দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রত্যেক মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় স্থান পেয়েছেন গাজীপুরের গর্বিত সন্তানরা। কিন্তু স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম রাজধানীর অদূরে শিল্পঅধ্যুষিত গুরুত্বপূর্ণ জেলা গাজীপুর থেকে মন্ত্রীসভায় কারও স্থান হয়নি। দেশ স্বাধীন,অর্থনীতি, রাজনীতি ও শিল্প খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এ জেলার কারও সদ্য মন্ত্রীসভায় স্থান না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশায় ভুগছেন বাসিন্দারা। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও।
গাজীপুরবাসী, দলীয় নেতাকর্মী ও জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে ১৯ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা ও বাঙালি সৈনিকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গাজীপুর থেকে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠে। আর স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন গাজীপুরের কাপাসিয়ার গর্বিত সন্তান তাজউদ্দীন আহমদ। শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, রাজধানীর অদূরে শিল্পঅধ্যুষিত জেলা গাজীপুর দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিল্পখাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তৈরি পোশাক শিল্প, ভারী ও মাঝারি শিল্পকারখানা, কৃষি উৎপাদন ও দ্রুত বর্ধনশীল নগরায়ণের কারণে জাতীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এই জেলা।
স্বাধীনতার পর সব সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে গাজীপুরের ৫টি আসনের কেউ না কেউ প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও জেলার অনেক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী।
বেগম খালেদা জিয়ার আমলে গাজীপুর থেকে আ স ম হান্নান শাহ ও এম এ মান্নান মন্ত্রীসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। এমনকি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলেও মন্ত্রীসভায় স্থান ছিল এ জেলার একাধিক প্রতিনিধি। অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে গাজীপুর থেকে অন্তত একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরের পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা।
বিএনপির জয়ী প্রার্থীরা হলেন- গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর ও সিটির একাংশ) আসনে মেয়র মজিবুর রহমান, গাজীপুর-২ (সদর ও টঙ্গী) আসনে এম মঞ্জুরুল করিম, গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর ও সদরের একাংশ) আসনে এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু ও গাজীপুর-৫ (কালিগঞ্জ ও সদরের একাংশ) আসনে এ কে এম ফজলুল হক মিলন। কিন্তু এবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর মন্ত্রীসভায় তাদের কারও স্থান হয়নি। এদের মধ্যে গাজীপুর-১ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মেয়র মজিবুর রহমানের নাম মন্ত্রীসভায় গুঞ্জন উঠলেও মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী তালিকায় তারও নাম নেই। এদিকে গুরুত্বপূর্ণ জেলা গাজীপুর থেকে মন্ত্রীসভায় কারও নাম না থাকায় জেলা-উপজেলা, মহানগর, পৌর বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয়, মন্ত্রীসভায় গুরুত্বপূর্ণ এ জেলার কেউ না থাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও।
তাদের ভাষ্য, মন্ত্রীসভা গঠনে আঞ্চলিক ভারসাম্য, অভিজ্ঞতা ও দলীয় কৌশল বিবেচনায় নেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে গাজীপুরের মতো শিল্পসমৃদ্ধ ও জনবহুল জেলা থেকে কাউকে অন্তর্ভুক্ত না করায় আলোচনা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। মন্ত্রী হওয়া শুধু রাজনৈতিক পদ নয়, এটি উন্নয়নের একটি মাধ্যম। গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় বাসিন্দারা হতাশ হয়েছেন। তাই মন্ত্রী হলে এখানকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতো। তবে উন্নয়নের লক্ষ্যে গাজীপুরের কাউকে মন্ত্রীসভায় রাখার দাবী জানিয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীসহ এখানকার সর্বস্তরের মানুষ।
গাজীপুর জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও কালিয়াকৈর পৌর বিএনপির সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক ছানোয়ার হোসেন খান বলেন, গাজীপুরে পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটি আসনে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এদের মধ্যে গাজীপুর-১ আসন থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থী মেয়র মজিবুর রহমান। আমরা আশা করেছিলাম, মন্ত্রীসভায় তার ডাক পড়বে। কিন্তু ঘোষিত মন্ত্রীসভায় গাজীপুর থেকে কারও নাম নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের দাবি, তিনি যেন গাজীপুরবাসীর এ প্রত্যাশা পূরণ করেন।
এ ব্যাপারে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) কাজী ছায়েদুল আলম বাবুল বলেন, দল সরকার গঠন করেছে, এতে আমরা আনন্দিত। কিন্তু গাজীপুর থেকে কেউ মন্ত্রীসভায় না থাকায় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক ধরণের আক্ষেপ কাজ করছে। আমরা করছি, ভবিষ্যতে মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণ হলে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি বিবেচনায় নিবেন।