মানব ইতিহাসের এক নির্ধারণী মুহূর্তে, এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬-এ সমগ্র বিশ্ব নয়াদিল্লিতে একত্রিত হয়। ভারতে আমাদের জন্য, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত রাষ্ট্রপ্রধানগণ, সরকারপ্রধানবৃন্দ, প্রতিনিধিগণ ও উদ্ভাবকদেরকে স্বাগত জানাতে পারাটা ছিল অপরিসীম গর্ব ও আনন্দের একটি মুহূর্ত।
ভারত যা কিছু করে, তা ব্যাপকতা ও উদ্যম নিয়ে করে এবং এই শীর্ষ সম্মেলনটিও এর ব্যতিক্রম নয়। ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিগণ একত্রিত হয়েছিলেন। উদ্ভাবকবৃন্দ সর্বাধুনিক এআই পণ্যসম্ভার ও পরিষেবাসমূহ প্রদর্শন করেছেন। প্রদর্শনী হলগুলোতে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে আর নানান সম্ভাবনার কল্পনা করতে দেখা গেছে। তাদের কৌতূহলই এটিকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক গণতান্ত্রিক এআই শীর্ষ সম্মেলনে পরিণত করেছে। আমি এটিকে ভারতের উন্নয়ন যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখি, কারণ এআই উদ্ভাবন ও গ্রহণকে কেন্দ্র করে একটি গণআন্দোলন সত্যিকার অর্থেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
সভ্যতার গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়ার মতো অনেক প্রযুক্তিগত রূপান্তর মানব ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগুন, লিখন, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের মতোই সেই একই স্তরে অবস্থান করছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে, পূর্বে কয়েক দশক সময় লেগে যাওয়া পরিবর্তনগুলো এখন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঘটতে পারে এবং সমগ্র পৃথিবীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
যন্ত্রগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বুদ্ধিমান করে তুলছে, কিন্তু সেটার চেয়েও বড় কথা হলো, এটি মানব অভিপ্রায়ের জন্য অধিকতর শক্তি-বর্ধক একটি মাধ্যম। এআই-কে যন্ত্রকেন্দ্রিক নয়, বরং মানবকেন্দ্রিক করে তোলাটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই শীর্ষ সম্মেলনটিতে, আমরা ‘সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায়’ (সকলের ভাল, সকলের সুখ) নীতি অনুসরণ করে বৈশ্বিক এআই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মানবকল্যাণকে স্থান দিয়েছি।
আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি যে প্রযুক্তি অবশ্যই মানুষের সেবা করবে, এর উল্টোটা নয়। তা সে ইউপিআই-এর মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট হোক বা কোভিড-এর টিকাকরণ হোক, আমরা নিশ্চিত করেছি যেন ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার কাউকে পেছনে ফেলে না রেখে সবার কাছে পৌঁছে যায়। এই শীর্ষ সম্মেলনটিতে কৃষি, নিরাপত্তা, দিব্যাঙ্গজনদের জন্য সহায়তা ও বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের উদ্ভাবকদের কাজের মধ্যেও এই একই চেতনা আমি দেখতে পেয়েছি।
ভারতে ইতিমধ্যেই এআই-এর ক্ষমতায়নের সম্ভাবনার কিছু উদাহরণ বিদ্যমান রয়েছে। সম্প্রতি, ভারতীয় দুগ্ধ সমবায় প্রতিষ্ঠান আমূল (AMUL) কর্তৃক শুরু করা এআই-চালিত ডিজিটাল সহকারী ‘সরলাবেন’ (Sarlaben) ৩.৬ মিলিয়ন দুগ্ধ খামারিকে, যাঁদের অধিকাংশই নারী, তাঁদের নিজস্ব ভাষায় গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা সম্পর্কে রিয়েল-টাইম দিকনির্দেশনা প্রদান করছে। একইভাবে, ‘ভারত বিস্তার’ (Bharat VISTAAR) নামে একটি এআই-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম কৃষকদেরকে বহুভাষিক সহায়তা প্রদান করছে, যা আবহাওয়া থেকে শুরু করে বাজারদর পর্যন্ত সবকিছু সম্পর্কে তথ্য দিয়ে তাঁদেরকে ক্ষমতায়িত করে তুলছে।
মানুষ কখনোই কেবলমাত্র তথ্যবিন্দু বা যন্ত্রের কাঁচামালে পরিণত হতে পারে না। বরং, এআই-কে বৈশ্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে একটি হাতিয়ারে পরিণত হতে হবে, যা গ্লোবাল সাউথের জন্য অগ্রগতির নতুন দ্বার উন্মোচন করবে। এই দর্শনকে বাস্তবে রূপদান করতে, ভারত মানব-কেন্দ্রিক এআই পরিচালনা ব্যবস্থা ‘মানব’ (MANAV) কাঠামো উপস্থাপন করেছে।
M – Moral and Ethical Systems (নৈতিক ও আদর্শিক মূল্যবোধের ব্যবস্থা): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নৈতিক নীতিমালার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উচিত।
A – Accountable Governance (জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা): স্বচ্ছ নিয়মকানুন ও শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা থাকতে হবে।
N – National Sovereignty (জাতীয় সার্বভৌমত্ব): তথ্যের ওপর জাতীয় অধিকার ও নিয়ন্ত্রণের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে।
A – Accessible and Inclusive (সহজপ্রাপ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক): এআই যেন কোনো একচেটিয়া ব্যবস্থায় পরিণত না হয়।
V – Valid and Legitimate (বৈধ ও গ্রহণযোগ্য): এআই-কে আইন মেনে চলতে হবে এবং এর কার্যক্রম যাচাইযোগ্য হতে হবে।
‘মানব’ (MANAV), যার অর্থ হলো ‘মানুষ’, এমন নীতিমালা উপস্থাপন করে যা একবিংশ শতাব্দীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভিত্তিবদ্ধ রাখে।
বিশ্বাস হলো সেই ভিত্তি, যার ওপর এআই-এর ভবিষ্যত স্থিত থাকে। জেনারেটিভ সিস্টেমগুলো যখন বিশ্বজুড়ে কন্টেন্ট তৈরি করছে, তখন গণতান্ত্রিক সমাজগুলো ডিপফেক আর বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। ঠিক যেমন খাদ্যে পুষ্টির লেবেল থাকে, তেমনি ডিজিটাল কন্টেন্টেও বিশ্বাসযোগ্যতার লেবেল থাকা উচিত। আমি বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে ওয়াটারমার্কিং ও উৎস যাচাইয়ের জন্য সমন্বিত মানদণ্ড তৈরি করার লক্ষ্যে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানাই। ভারত ইতিমধ্যেই কৃত্রিমভাবে তৈরিকৃত কন্টেন্টের ক্ষেত্রে স্পষ্ট লেবেলিং করাটাকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে এই লক্ষ্যেই একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
আমাদের সন্তানদের কল্যাণ আমাদের হৃদয়ের খুব কাছের একটি বিষয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সিস্টেমগুলো এমনভাবে বিনির্মাণ করতে হবে যাতে সেগুলোতে সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে যা দায়িত্বশীল, পরিবার-নির্দেশিত সম্পৃক্ততাকে উৎসাহিত করবে, যা বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আমাদের একই ধরণের যত্নের প্রতিফলন ঘটায়।
প্রযুক্তি তার সর্বোচ্চ সুফল দেয় তখনই, যখন সুরক্ষিত কৌশলগত সম্পদ হিসেবে না রেখে বরং এটিকে সহভাগিতা করে নেওয়া হয়। উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মগুলো প্রযুক্তিকে আরও নিরাপদ ও আরও মানব-কেন্দ্রিক করে তোলার ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ তরুণকে অবদান রাখতে সাহায্য করতে পারে। এই সমষ্টিগত বুদ্ধিমত্তাই মানবজাতির সবচেয়ে বড় শক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি বৈশ্বিক সাধারণ কল্যাণ হিসেবে বিকশিত হতে হবে।
আমরা এমন একটি যুগে প্রবেশ করছি যেখানে মানুষ এবং বুদ্ধিমান সিস্টেমগুলো একসাথে সৃষ্টি করবে, একসাথে কাজ করবে আর একসাথে বিকশিত হবে। সম্পূর্ণরূপে নতুন নতুন পেশার আবির্ভাব ঘটবে। যখন ইন্টারনেটের সূচনা ঘটেছিল, তখন কেউ এর সম্ভাবনাগুলোর কথা কল্পনাও করতে পারেনি। এটি অসংখ্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও সেটাই করবে।
আমি নিশ্চিত যে আমাদের ক্ষমতায়িত যুবসমাজই এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের প্রকৃত চালিকাশক্তি হবে। আমরা বিশ্বের বৃহত্তম ও বৈচিত্র্যময় কিছু দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করার মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, পুনঃদক্ষতা অর্জন এবং জীবনব্যাপী শিক্ষাকে উৎসাহিত করে চলেছি।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যুব জনগোষ্ঠী আর প্রযুক্তি প্রতিভার আবাসস্থল। আমাদের শক্তিগত সক্ষমতা আর নীতিগত স্পষ্টতার সাথে, আমরা এআই-এর পূর্ণ সম্ভাবনাসমূহকে কাজে লাগানোর জন্য এক অনন্য অবস্থানে রয়েছি। এই শীর্ষ সম্মেলনটিতে, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে আমাদের তরুণ উদ্ভাবনী সম্প্রদায়ের প্রযুক্তিগত গভীরতা প্রতিফলিত করে দেশীয় এআই মডেল ও অ্যাপ্লিকেশন চালু করতে দেখে আমি গর্বিত বোধ করেছি।
আমাদের এআই ইকোসিস্টেমের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার জন্য আমরা একটি শক্তিশালী অবকাঠামোগত ভিত্তি বিনির্মাণ করছি। ইন্ডিয়া এআই মিশনের অধীনে, আমরা হাজার হাজার জিপিইউ স্থাপন করেছি এবং শিগগিরই আরও স্থাপন করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে বিশ্বমানের কম্পিউটিং পাওয়ারে অ্যাক্সেস লাভ করার মাধ্যমে, এমনকি ক্ষুদ্রতম স্টার্টআপগুলোও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। এ ছাড়া আমরা একটি জাতীয় এআই রেপোজিটরি প্রতিষ্ঠা করেছি, যা ডেটাসেট ও এআই মডেলগুলোতে প্রবেশাধিকারকে গণতান্ত্রিক করে তুলেছে। সেমিকন্ডাক্টর ও ডেটা ইনফ্রাস্ট্রাকচার থেকে শুরু করে বৈচিত্র্যময় স্টার্টআপসমূহ এবং প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা পর্যন্ত, আমরা সম্পূর্ণ ভ্যালু চেইনকে কেন্দ্র করে কাজ করছি।
ভারতের বৈচিত্র্য, গণতন্ত্র আর জনসংখ্যার গতিশীলতা অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রদান করে। ভারতে সফল হওয়া সমাধানগুলো সর্বত্র মানবজাতিকে সেবা প্রদান করতে পারে। সেইজন্যই বিশ্বের প্রতি আমাদের আমন্ত্রণ হলো: ভারতে উদ্ভাবন করুন ও বিকাশ ঘটান। বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিন। মানবজাতির কাছে পৌঁছে দিন।
লেখকঃ নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী