যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরাকে নতুন সরকার গঠনের দীর্ঘ আলোচনা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিদিন বৈঠক করলেও পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন- তা নির্ধারণে তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের সংকেতের অপেক্ষায় আছে বলে জানা গেছে।
প্রায় প্রতিদিনই দলীয় নেতারা গোপন বৈঠক করছেন, অগ্রগতির দাবি করে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিচ্ছেন এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে ভিন্নমুখী তথ্য ছড়াচ্ছেন। তবে পর্দার আড়ালে অনেক রাজনীতিক স্বীকার করছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রটি সম্ভবত বাগদাদের বাইরে নির্ধারিত হচ্ছে। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া থাকলেও বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের গতিপথনির্ভর এক অপেক্ষার খেলায় পরিণত হয়েছে।
২০০৩ সালের পর থেকে ইরাকে সরকার গঠন প্রক্রিয়া খুব কমই বিদেশি প্রভাবমুক্ত ছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবারের অচলাবস্থার বিশেষত্ব হলো—ওয়াশিংটনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান এবং শিয়া রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরে ঐকমত্য চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তেহরানের সক্ষমতা আগের তুলনায় কমে গেছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকি, যিনি স্টেট অব ল’ কোয়ালিশনের নেতা। তাঁর সম্ভাব্য মনোনয়ন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরাকি রাজনৈতিক দলগুলো তাঁর পক্ষে ও বিপক্ষে বিভক্ত। ফলে বিষয়টি এখন বাগদাদে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ আল-ইয়াসিরি বলেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো এখনও প্রাসঙ্গিক থাকলেও এখন সেগুলো সবচেয়ে দুর্বল উপাদানে পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক কৌশলগত পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের রূপান্তর- এই দুই চ্যানেলের মাধ্যমে বহিরাগত শক্তিগুলো বাগদাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো ইরাকে তেহরানের প্রভাবের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরাপত্তা-ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া। এদের প্রভাব কমলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইরানের রাজনৈতিক প্রভাবও হ্রাস পাবে। আংশিকভাবে এ কৌশলটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি-এর সময় দেখা গিয়েছিল, যখন তার সরকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা কমানোর বিষয়ে আশ্বাস দেয়।
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কেবল নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিন্যাস নয়; বরং ইরাকের সামগ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইরান অপরিহার্য অংশীদার না থাকে।
এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর শাফাক নিউজকে জানিয়েছে, আল-মালিকির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রত্যাবর্তনের বিরোধিতায় তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত। প্রার্থিতা এগোলে গুরুতর কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়। এক মুখপাত্র জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্ট—আল-মালিকি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্র–ইরাক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এই অবস্থানের পেছনে তিনটি অগ্রাধিকার রয়েছে: ইরানি-সমর্থিত মিলিশিয়াদের রাজনৈতিক প্রভাবের অবসান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তেহরানের প্রভাব কমানো এবং ওয়াশিংটনের লক্ষ্যসম্মত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।
আল-ইয়াসিরি বলেন, মার্কিন বার্তা দুই ধাপে এসেছে। আল-মালিকির নাম সামনে আসার আগে ওয়াশিংটন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সরকার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণ ঠেকাতে জোর দিচ্ছিল। তাঁর নাম আলোচনায় আসার পর বিরোধিতা প্রকাশ্য ও সরাসরি হয়ে ওঠে। মার্কিন কর্মকর্তারা তাঁকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ও ইরানি প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে মনে করেন।
ইরাকের সংসদের বৃহত্তম জোট ‘কোঅর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’-এর ভেতরে হিসাব-নিকাশ বাস্তববাদী বলেই মনে হচ্ছে। তেহরান যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে দৃশ্যমান সাফল্য পায়, তবে বিকল্প বিস্তৃত হতে পারে। বিপরীতে ইরানের অবস্থান দুর্বল হলে বা বড় ধরনের ধাক্কা এলে, বাগদাদের মিত্ররা আন্তর্জাতিক আপত্তি কম এমন প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে পারে।
অনিশ্চয়তা শুধু শিয়া গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ নয়; কুর্দি রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেও একই ধরনের মূল্যায়ন চলছে। বিশ্লেষক ফালাহ আল-মিশাল বলেন, সরকার গঠনে বিলম্বকে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত করা অমূলক নয়, তবে সামাজিক ও আর্থিক ব্যয় বিবেচনা না করে সময়ক্ষেপণ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
তিনি জানান, কোঅর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্কের কিছু অংশ আল-মালিকির প্রার্থিতায় অনড় থাকলেও ওয়াশিংটনের আপত্তি অটল। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ শিয়া বিরোধ মেটাতে ইরানের সক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে; কারণ তেহরান নিজস্ব চ্যালেঞ্জ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপ ইস্যুতে ব্যস্ত।
বাগদাদের রাজনৈতিক মহলে ঘুরে বেড়ানো তথ্যে ইঙ্গিত মিলছে—আল-মালিকির বিকল্প প্রার্থী না আসা পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বিলম্বে কুর্দি দলগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র উৎসাহিত করেছে। যদিও এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত নয়, তবু এটি ইরাকের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমাবদ্ধতাকেই প্রতিফলিত করছে।
এদিকে ওমানের মাস্কাট ও সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়াশিংটন–তেহরান বৈঠক চললেও মুখোমুখি সংঘাতের হুমকিও বাড়ছে। কেউ কেউ সমঝোতার আশা দেখছেন, আবার কেউ সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিতকে উত্তেজনা বৃদ্ধির সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন। এদিকে ইরাকের রাজনৈতিক মহল ইরান সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় মার্কিন সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির কথাও বলছে।
ওয়াশিংটনের চাপের মূল তিন ইস্যু হলো—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র মিত্রদের ভেঙে দেওয়া। অন্যদিকে তেহরান বলছে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত কেবল পারমাণবিক ইস্যু। বিশ্লেষকদের মতে, এই মতপার্থক্য শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বাগদাদের প্রতিটি রাজনৈতিক বৈঠক ও প্রার্থী আলোচনাকে প্রভাবিত করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক রমাদান আল-বদরান বলেন, শেষ পর্যন্ত আলোচনায় সমঝোতা বা মুখোমুখি সংঘাত—একটি পথই বেছে নিতে হবে। তাঁর ধারণা, কঠোর শর্ত মেনে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ইরান রাজি হতে পারে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনও কৌশলগত দাবি পূরণ হলে সীমিত সমঝোতায় যেতে পারে।
তবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অবস্থানে রয়েছে ইরাক। আল-বদরান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও সংস্কার চায় এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সঙ্গে সশস্ত্র শাখা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার ইতিহাস বহনকারী কাঠামো বজায় রাখতে আগ্রহী নয়। বিশেষ করে সিরিয়াসহ আঞ্চলিক ইস্যুগুলো এখন মার্কিন কৌশলগত হিসাব-নিকাশে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এদিকে সাংবিধানিক সময়সীমা মানার আহ্বান গুরুত্ব হারাচ্ছে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান ফায়েক জেইদান রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে আইনি সময়সীমা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন, তবে বিশ্লেষকদের মতে আগের লঙ্ঘনের পর এসব আহ্বানের প্রভাব কমে গেছে।
অবশেষে বৈঠক বাড়ছে, প্রার্থীর তালিকা বদলাচ্ছে, কিন্তু সিদ্ধান্তের বদলে অপেক্ষাই যেন দীর্ঘ হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার অমীমাংসিত টানাপোড়েনের চাপেই সাংবিধানিক সময়সীমা ক্ষয়ে যাচ্ছে, আর ইরাকের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
সূত্র: শাফাক নিউজ