বিদেশ নীতির রূপরেখা তুলে ধরছে সরকার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকারের বিদেশ নীতির রূপরেখা তুলে ধরতে শুরু করেছে সরকার। ঢাকায় বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার ১৩ জন রাষ্ট্রদূত গত দুদিন প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তাদের এ রূপরেখার কথা জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সচিবালয়ে তার দপ্তরে গতকাল সোমবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়ে তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে তার দেশ সমর্থন করে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশটি সবরকম সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

চীন দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীকে জানান, চীন রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা জোরদার করতে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সহযোগিতা ব্যাপক ও গভীর করতে প্রস্তুত। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারকে সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, আঞ্চলিক অখ-তা রক্ষা ও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতায়ও চীন বাংলাদেশকে সমর্থন করে।

বাংলাদেশের এক-চীন নীতি মেনে চলা, দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রদূতকে আশ্বস্ত করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ দূতগণ : যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এবং ঢাকায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে ইইউভুক্ত আটটি দেশ ও সংস্থার রাষ্ট্রদূতরা গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন।

রাষ্ট্রদূতদের সাক্ষাৎকারের পর খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের বৈদেশিক নীতির রূপরেখা তুলে ধরা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, ‘আমরা (সরকার) স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করব। পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করব না। আমাদের নীতিমালা হবে পারস্পরিক স্বার্থ ও জাতীয় মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রতিটি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

সৌদি আরব, চীন, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের প্রতি সবাই গভীর আস্থা ব্যক্ত করেছেন এবং ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রবল ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে, কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। সব ইস্যু পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্মানজনকভাবে সমাধান করা হবে। আগামী দিনে অত্যন্ত গতিশীল বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করার বিষয়ে মন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাতের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, উভয়পক্ষ দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বের ওপর জোর দিয়েছে, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং শান্তি ও উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন অংশীদারত্ব, অভিবাসন ও রোহিঙ্গা ইস্যুসহ সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র আলোচনায় আসে। আগামী মার্চের শুরুতে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের ঢাকা সফরের বিষয়েও রাষ্ট্রদূত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন।

ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে ঢাকায় ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও সুইডেনের আবাসিক রাষ্ট্রদূতরা মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশে গণতন্ত্র সুসংহত করা, আইনের শাসন ও সুশাসনের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

মাইকেল মিলার সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা এবং সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যাশা করছে ইইউ। ইইউকে নবনির্বাচিত সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু, সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ও বিনিয়োগকারী। সংস্কার, বাণিজ্য, মানবিক বিষয়, অভিবাসনসহ সম্পর্কের সব দিক নিয়েই আলোচনা হয়েছে। শিগগির বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার চুক্তি (পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট-পিসিএ) সই করা সম্ভব হবে, তিনি এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশংসা করেন এবং সাংবিধানিক, বিচার বিভাগীয়, শ্রম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের ক্ষেত্রে সহায়তা অব্যাহত রাখার আগ্রহ ব্যক্ত করেন।

আলোচনায় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক স্থান পায়। উভয়পক্ষ একটি বিস্তৃত বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করার সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় করে। তারা অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা করেন।

বাংলাদেশে আশ্রিত মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের দেশটিতে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে দেশগুলোর সহায়তা কামনা করা হয়।

নির্বাচন কমিশনকে ইইউর অভিনন্দন : ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করায় নির্বাচন কমিশনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাক্ষাৎ করে তিনি এ অভিনন্দন জানান।

রাষ্ট্রদূত বলেন, একটি অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা প্রশংসনীয়। জাতীয় নির্বাচন শেষ হলেও কমিশনের কাজ কমছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামনে সংসদের উপনির্বাচন, ১২টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, ৪ হাজার ৫৮২টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ইইউ সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।