আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক স্থাপনের বিশেষ মাধ্যম নামাজ। রমজান মাসে এ সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ফরজ নামাজের পাশাপাশি তারাবির নামাজ বান্দার রাতগুলোকে আলোকিত করে, যা তাকে পাপ থেকে দূরে রাখে, চরিত্রকে শুদ্ধ করে এবং অন্তরে প্রশান্তি আনে। যে ব্যক্তি নামাজকে জীবনের অংশ বানায়, তার হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ স্থায়ী হয়। যে ব্যক্তি নামাজে যথাযথভাবে দাঁড়াবে পরকালে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো তার জন্য সহজ হবে। আর যে নামাজে অবহেলা করবে পরকালে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যাবে। নামাজে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো সুন্দর হবে তখন, যখন ব্যক্তি আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় করবে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সুরা নাজিয়াত ৪০-৪১)
বস্তুত আল্লাহপ্রেমীরা যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন সব দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে যায়। নামাজ যার জন্য চোখের শীতলতা, তার কাছে নামাজের চেয়ে প্রিয় ও অধিক মূল্যবান আর কিছু নেই। তার প্রত্যাশা থাকে নামাজেই তার জীবন কেটে যাক। সে নামাজ ছেড়ে যায়, কিন্তু নামাজে ফিরতে তার মন উদগ্রীব থাকে। নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসার পরিমাণ পরিমাপ করা যায় এবং এটি একটি নির্ভুল পরিমাপক। মুমিন-মুসলমান হিসেবে আমাদের প্রতিটি ইবাদত করতে হবে আল্লাহর ইচ্ছামতো, নিজের ইচ্ছামতো নয়। নামাজের মধ্যে অন্তর হতে হবে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ও প্রেমার্ত, বিনম্র ও ভীত- সন্ত্রস্ত। পেটে যখন তীব্র ক্ষুধা তখন মনোযোগ যাতে ঠিক থাকে সেজন্য নামাজের আগে খেয়ে নেওয়া উচিত। মন যখন প্রশান্ত ও আল্লাহ ছাড়া অন্য সব ভাবনামুক্ত তখনই নামাজ শুরু করতে বলা হয়। যে নামাজের মধ্যে নামাজির হৃদয় আল্লাহর প্রতি মনোযোগী থাকে না সে নামাজ গ্রহণ করা হয় না বলে হাদিস রয়েছে। নামাজের সময় হলে নবী কারিম (সা.) আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছু ভুলে যেতেন। খোদার ভয় ও খোদাপ্রেম ছাড়া সে সময় মনে অন্য কিছু থাকত না। এখন আমাদের অবস্থা হয়েছে এর উল্টো, নামাজের মধ্যে আমাদের মোবাইল ফোনে যদি কল আসে বা ভাইব্রেশন সৃষ্টি হয়, তাহলে আমাদের মন আল্লাহর দিক থেকে উড়ে যায় অন্যদিকে। না জানি ব্যবসার ক্ষতি হলো কিংবা কোনো দুঃসংবাদ এলো! নামাজে মনোযোগ না থাকার অন্যতম কারণ হলো, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে জ্ঞান কম থাকা বা না থাকা।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সেসব মুমিনই সফল যারা নামাজের মধ্যে আল্লাহর প্রতি ভীতসন্ত্রস্ত থাকে।’ নামাজ কবুল হলো কি না তা বোঝার উপায় হলো সুরা আনকাবুতের এ আয়াত। যেখানে বলা হয়েছে, নামাজ কায়েম বা প্রতিষ্ঠা করো। নিশ্চয়ই নামাজ অন্যায় কর্ম ও অশালীনতা থেকে রক্ষা করে। একজন প্রকৃত নামাজি গিবত বা কোনো হারাম কাজ করতে পারেন না। অথচ অনেক নামাজি নামাজ শেষ হওয়ার পরই এ ধরনের মন্দ কাজের চর্চা শুরু করেন! এ ধরনের নামাজ যে কবুল হয়নি তা স্পষ্ট। ইসলামি স্কলাররা বলেন, তোমার নামাজ কবুল হয়েছে কি না তা পরীক্ষার উপায় হলো, নামাজের পর তুমি কোনো হারাম কাজ করছ কি না! যদি দেখো যে করেছ, তার মানে তোমার নামাজ কবুল হয়নি আল্লাহর দরবারে! একই বিষয় রোজা ও হজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ প্রকৃত নামাজির নামাজ ও রোজাদারের রোজা ও হাজির হজ তাকে অবশ্যই অন্যায়, মন্দ কাজ ও অশালীনতা থেকে দূরে রাখবে।
নামাজের সময় অন্য কাজের প্রতি মনোযোগ রাখা অনুচিত। তাড়াহুড়ো করে বা কোনো রকম দায়সারা গোছের যেন না হয় নামাজ। নামাজ যখন শুদ্ধ হবে, তখন জীবনের অন্যসব দিকও শুদ্ধ হবে এবং তখনই আমরা হতে পারব প্রকৃত খোদাভীরু ও প্রকৃত রোজাদার।
লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা