পথশিশুর প্রতি অবহেলা নয়

শহরের ব্যস্ত সড়ক, রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম কিংবা উড়ালসেতুর ছায়ায় প্রতিদিন আমাদের চোখে পড়ে কিছু অবহেলিত মুখ। তাদের শৈশব নেই, নিরাপত্তা নেই, নিশ্চিন্ত ঘুম নেই। আছে শুধু অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। তারা আমাদেরই সমাজের সন্তান, অথচ সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। সভ্যতার অগ্রযাত্রা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার ছায়াতলে থাকা দুর্বল মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটে। পথশিশুরা অধিকারবঞ্চিত নাগরিক। তাদের প্রতি সহমর্মিতা ও দয়া প্রদর্শন কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং ইমানি দাবি। আর এই রহমতের রমজানে তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন হতে পারে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।

তারা দান-সদকা ও সাহায্য গ্রহণে অধিক উপযুক্ত। কারণ সমাজে সবচেয়ে অসহায় ও দুঃখী এই মানবগোষ্ঠী। সামর্থ্যবানদের উচিত নিজেদের দান-সদকার একটা অংশ পথশিশুদের জন্য রাখা। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তাদের (বিত্তশালীদের) ধনসম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সুরা জারিয়াত ১৯)

হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা বান্দার সাহায্যে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ সে অপর ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম) মানুষ রমজান মাসে প্রচুর দান-সদকা করে। কেননা এ মাসে ইবাদতের সওয়াব অনেক বেশি। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানে একটি নফল ইবাদত করল, সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ ইবাদত করল। (সহিহ ইবনে খুজাইমা) সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না, এ মাসে কেউ পথশিশুদের সাহায্য করলে, অন্য মাসের তুলনায় সত্তর গুণ বেশি সওয়াব পাবে। পথশিশুদের সাহায্য করার কিছু দিক তুলে ধরা হলো।

অভিভাবকত্ব গ্রহণ : আদর্শ সমাজসভ্যতা থেকে পথশিশুদের পিছিয়ে থাকার একটি বিশেষ কারণ হলো, দায়িত্বশীল অভিভাবক শূন্যতা। এ ক্ষেত্রে সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা ছোট থেকেই তাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করলে আলোকিত হবে তাদের জীবন। যেমন রাসুল (সা.) ছিলেন জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)-এর অভিভাবক। অসহায় জায়েদকে তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তার প্রতি নবীজির পিতৃসুলভ স্নেহ সবসময় ছিল।

খাদ্য সহায়তা : পথশিশুরা অধিকাংশ সময় খাদ্য সংকটে থাকে। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটে তাদের রাত-দিন। তাদের সামান্য রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয় বোতল কুড়িয়ে এবং ফুল, মাস্ক, চা-কফি ইত্যাদি বিক্রি করে। তাদের খাদ্যের প্রয়োজন মেটানো প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের দায়িত্ব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষুধার্তকে খাদ্য দানকারী ব্যক্তি সর্বোত্তম আমলকারী।’ (সহিহ বুখারি)

পরিধেয় প্রদান : পথশিশুদের বস্ত্রহীনতা সম্পর্কে কিছু বলার অবকাশ রাখে না। রাস্তা-ঘাটে চলাফেরায় খুব ভালোভাবেই তা দৃষ্টিগোচর হয়। তাই রমজান উপলক্ষে এদিক থেকেও তাদের সাহায্য করা যেতে পারে। রাসুল (সা.)-ও সাহাবিদের উৎসাহ দিতেন এ ব্যাপারে। তিনি বলেছেন, ‘যে মুসলমান অপর কোনো মুসলমানকে বস্ত্রহীন অবস্থায় বস্ত্রদান করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে সবুজ বর্ণের পোশাক পরাবেন। খাদ্য দান করলে তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। পানি পান করালে জান্নাতের শরবত পান করাবেন।’ (আবু দাউদ)

বাসস্থানের ব্যবস্থা করা : পথশিশুদের বসবাস সাধারণত নদীর ধারে বস্তিতে এবং বিশাল হাইওয়ের পাশে ফুটপাতে পলিথিনের তাঁবু সদৃশ ঘরে হয়ে থাকে। অথবা দীর্ঘদিন যাবত স্টেশনে পড়ে থাকা রেলের জংধরা বগিতে। ঝড়, বৃষ্টি, খরা ও শীতের প্রতিকূল পরিবেশে তারা বেড়ে ওঠে। রমজান উপলক্ষে তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা সবচেয়ে উত্তম ও অতি প্রয়োজন।

চিকিৎসা প্রদান : উন্নত চিকিৎসা বলতে কিছু নেই পথশিশুদের জন্য। দেশের যত বড় বড় হাসপাতাল, সবই বিত্তবানদের জন্য। পথশিশুদের জন্য তেমন কিছু নেই। কিংবা থাকলেও যৎসামান্য। তাই তাদের জন্য পৃথক চিকিৎসাকেন্দ্র যদি থাকে, তাহলে হয়তো তাদের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসবে।

শিক্ষার ব্যবস্থা করা : পথশিশুদের শিক্ষার হার শূন্যের কোঠায়। এর একটি বড় কারণ হলো অবহেলা, অযত্ন ও অনাদরে তাদের বেড়ে ওঠা। বর্তমান সমাজ তাদের অত্যন্ত হীন প্রকৃতির ভাবে। শুধু যে সামাজিক পর্যায়ে তা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তারা অবহেলিত। এদিক থেকে যদি সমাজের লোকজন স্বতঃস্ফূর্ত মনে তাদের দিকে এগিয়ে যায় এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আশা করা যায় তাদের মধ্যে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে। যেমনটা নবীজির জীবন থেকে জানা যায়। তিনি মসজিদে নববির পাশে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার নাম আসহাবুস সুফফা। এখানে গরিব মুসলমানরা এসে শিক্ষা গ্রহণ করত। নবীজি নিজে তাদের সাহায্য করতেন। সাহাবিদেরও এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক