বিজয় আমার স্বাধীনতা

শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন আমাদের ভাষাশহীদের প্রতি প্রতিবছরের ঐতিহ্যিক রীতি। এই রীতি ধারা পরিণত হয়েছে পরম্পরায়। আর কে না জানে, পরম্পরা হচ্ছে ইতিহাস ঐতিহ্যের সম্মিলিত রূপায়ণ। সাধারণ মানুষ হাতে একটি বা একগুচ্ছ ফুল নিয়ে বেদিতে দিয়ে তাদের মনের আশাকে নিবেদন করে। এটা আমরা ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি। বর্তমানে শহীদ মিনারের স্থাপনা ও পরিপার্শ্বের চেহারা-কাঠামো এমন ছিল না। খুবই ছোট পরিসরে ছিল দ-ায়মান প্রতীকী ডিজাইনটি। সোজা যে রাস্তাটি এসেছিল বেদির সামনে, সেই সড়কটি গাঁ-ঘেষে চলে যেত পুবদিকে সায়েন্স এনেক্সকে বাঁয়ে রেখে। ওই ছোট এলাকায় লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত খুব ভোরবেলা খালি পায়ে আসা মানুষের ঢলে। তাদের অধিকাংশই ফিরে যেত গান গাইতে গাইতে...‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি?’। না, এটা তো ভোলার বিষয় নয়। কারণ এর মর্মে আছে আমার মায়ের ভাষার প্রতি দরদ, আবেগ আর দেশপ্রেম, জাতিসত্তার প্রেম। এই আবেগ জড়ানো প্রেম পরিত্যাগ করার মানে হচ্ছে, দেশকে পরিহার করা। আর দেশকে পরিহার মানে হচ্ছে, নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। সেটা কি কেউ করতে পারে? না, পারে না। বিশেষ করে কোনো রাজনৈতিক দল কি তা পারে? বুকে কালো ব্যাজ পরে যারা আসেন গান গাইতে গাইতে, খালি পায়ে, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানাতে ‘প্রতীকী মা ও ছেলের’ সিম্বলের সামনে, তাকে আমার মনে হতো এবং এখনো হয় এক আন্তর্জাতিক নিবেদন। তাকে আমরা ইউনিভার্সাল চেহারার প্রতীক বলি। এখানে কোনো ব্যক্তি নেই। আছে মেটাফরিক্যাল চেতনার রূপায়ণ।

২. এবারই প্রথম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিত সাংসদরা, এনসিপির সংসদরা একত্রে, বিরোধীদলীয় সাংসদ হিসেবে ভাষাশহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। না, তারা ফুল আনেননি হাতে করে। তারা হাতের মধ্যে মোনাজাতের সমৃদ্ধ রূপটি উৎসর্গ করেছেন। ভাষাশহীদের প্রতি তারা নিবেদন করেছেন কিছু বাণী, যা আল্লাহ্র কাছে নিবেদিত। শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন। তাদের দোয়ার ভেতরে ভাষার জন্য যারা জান কবুল করেছিলেন, তাদের ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতের সুউচ্চ মাকামে স্থান দেওয়ার প্রার্থনা/দোয়া করেছেন। যে যেভাবেই করুক, শহীদদের প্রতি জাতির এই নিবেদন খুবই আকর্ষক একটি অনুষ্ঠান, যা অন্য সব অনুষ্ঠানের চেয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত।

৩. রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পর, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তারপর তার সহকর্মী মন্ত্রীরা শ্রদ্ধা জানান। কিছুক্ষণ পর উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রীদের পালা আসে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও শিক্ষকরা নিবেদন করেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ফুল। তিনবাহিনী প্রধানরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এভাবেই সাজানো হয়েছিল শ্রদ্ধা নিবেদনের পরিকল্পনাটি। এর পর সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পালা আসে। রাতের ‘মধ্যযামে’ নীরবে এই শোক ও ভালোবাসার পর্বটি বহু বছরের চিন্তার ফসল। সেই বহু বছরের পর্বটি কিন্তু রাতের ‘মধ্যযামে’ হতো না। সেটার সূচনা হয়েছিল দিনের শুরুতে। ফজরের নামাজের পর বিহানবেলার কোমল আলো মাখতে মাখতে আমরা শহীদ মিনারের দিকে হেঁটে যেতাম খালি পায়ে, ফুল হাতে। বাসার আশপাশের ব্যক্তিগত বাগানের ফুলগুলোই ছিল আমাদের নিবেদনের ফুল। তখনো ঢাকায় ফুলের বাজার বসেনি। ফুলের বাজার শুরু হয় এরশাদের দুঃশাসনকালে। প্রথমত ওই ফুল আসত কলকাতা থেকে। তারপর যশোর/মাগুরার কোনো কোনো এলাকার চাষিরা ফুল সরবরাহ করতেন। আমরা দেখেছি, সীমান্তবর্তী বেনাপেল থেকে যে সব রাত্রিকালীন বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসত, সেই সব বাসের ছাদে ফুল তোলা হতো। বিশেষ করে রজনীগন্ধার ডাঁটাগুলোর ওপরে সাদা-সৌরভের ফুলগুলো খুব ভোর/বিহানে ঢাকায় পৌঁছে যেত। এভাবেই ফুল-অর্থনীতির শুরু। আজ তা বিশাল আকার পেয়েছে।

৪. সালাম, রফিক, শফিক, বরকতরা ওই বেদি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন এমন সত্য কেউ বলবেন না। কয়েকজন বাদে জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিলে শামিল হয়েছিলেন সবাই, সেটা ঠিক না। তবে বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য, মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার জীবন দিয়ে বাঁচানোর প্রেরণা তাদের মনের ভেতরে ছিল। তা তো আমরা বুঝি। কিন্তু যে ভাষায় কথা বলছি, যে ভাষায় পড়াশুনা করছি, সেই ভাষার জন্য কিন্তু তারা প্রাণ দেয়নি। তাদের মায়েরা যে ভাষায় কথা বলে, সেই লোকজ ভাষা রক্ষার জন্যই ওই আগ্রাসী বিরোধী প্রাণ উৎসর্গ। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ভাষা তো পরিশীলিত/ মার্জিত ভাষারূপ। একে আমরা চিনি কলোক্যাল স্ট্যান্ডার্ড রূপ হিসেবে। এই উপযুক্ত ভাষা কি গাঁয়ের মানুষ বোঝে? আমার গাঁয়ের মানুষ কী এই ভাষায় কথা বলে? যে সব শিশু স্ট্যান্ডার্ড কলোক্যাল ভাষায় বই পড়ে, শেখে তারাও কিন্তু মায়ের সঙ্গে সেই ভাষায় কথা বলে না। তারা বলে পারিবারিক ভাষায়, লোকাল ডায়লেক্টে। যদি শিক্ষা বুকিশ ভাষায় হয়, তাহলে সেই শিক্ষায় তারা কেন কথা বলে না? কারণ, তারা বুকিশ ভাষাকে বইয়েরই ভাষা মনে করে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র একটি নাটকের নাম ‘বহিপীর’। পীর সাহেব বইয়ের ভাষায় কথা বলেন। যারা তার কাছে যান, তারা আমজনতা, তাদের মুখের ভাষা পীর সাহেব ব্যবহার করেন না। তিনি যে আমরা জনতার চেয়ে অন্যরকম, তিনি যে বুকিশ-জ্ঞানী এটাই প্রমাণ করে যে- পীর আর মুরিদের ভাষা এক না। মায়ের ভাষার নামে যে গানটি গাওয়া হয়, তা বুকিশ ভাষিক গান, সাধারণ মানুষের না। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ঠিক তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার মতোই ছেঁড়াবেরা। গায়ক, সুরকার আবদুল লতিফ একটি ভাষা-শহীদের গান লিখে, সুরারোপ করেছিলেন। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ এই গানটি সে সময়কার প-িতদের ভালো লাগেনি। তারা কি ভেবেছিলেন, তাদের মনের ও মুখের ভাষায় গানটি হলো ভালো হয়? ঠিক, তাই। তারা আবদুল লতিফের কথাগুলোকে গেঁয়ো ভেবেছিলেন, যা প-িতদের অনুমোদন পায়নি। পরে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর একটি গান, তিনি ওই একটি গানই লিখেছিলেন বোধহয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’ এই গান বিদ্বৎসমাজে গ্রহণীয় হয়েছিল। এবং এই গানটিই এখনো চলছে।

আমরা যারা বুকিশ ভাষায় কথা বলি, নিজেকে শিক্ষিত ও প্রজ্ঞাবান মনে করি, গ্রামের মানুষের থেকে দূরে বাস করি, তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে, তারা বুক ভাসিয়ে উচ্চারণ করি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি? হ্যাঁ, আমরা ভুলতে পারি। আমার মায়ের ডাইলেক্ট তো আমি ভুলে গেছি। আমাদের গ্রামের মানুষের ভাষা আমাদের কাছে পাখির কিচিরমিচির মনে হয়। ওই ভাষা যারা ব্যবহার করেন, তাদের প্রতি আমাদের করুণা জন্মে। আহা! তারা স্ট্যান্ডার্ড হলো না। এই শব্দের মানে হচ্ছে ‘মান’। ভাষার এই মান তো লোকজ ভাষায় নেই। ফলে আমাদের চিন্তায় আধিপত্যই জেগে থাকে। আমরা বড়, আমরা শিক্ষিত, আমরা বড় চাকরি করি, আমাদের পকেটে অনেক টাকা। আমাদের বাসায় বাতাস ঢুকতে পারে না, এতই সুরক্ষিত। আমরা উন্নত ও আমরাই গাঁয়ের লোকদের কাছে শাসক। আমরা রাজধানীতে বাস করি, গ্রাম অনেক দূরে সেখানে চাষাভুষারা বাস করে। তারা তো আর ক্ষমতাবান হতে পারবে না। ধরুন, কোনো গ্রামীণ মানুষ যদি শুদ্ধ মান ভাষায় কথা বলে, তাহলে আমরা চমৎকৃত হই। কিন্তু আমরা তার ভাষায় কথা বলতে পারি না। বলতে পারলেও তা ব্যবহার করি না এটা ভেবে যে তাহলে তার শ্রেণির মানুষ ভাববে আমি শিক্ষিত হতে পারিনি। এই সমস্যা কী করে সমাধান হবে? আপাতত হবে না। মান ভাষিক আর লোকজ ভাষিক মানুষের মধ্যে এই যে পার্থক্য এটা কেবল অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত নয়। এই পার্থক্যের পেছনে কাজ করছে ভাষিক আধিপত্য। আমরাই মান ভাষার অধিকারী, ওরা এই ভাষার অধিকারী নয়। আমরা উন্নত ওরা অবনত। আমরা কেন্দ্র ওরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এভাবেই রচিত হয়েছে সমাজ কাঠামো, যুগের পর যুগ ধরে এই ধারাই চলছে।

৫. আজ আমরা যে সব গণমানুষকে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই, তারা সংখ্যায় অনেক কম। মহানগর ঢাকার বাসিন্দারা প্রায় তিন কোটির মতো। তাদের অধিকাংশই শহীদ মিনারে যায় না। যাওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। যে সব রিকশাওয়ালা বেদির কাছে যায় যাত্রী নিয়ে তারাও এটা ভাবে না যে সে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবে শহীদদের। তারা দূরেই থাকে। মহানগরের প্রান্তিক এলাকার মানুষেরা আসে না। এলাকায় এলাকায় ছোট আকারে স্কুলগুলোতে মিনার সৃষ্টি হলেও, তাতে কত লোকসমাগম হয়, তার কোনো হিসাব নেই। তার মানে অধিকাংশই শহীদ মিনারের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা জানাতে আসে না। সেটা যোগাযোগের ভাষার দুরবস্থার জন্য যেমন তেমনি শাসকশ্রেণির উন্নত শ্রেণিকরণের ফলেও। আমরা শ্রেষ্ঠ, ওরা অশ্রেষ্ঠ। আমরা একই পঙ্ক্তিতে বসি না। মেলামেশা করি না। গ্রামীণ ভাষায় কথা বলি না। যদিও তারাই সংখ্যায় বেশি। তারাই আমাদের খাদ্যের জোগানদাতা। তারাই আমাদের সবজির উৎপাদক, তারা আমাদের এ-সব সরবরাহ না করলে আমাদের খাবার জোটে না, জুটবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

mahboob.hasan@gmail.com