ভাষা নিয়ে দুটি কথা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে, ভাষার সুবিশাল ক্যানভাসে এসপ্যারান্তো থেকে শুরু করে বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী ভাষা পর্যন্ত যে বৈচিত্র্য, তা নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

একজন স্বপ্নদ্রষ্টার ভাষাগত বিপ্লব

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পোল্যান্ডের বিয়ালিস্তক শহরে যখন লুদভিক লাজার জামেনহফ বড় হচ্ছিলেন, তখন তিনি দেখেছিলেন কীভাবে ভাষা মানুষের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলে দেয়। সেই শহরে ইহুদি, পোলিশ, জার্মান এবং রাশিয়ানরা বাস করত, কিন্তু তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের চেয়ে ঘৃণাই ছিল প্রবল। জামেনহফ বিশ্বাস করতেন, যদি পৃথিবীর সব মানুষের জন্য একটি সাধারণ এবং নিরপেক্ষ ভাষা থাকে, তবে যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতা কমে আসবে। এই মহৎ ও মানবিক চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় এসপ্যারান্তো। এটি কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা দেশের সম্পত্তি নয়, বরং এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ভাষা, যা আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। জামেনহফ চেয়েছিলেন ভাষাটি হবে অত্যন্ত সহজবোধ্য। তাই তিনি এর ব্যাকরণকে মাত্র ষোলোটি মৌলিক নিয়মে বেঁধে দিয়েছিলেন, যেখানে কোনো ব্যতিক্রম নেই। অথচ প্রাকৃতিক ভাষাগুলোতে হাজারো ব্যাকরণগত জটিলতা এবং অনিয়ম থাকে। এসপ্যারান্তোর এই গাণিতিক সরলতা একে অনন্য করে তুলেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত মহৎ উদ্দেশ্য এবং সহজ কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন এটি ইংরেজি বা স্প্যানিশের মতো বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করতে পারল না? এর কারণ সম্ভবত ভাষার সেই নিরপেক্ষতাই তার দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একটি ভাষার পেছনে যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি, বিশাল সেনাবাহিনী বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থাকে না, তখন তা কেবল তাত্ত্বিকভাবে জনপ্রিয় হলেও ব্যবহারিকভাবে পিছিয়ে পড়ে।

প্রাকৃতিক বনাম কৃত্রিম

ভাষার জন্ম কি ল্যাবরেটরিতে সম্ভব, নাকি এটি মাটির গভীরে প্রোথিত কোনো শিকড়ের মতো, যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃদ্ধি পায়? প্রাকৃতিক ভাষাগুলো হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, যুদ্ধ এবং মানুষের যাপনের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়। একটি শব্দ যখন কেউ উচ্চারণ করে, তার পেছনে থাকে শত বছরের আবেগ। কিন্তু এসপ্যারান্তো বা ভোলাপুকের মতো পরিকল্পিত ভাষাগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে। ভোলাপুক ভাষাটি ছিল অত্যন্ত জটিল, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে চলে গিয়েছিল। অন্যদিকে এসপ্যারান্তো সহজ হলেও তাতে সেই ‘সাংস্কৃতিক ঘ্রাণ’ ছিল না যা একটি শিশুকে তার মায়ের মুখে শেখা ভাষায় আকৃষ্ট করে। মানুষ যখন কথা বলে, সে কেবল তথ্য আদান-প্রদান করে না, সে তার অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়। পরিকল্পিত ভাষাগুলো কেবল একটি যন্ত্র বা টুলের মতো কাজ করে, কিন্তু তা মানুষের আত্মার গভীরকে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মানুষ এমন ভাষাকেই আপন করে নিয়েছে, যা তাকে একটি পরিচয়ের সুযোগ দিয়েছে, কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়।

অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম

বাংলা ভাষার রক্তক্ষয়ী ইতিহাস এবং একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা এই আলোচনায় এক অনন্য ও অনিবার্য মাত্রা যোগ করে। যেখানে লুদভিক জামেনহফ একটি পরিকল্পিত ও কৃত্রিম ভাষার মাধ্যমে বিশ্বশান্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেখানে বাঙালি জাতি প্রমাণ করেছে যে, ভাষার অধিকার কোনো গাণিতিক ছকে নয়, বরং অস্তিত্বের গহিন মূলে প্রোথিত থাকে। ১৯৫২ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তখন তা কেবল একটি ভাষার অধিকারের লড়াই ছিল না; সেটি ছিল একটি জাতির হাজার বছরের আত্মপরিচয় রক্ষার চূড়ান্ত সংগ্রাম। শোষক গোষ্ঠী যখন কোনো জাতিকে পরাধীন করতে চায়, তারা প্রথমেই আঘাত হানে সেই জাতির ভাষার ওপর কারণ ভাষাই হলো চিন্তার বাহন। এসপ্যারান্তো যেমন একটি নিরপেক্ষ বিশ্বভাষা হতে চেয়েছিল কৃত্রিম সমঝোতার মাধ্যমে, একুশে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীকে শিখিয়েছে যে, কোনো ভাষা বা সংস্কৃতিকে ক্ষমতার জোরে বা বুলেটের আঘাতে দমন করা সম্ভব নয়।

এটি বিশ্ব ইতিহাসের এক বিরল ও গর্বিত অধ্যায়, যেখানে মাতৃভাষার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে একদল তরুণ রাজপথে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের সেই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, মানুষের আবেগ যখন তার ভাষার সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা যেকোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য সংগঠিত গণআন্দোলনের মাধ্যমে শহীদ হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং বাংলা ভাষা আন্দোলন সেই বিরলতম উদাহরণগুলোর একটি। আজ যখন ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মাধ্যমে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে, তখন এটি কেবল বাঙালির জয় নয়, বরং পৃথিবীর বিলুপ্তপ্রায় এবং প্রান্তিক সব জনগোষ্ঠীর নিজ নিজ ভাষায় কথা বলার অধিকারের এক বিশ্বজনীন প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চেতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি ভাষা টিকে থাকার জন্য কেবল ব্যাকরণগত সরলতা বা বৈশ্বিক প্রচার যথেষ্ট নয়, তার পেছনে মানুষের অদম্য আবেগ, ত্যাগ এবং অটুট অঙ্গীকার থাকতে হয়। বাংলা ভাষা আজ কেবল একুশের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিশ্বের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকা বিপন্ন ভাষাগুলোর জন্য সাহসের নাম। ভাষার এই সংগ্রাম আমাদের শেখায় যে, একটি কৃত্রিম ভাষা হয়তো পৃথিবী জুড়তে পারে, কিন্তু একটি প্রাকৃতিক মাতৃভাষা একটি জাতির আত্মাকে ধারণ করে।

প্রান্তিক ও ব্যতিক্রমী ভাষার বৈচিত্র্য

ভাষার বৈচিত্র্য যে কত বিস্ময়কর হতে পারে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। আমরা সাধারণত সময়কে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে ভাগ করে দেখি। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু ভাষা আছে যেখানে ভবিষ্যৎ কাল বলে কিছু নেই। যেমন মান্দারিন চীনা ভাষায় ক্রিয়ার আলাদা ভবিষ্যৎ কাল নেই; সময় বোঝাতে প্রসঙ্গ, কালবাচক শব্দ বা কণিকা ব্যবহৃত হয়।  আবার অস্ট্রেলিয়ার গুগু ইমিথির জাতির মানুষের ভাষার দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের ভাষায় আমাদের চেনা ‘ডান’ বা ‘বাম’ বলে কোনো শব্দ নেই। তারা সবসময় দিকনির্দেশনার জন্য উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব বা পশ্চিম ব্যবহার করে। এমনকি যদি তাদের ঘরের ভেতর কোনো জিনিসের অবস্থান বলতে হয়, তারা বলবে ‘চামচটি তোমার হাতের উত্তর দিকে আছে’। এটি প্রমাণ করে যে, ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের চারপাশের জগৎকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। আবার তুরস্কের কিছু দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মানুষ শিসের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে কথা বলে, যাকে বলা হয় ‘পাখির ভাষা’। আমাজনের গহিনে এমন কিছু ভাষা আছে যেখানে একটিমাত্র শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য। এই যে ভাষার বৈচিত্র্য, এটিই মানবসভ্যতার আসল সৌন্দর্য।

ভাষার বিশ্বায়ন ও রাজনীতি

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো ভাষা কেবল তার গুণগত মানের জন্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে না, বরং এর পেছনে থাকে উপনিবেশ এবং বাণিজ্যের ভূমিকা। ইংরেজি আজ বিশ্বভাষা কারণ এক সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পৃথিবীর বিশাল অংশ শাসন করেছিল। স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষার বিস্তার ঘটেছিল দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে। ভাষা এখানে শোষণের এবং শাসনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফরাসি ভাষা একসময় অভিজাত শ্রেণির প্রতীক ছিল কারণ ফ্রান্স ছিল শিল্পকলা ও কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এসপ্যারান্তো এই দিক থেকে পিছিয়ে ছিল কারণ এর পেছনে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ছিল না। কোনো দেশ আক্রমণ করে এসপ্যারান্তো চাপিয়ে দেয়নি, কোনো বড় কোম্পানি একে বাণিজ্যের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেনি। ফলে এটি কেবল একটি আদর্শবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। ভাষার এই যে শক্তির খেলা, এটিই নির্ধারণ করে দেয় কোন ভাষা রাজত্ব করবে আর কোন ভাষা কোণঠাসা হয়ে থাকবে।

ভাষা রক্ষা ও তৈরি

বর্তমান বিশ্বে প্রতিদিন কোনো না কোনো আদিবাসী ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। যখন একটি ভাষা বিলুপ্ত হয়, তখন কেবল কিছু শব্দ হারিয়ে যায় না, বরং সেই ভাষার সঙ্গে জড়িত হাজার বছরের লোকজ জ্ঞান, ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতি এবং বিশ্বতত্ত্ব হারিয়ে যায়। অন্যদিকে আমাদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুগে নতুন নতুন কৃত্রিম ভাষা তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। এখন প্রশ্ন জাগে, আমাদের কি নতুন ভাষা বানানো বেশি জরুরি, নাকি পুরনো ভাষাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা? বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো হলো পৃথিবীর জীবন্ত জাদুঘর। একটি ভাষা যখন বক্তাশূন্য হয়ে পড়ে, তখন সেই সংস্কৃতির আত্মাটিও মারা যায়। এসপ্যারান্তোবাদীরা যে বিশ্বভ্রাতৃত্বের স্বপ্ন দেখেন, তা হয়তো অনেক পুরনো ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামের মাধ্যমেই সফল হতে পারত। কৃত্রিম ভাষা ভবিষ্যতের দিকে তাকায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলো আমাদের শেখায় আমরা কোথা থেকে এসেছি। এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা আজকের বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জ।

ডিজিটাল বাস্তবতা

আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিমেষেই এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করে দিচ্ছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে এসপ্যারান্তোর মতো ভাষাগুলো এখন নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে অনলাইনে গড়ে উঠছে এসপ্যারান্তো কমিউনিটি। কিন্তু প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে আমাদের কি সত্যিই একটি নিরপেক্ষ ডিজিটাল ভাষার প্রয়োজন আছে? ইন্টারনেটে এখন ইংরেজির একচ্ছত্র আধিপত্য, যা অন্য ভাষাভাষীদের জন্য এক ধরনের ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি করছে। এআই যদি এমন কোনো গাণিতিক ভাষায় কাজ করে, যা সব ভাষার জন্য সমানভাবে কার্যকর, তবে হয়তো জামেন হফের সেই স্বপ্নটি নতুন রূপে ধরা দিতে পারে। তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরপেক্ষতা আসলেও তাতে মানুষের আবেগ আর অনুভূতির ছোঁয়া কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। ভবিষ্যতের পৃথিবী হয়তো দ্বিভাষিক বা বহুভাষিক হবে, যেখানে একদিকে থাকবে যান্ত্রিক যোগাযোগের সহজ ভাষা এবং অন্যদিকে থাকবে মানুষের নিজস্ব আবেগের মাতৃভাষা।

পরিশেষে বলা যায়, ভাষা কেবল মুখনিঃসৃত ধ্বনি নয়, এটি মানুষের পরিচয় এবং ইতিহাসের ধারক। এসপ্যারান্তো আমাদের শেখায় এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে আর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক ভাষাগুলো আমাদের শেখায় মাটির সঙ্গে মিশে থাকা হাজার বছরের শেকড়কে সম্মান করতে। এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই গড়ে উঠতে পারে এক সুন্দর বিশ্ব, যেখানে কোনো ভাষা অন্য ভাষাকে শাসন করবে না, বরং প্রতিটি ভাষা হবে একে অপরের পরিপূরক।