ইন্তারকে বিদায় করে জায়ান্ট কিলার বোডোর রূপকথা

‎নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে প্রায় ১৬ ঘণ্টার দূরত্বে উত্তর মেরুর কাছে ছোট্ট এক শহর—বোডো। যেখানে হাড়কাঁপানো শীত আর মেরুজ্যোতি  নিত্যদিনের সঙ্গী। সেই শহরের ফুটবল ক্লাব 'বোডো/গ্লিম্ট' আজ আর কোনো নামগোত্রহীন দল নয়; তারা এখন ইউরোপীয় ফুটবলের 'জায়ান্ট কিলার'।

‎গল্পটা খুব বেশিদিন আগের নয়। ২০১৭ সালেও দলটি নরওয়ের দ্বিতীয় সারির লিগে ধুঁকছিল। মাত্র ৫৫ হাজার জনসংখ্যার এই শহরের ক্লাবটির বাজেট ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর এক-দশমাংশও নয়। কিন্তু তাদের ছিল একটি স্বপ্ন আর কোচ কেটজিল নুটসেনের জাদুকরী নেতৃত্ব। নুটসেন শুধু দল গঠন করেননি, তিনি তৈরি করেছিলেন এক পরিবার।

‎বোডো/গ্লিম্টের সাফল্যের আড়ালে রয়েছে এক বিশেষ মানুষ—বিয়র্ন মানসভের্ক। এই প্রাক্তন ফাইটার পাইলট যখন ক্লাবে মেন্টাল কোচ হিসেবে যোগ দেন, তখন দলটি দ্বিতীয় বিভাগে। তিনি খেলোয়াড়দের শেখালেন ফলাফল নিয়ে চিন্তা না করে 'প্রক্রিয়া'কে ভালোবাসতে। ধ্যানের মাধ্যমে স্নায়ুর চাপ নিয়ন্ত্রণ আর একে অপরের প্রতি ভালোবাসাই হয়ে উঠল তাদের মূল শক্তি।

‎২০২১ সালে হোসে মরিনহোর রোমাকে ৬-১ গোলে হারিয়ে তারা প্রথম বিশ্বকে চমকে দেয়। এরপর গত কয়েক মাসে তারা যা করেছে, তা কল্পনাকেও হার মানায়।
‎ * ম্যানচেস্টার সিটি-কে হারিয়ে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে সফরকে মাটি করে দেওয়া।
‎ * আতলেতিকো মাদ্রিদের দুর্গ জয়।
‎ * এবং সবশেষে, গতবারের ফাইনালিস্ট ইন্টার মিলানকে তাদেরই মাঠ সান সিরোতে স্তব্ধ করে দিয়ে ৫-২ অ্যাগ্রিগেটে জয়।

‎দলের সেরা তারকা জেন্স পেটার হাউজ। এসি মিলান বা ফ্রাঙ্কফুর্টের মতো বড় ক্লাবে খেলেছেন, কিন্তু হৃদয়ের টানে ফিরে এসেছেন নিজের শহরের ছোট ক্লাবে। তার ভাষায়, "শান্তি আর একাত্মতা যেখানে থাকে, সাফল্য সেখানেই ধরা দেয়।"
‎আজ বোডো শহরের ৫৫ হাজার মানুষ যদি সবাই মিলে মিলানের বিখ্যাত সান সিরো স্টেডিয়ামে যায়, তাও গ্যালারির অর্ধেক আসন খালি থাকবে। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই ছোট্ট শহরের এগারোজন যোদ্ধা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।


‎যেভাবে স্তব্ধ হলো সান সিরো

‎​প্রথম লেগে নিজেদের ঘরের মাঠে ৩-১ ব্যবধানে জিতে অবিশ্বাস্য এক আত্মবিশ্বাস নিয়ে মিলানে এসেছিল বোডো/গ্লিম্ট। তবে সান সিরোর বিশাল গ্যালারি আর ইন্টারের দাপটের সামনে তারা কতক্ষণ টিকবে, তা নিয়ে সংশয় ছিল অনেকেরই।

‎ ম্যাচের শুরু থেকেই ইন্টার মিলান প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলেও বোডো/গ্লিম্টের রক্ষণভাগ ছিল ইস্পাতকঠিন। উল্টো খেলার ধারার বিপরীতে ম্যানুয়েল আকানজির একটি মারাত্মক ভুলের সুযোগ নিয়ে বল কেড়ে নেন জেন্স পেটার হাউজ। ঠান্ডা মাথায় গোল করে সান সিরোর হাজার হাজার দর্শককে স্তব্ধ করে দেন তিনি। এই এক গোলেই ইন্টারের প্রত্যাবরৃতনের স্বপ্ন বড় ধাক্কা খায়।
‎দ্বিতীয়ার্ধে ইন্টার মরিয়া হয়ে আক্রমণে উঠলে রক্ষণভাগে ফাঁকা তৈরি হয়। সেই সুযোগে দুর্দান্ত এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে হাকন এভজেন দলের দ্বিতীয় গোলটি করে ইন্টারের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন।
‎শেষ দিকে আলেসান্দ্রো বাস্তোনি ইন্টারের হয়ে একটি গোল শোধ করলেও তা কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে। ৫-২ ব্যবধানের বিশাল লজ্জা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তিনবারের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের।

‎​১৯৮৭-৮৮ মৌসুমের পর বোডো/গ্লিম্ট প্রথম নরওয়েজীয় দল যারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বে জয় পেল।

‎ ইয়োহান ক্রুইফের আয়াক্সের (১৯৭১-৭২) পর তারা প্রথম দল যারা ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগের বাইরে থেকেও টানা চারটি ম্যাচে বড় লিগের দলগুলোকে পরাজিত করেছে।

‎​ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত কোচ কেটজিল নুটসেন বলেন, "ট্রফির চেয়েও বড় হলো এই মানুষগুলো। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি যেখানে সবাই সবার খেয়াল রাখে। এই জয় সেই একাত্মতারই ফসল।"

‎​পরবর্তী ধাপ: চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ১৬-তে বোডো/গ্লিম্টের প্রতিপক্ষ হতে পারে ম্যানচেস্টার সিটি অথবা স্পোর্টিং লিসবন