অসন্তুষ্টি থেকে এবং ইমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন সব গুনাহ থেকে দূরে রাখবে। এমন লোকদের জন্যই রয়েছে উচ্চ মর্যাদা এবং তারা জান্নাতে নিরাপদ থাকবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

সুতরাং আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন, রমজানের মেহমানদারি করুন এবং এর দিন ও রাতের সম্মান রক্ষা করুন। আল্লাহকে এমন কিছু আমল করে দেখান, যাতে তিনি আপনাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। বেশি বেশি নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, সদকা, জিকির, মানুষকে ক্ষমা করা, ইহসান, সুন্দর কথা এবং উপকারের মাধ্যমে এ সময়ের সদ্ব্যবহার করুন। নিজেদের মধ্যকার শত্রুতা ও বিদ্বেষ দূর করুন।

অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে, অভাবের আগে সচ্ছলতাকে, বার্ধক্যের আগে যৌবনকে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে কাজে লাগান। আল্লাহর রহমতের সন্ধানে থাকুন এবং তার দরজায় বিনত হোন, নিশ্চয়ই তিনি পরম দাতা ও মহান। তার কাছে আকুতি জানান, নিশ্চয়ই তিনি দয়ালু ও মেহেরবান। মুক্তির পথ খুঁজুন, নিরাপত্তার উপকরণ আঁকড়ে ধরুন এবং আল্লাহর কাছে তৌফিক ও সাহায্য প্রার্থনা করুন।

হে আল্লাহ, আমাদের রমজানের রোজা ও কিয়াম (তারাবি ও তাহাজ্জুদ) পালন করার এবং এর সীমারেখা রক্ষা করার তৌফিক ও সাহায্য দান করুন। আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন এবং আমাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করুন। আমাদের নেককারদের পথে পরিচালিত করুন এবং আমাদের ও সকল মুসলিমকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী ও পরম ক্ষমাশীল।

আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। একজন মুসলমানের উচিত, আল্লাহর জন্য নিয়তকে খাঁটি করা এবং আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখা। রোজার কিছু আদব আছে, যা পালন করা জরুরি এবং কিছু রোজা ভঙ্গকারী বিষয় আছে, যা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। আল্লাহর রাসুল (সা.) দ্রুত ইফতার করা এবং দেরিতে সাহরি করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের ওপর থাকবে যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করবে। (সহিহ মুসলিম ১০৯৮)

হে মুসলিমগণ! এই মহান মৌসুমে কঠোর পরিশ্রম করুন। আমাদের কেউ জানে না, আগামী বছর সে এই সময়টি পাবে কিনা। এগুলো মাত্র কয়েকটি দিন, কেবল দুর্ভাগারাই এর বরকত ও রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। কোথায় সেই প্রতিযোগীরা, যারা নেক আমলের মাধ্যমে এই সুযোগ কাজে লাগাবে? আল্লাহর রহমতের সুবাতাস গ্রহণ করুন এবং যখনই সুযোগ পান তার করুণার সন্ধানে থাকুন। এই দিনগুলোতে ফজিলত অনেক বেশি এবং এর প্রতিদানও অত্যন্ত মূল্যবান।

এ সময়ে দোয়া কবুল হয় এবং কাক্সিক্ষত বস্তু দান করা হয়।

হে আল্লাহর বান্দারা! কেয়ামতের সেই কঠিন দিনে যিনি আমাদের আশ্রয় ও সুপারিশকারী হবেন, সেই নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করুন। হে আল্লাহ! খোলাফায়ে রাশেদিন, সকল সাহাবি এবং কেয়ামত পর্যন্ত তাদের অনুসারীদের ওপর সন্তুষ্ট হোন। হে আল্লাহ! তাদের ভালোবাসার বরকতে আমাদের উপকৃত করুন এবং আমাদেরকে তাদের দলভুক্ত করুন। হে দয়ালু! আমাদেরকে তাদের সুন্নাহ ও পথ থেকে বিচ্যুত করবেন না। হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায্য করুন এবং আপনার অনুগ্রহে সত্য ও দ্বীনের পতাকাকে সমুন্নত করুন। হে আল্লাহ! মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করুন। ফিলিস্তিনের দুর্বল মুসলমানদের মুক্তি দিন এবং তাদের সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক হোন। হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাই, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল। আমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করুন। আমাদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। আমাদের পাপের কারণে আপনার অনুগ্রহ থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না। আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। আমাদের তওবা কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি পরম তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান