সাম্প্রতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, প্রতি বিঘায় সার বাবদ ৪ হাজার টাকা সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনার খবর ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। আসলে এই সাফল্যের মূলে রয়েছে ফসল উৎপাদনে মাটিতে ন্যানো সার প্রয়োগ । বাংলাদেশে ফসল উৎপাদনে সিংহভাগ খরচ হয়, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক বাবদ । কৃষি উৎপাদনে অব্যাহত খরচ বৃদ্ধি ও কৃত্রিম সার, মাটি ও মানুষের সুস্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে এটি খুবই আশা জাগানিয়া খবর। চিকিৎসা ও প্রকৌশল বিদ্যায় সাফল্যের পর, ন্যানো-প্রযুক্তি কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। ন্যানোকণার আকার-আকৃতি ১-১০০ ন্যানোমিটারের মধ্যে হয়, সে কণার প্রায়োগিক অবস্থার নাম হলো, ন্যানো-প্রযুক্তি। কৃষি-খাদ্যে ন্যানোসার এবং ন্যানো বালাইনাশক থেকে শুরু করে চৌকস বিতরণব্যবস্থা, স্মার্ট ডেলিভারি সিস্টেম এবং বায়োসেন্সর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই প্রযুক্তিগুলো কৃষি উপকরণ ব্যবহারের দক্ষতা উন্নতি ও ক্ষতি কমাতে এবং ফসলের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। বিশেষত ধাতব ও ধাতব অক্সাইডের ন্যানোকণা যেমন জিংক অক্সাইড, টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড, রুপা বা সিলভার, আয়রন অক্সাইড ও সেরিয়াম অক্সাইড ইত্যাদি ক্রমেই কৃষি ও খাদ্য প্যাকেজিং ব্যবস্থায় ব্যবহার বাড়ছে।
প্রচলিত কৃষি রাসায়নিকের বিপরীতে, ন্যানোকণাগুলোর অনন্য ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যেমন উচ্চ গতিশীলতা, বৃহৎ পৃষ্ঠভূমি এবং ব্রাউনিয়ান গতি (তরল বা গ্যাসে ভাসমান অতিক্ষুদ্র কণার অনিয়মিত ও এলোমেলো চলাচল, যা চারপাশের অণু-পরমাণুর অবিরাম সংঘর্ষের কারণে ঘটে) যা তাদের মাটি, উদ্ভিদ, অণুজীব এবং মানব টিস্যুর সঙ্গে আরও আক্রমণাত্মকভাবে মিথস্ক্রিয়া করতে দেয়। এই মিথস্ক্রিয়াগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি, বিশেষ করে খাদ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে, কৃষি পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে। এই প্রযুক্তির দ্রুত বাণিজ্যিক ও বৈজ্ঞানিক সম্প্রসারণের সম্ভাবনার পরও, ন্যানোকণার পরিবেশগত এবং স্বাস্থ্যগত প্রভাব আছে, যা যথেষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয় না। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, খাদ্যশৃঙ্খল মাধ্যমে স্থানান্তর এবং বাস্তুতন্ত্রে এর প্রভাব সম্বন্ধে তথ্যের প্রাপ্যতা সীমিত বা অভাব রয়েছে। এর ফলে কৃষিতে পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে। কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় মাটি হলো, ন্যানোকণার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রহণকারী পরিবেশগত উপাদান। সার, বালাইনাশক, সেচের পানি এবং বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চয়নের মাধ্যমে ন্যানোকণা মাটিতে পৌঁছায়। ন্যানোকণার ক্ষুদ্র আকার এবং উচ্চ পৃষ্ঠতল সক্রিয়তা তাদের মাটিতে দীর্ঘসময় ধরে স্থায়ী হতে, রূপান্তরিত হতে এবং জমা হতে সক্ষম করে। গবেষণায় দেখা গেছে ন্যানোকণা মাটির গঠন, দানাদারত্ব, ছিদ্রতা এবং পানি ধারণক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটাতে পারে। বড় পৃষ্ঠতল এলাকা এবং উচ্চমাত্রার বিক্রিয়া-সক্ষমতার মাধ্যমে মাটির জৈব পদার্থ ও পুষ্টি শোষণ ক্ষমতায় পরিবর্তন আনতে পারে, যা মাটির রাসায়নিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। এছাড়া, ন্যানোকণা ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে, যা মাটির বাস্তুতন্ত্রের অবনতি ঘটায়।
মাটির অণুজীব যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ন্যূনতম জীবাণু বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। জিংক অক্সাইড, টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড, রুপা বা সিলভার, ন্যানোকণার সংস্পর্শে অণুজীবের সংখ্যা কমে যায়, এনজাইমেটিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং মাইক্রোবায়োম কাঠামোর পরিবর্তিন ঘটে। কেঁচো, যা মাটিতে বসবাসকারী গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি, ন্যানোকণার সংস্পর্শে এর বৃদ্ধি, বেঁচে থাকা এবং প্রজননে নেতিবাচক প্রভাবের সম্মুখীন হয়। জিংক অক্সাইড ন্যানোকণার জৈবিক-সঞ্চয়ন কেঁচোর ডিএনএর ক্ষতি এবং পরিপাকতন্ত্রে ব্যাঘাত ঘটায়, যা মাটির উর্বরতা ও বাস্তুতন্ত্র সেবা হুমকিতে পড়ে। এই ধরনের প্রভাব মাটির স্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রের স্থায়িত্বকে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। মাটির স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে, এর ফলাফল সরাসরি ফসলের উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর পড়ে। উদ্ভিদ হলো মাটি দূষণ ও খাদ্যশৃঙ্খলে স্থানান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থল। ন্যানোকণা উদ্ভিদে শেকড় বা পাতার মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে ভোজ্য অংশে স্থানান্তরিত হয়। ন্যানোকণার বিষক্রিয়া নির্ভর করে কণার আকার, রাসায়নিক গঠন, ঘনত্ব, উদ্ভিদের প্রজাতি ও বয়সের ওপর। সাধারণভাবে ২০ ন্যানোমিটারের কম আকারের কণা বেশি ক্ষতিকর। উদাহরণস্বরূপ, জিংক অক্সাইডের ন্যানোকণা সহজে মাটিতে দ্রবীভূত হয়ে উদ্ভিদে প্রবেশ করে, যখন টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড কণা মাটিতে জমে কোষ প্রাচীরে আটকায়। উভয় ক্ষেত্রেই গম ও ধানের মতো ফসলের শেকড় বৃদ্ধি কমায় পাশাপাশি সালোকসংশ্লেষণ কমে যায় এবং জৈববস্তু কমে যায়। রুপার ন্যানোকণা উদ্ভিদ কোষ প্রাচীর ও ঝিল্লি ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে কোষের কাঠামোগত এবং শারীরবৃৃৃৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয়। একই আকারের কণাও ভিন্ন ঘনত্বে ভিন্ন প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, কম ঘনত্বে জিংক অক্সাইড ন্যানোকণা উদ্ভিদ বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও উচ্চ ঘনত্বে তা শেকড় বৃদ্ধিতে মারাত্মক ক্ষতি এবং জৈববস্তু কমায়। ফসলের বিষক্রিয়ার অন্যান্য প্রভাবের মধ্যে রয়েছে পাতা হলুদ হওয়া, ক্লোরোফিলের ক্ষয়, প্রোটিন সংশ্লেষণ হ্রাস এবং শেকড়ের ক্ষয়। এগুলো মাটি ও উদ্ভিদের মধ্যে ন্যানোকণার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির প্রমাণ। কৃষি জমি থেকে বৃষ্টির পানি, সেচ, লিচিং বা বায়ুুমণ্ডলীয় সঞ্চয়নের মাধ্যমে ন্যানোকণা পানিতে প্রবাহিত হতে পারে। জলজ জীববৈচিত্র্য ন্যানোকণার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। সিলভার বা রুপা, কপার, টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড, অ্যালুমিনিয়াম, নিকেল ন্যানোকণা শৈবাল, ড্যাফনিয়া এবং মাছের ওপর বিষাক্ত প্রভাব ফেলে। টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড ন্যানোকণা পানিতে আলো প্রবেশ কমায়, যার ফলে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং শৈবাল বৃদ্ধিতে বাধার সৃষ্টি হয়।
রুপা ও তামার ন্যানোকণা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, কোষ ঝিল্লি ক্ষতি এবং মৃত্যুহারের বৃদ্ধি ঘটায়। জেব্রাফিশে করা গবেষণায় দেখা গেছে, ন্যানোকণা ভ্রƒণ মৃত্যুহার বৃদ্ধি করে, হ্যাচিং বিলম্ব ঘটায়, হৃদস্পন্দন কমায় এবং স্বাভাবিক বিকাশে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। জলজ পরিবেশে ন্যানোকণার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি। দ্রবণীয় ন্যানোকণা তাদের বৃহৎ আকারের বা গুচ্ছাকারে থাকা ন্যানোকণার চেয়ে বেশি বিষাক্ত, যা কণার রাসায়নিক গঠন এবং দ্রবণশীলতার গুরুত্ব বোঝায়। ন্যানোকনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো, খাদ্যশঙৃখলে স্থানান্তর। কেঁচো, মাছ, উদ্ভিদ এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরে পর্যন্ত ন্যানোকণা জমা হতে পারে। প্রতিটি অনুজীব, উদ্ভিদ, প্রাণী তার দেহের জন্য অযাচিত কোনো পদার্থ বা দ্রব্য প্রবেশ করার বাধা প্রদানে স্বয়ংক্রিয় কৌশল থাকে, ক্ষুদ্র আকার এবং উচ্চ গতিশীলতার কারণে ন্যানোকণা জৈব বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। জৈবিক সঞ্চয়নের ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে। অনেক সময়ব্যাপী সংস্পর্শে ন্যানোকণা বিভিন্ন তন্তু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জমা হয়ে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, কোষ ক্ষতি এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দেশে খাদ্য কৃষি ও পরিবেশ সংক্রান্তবিভিন্ন আইন ও নীতিমালা আছে। কোডেক্স নীতিমালা অনুসারে, নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগের আগে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা উচিত, যেখানে সংস্পর্শ পথ, বিষক্রিয়া, জৈবিক-সঞ্চয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করতে হয়। বাংলাদেশের নীতি বা আইনসমূহ আংশিকভাবে উদ্ভাবন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করে এমন বাস্তবতায় প্র্রণীত, তবে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঝুঁকি মূল্যায়ন, ব্যবহৃত ক্ষেত্রে লেবেলিং এবং ভোক্তা সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও খাদ্য-প্যাকেজিংয়ে ন্যানোকণার নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ন্যানোকণার ব্যবহারের বাধ্যতামূলক লেবেলিং এবং বিদ্যমান উপাদানের ন্যানো-ফর্মের আলাদা নিরাপত্তা স্বীকৃতির বাধ্যবাধকতা আছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রর খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন ন্যানোকণাকে নতুন উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে প্রতিটি বিষয়ের জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রয়োজন হয়। কানাডা ও তাইওয়ান প্রাক-বাজার অনুমোদন ও নিরাপত্তা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করেছে, বিশেষ করে ন্যানো-প্যাকেজিংয়ে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ঝুঁকি ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ যোগাযোগের জোর দেওয়া হয়েছে। এশিয়া-এর দেশ যেমন চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত, ধীরে ধীরে ন্যানো-নির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করছে, যেখানে নিরাপত্তা মূল্যায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কখনো কখনো লেবেলিংকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ন্যানো-প্রযুক্তির দ্রুত প্রয়োগ সত্ত্বেও, কৃষিক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক কাঠামো অসম্পূর্ণ ও অপর্যাপ্ত। বেশিরভাগ নিরাপত্তা মূল্যায়ন স্বল্পমেয়াদি বিষক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদি, কম মাত্রার, বহুস্তরের প্রভাব এবং খাদ্যশৃঙ্খল-মাটি-উদ্ভিদ-পানি-মানব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য মানসম্মত প্রটোকল প্রয়োজন। ঝুঁকি মূল্যায়নে কণার আকার, আকৃতি, পৃষ্ঠ রসায়ন, ঘনত্ব এবং পরিবেশগত রূপান্তর বিবেচনা করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের মতো দেশে ন্যানো-প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগজনক এবং বিষয়গুলো উপেক্ষা করা যায় না।
লেখক: গবেষক ও লেখক বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট
nazim.68 @gmail. com