‘১৭ বছর হয়ে গেল, কিন্তু আজও আমাদের ক্ষত শুকায়নি। তবু মৃত্যুর আগে শুধু বিচারটা দেখে যেতে চাই। নতুন সরকার বিএনপি এ হত্যার বিচার করবে বলে আশা করছি।’ গতকাল বুধবার জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীর বনানী সামরিক কবরস্থানে এসে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে এসব কথা বলছিলেন শহীদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল কুদরত এলাহি রহমান শফিকের ছেলে সাকিব রহমান। তার মতো আরও অনেকে ২০০৯ সালের ওই ঘটনার বিচারের আশায় নতুন করে বুক বাঁধছেন।
গতকাল সাকিব রহমান বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। সেই তদন্তে যাদের নাম এসেছে তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসাই বিএনপি সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা আশাবাদী এই বিচার তারা করবে। এ ছাড়া এ বছরই প্রথম আমাদের বাবাদের কবর জিয়ারত করে সম্মান জানাতে এসেছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী।
পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের শিকার শহীদ মেজর আসাদের বোন হোসনেয়ারা পারভীন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, শহীদ মেজর আসাদ আমার ছোট ভাই। প্রতিবছর এখানে আসি। বারবার ছুটে আসতে ইচ্ছা করে। কারণ এই জায়গায় আসার অনুভূতিটা ভাষায় বোঝানো যাবে না। জানি না আর কতদিন আসতে পারব। আল্লাহ যতদিন হায়াত রেখেছেন, ততদিন আসার চেষ্টা করব।
বিচার নিয়ে প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৭ বছরে অনেক আশা ছিল। কিন্তু পূরণ হয়নি। এখন নতুন সরকার এসেছে। তাদের কাছে আমাদের আবেদন যে, দেশের স্বার্থে একটি সুষ্ঠু বিচার হোক। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিজেদের সন্তান রেখে গেছেন। অন্তত সেই সন্তানরা যেন বলতে পারে, তাদের বাবার মৃত্যুর সঠিক বিচার হয়েছে।
মেজর আসাদের বোন আরও বলেন, গত ১৭ বছরে এই কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীকে আমরা পাইনি। তাদের প্রতিনিধি এসেছেন। কিন্তু এবার রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী দুজনকেই পেয়েছি। তাদের দেখে আমাদের মনের আশা আরও বেড়ে গেছে। এজন্য তাদের কাছে একটা সুষ্ঠু বিচারের প্রত্যাশা রইল আমাদের।
ছেলে হারানো ৭০-ঊর্ধ্ব এক মা বলেন, ‘১৭ বছর ধরে বিচার চাচ্ছি, বিচার কোথায়? আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি, আল্লাহ ন্যায়বিচার করবে।’
শুধু সাকিব, হোসনেয়ারা পারভীন ও ৭০-ঊর্ধ্ব এই মা নন, গতকাল রাজধানীর বনানী সামরিক কবরস্থানে ছুটে আসা অন্যান্য শহীদ পরিবারেরও একই চাওয়া। তারা একটি সুষ্ঠু বিচার দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন। এমনকি সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন ঘিরে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বাবার হত্যাকাণ্ডের বিচারে নতুন আশা দেখছেন অনেকেই।
এর আগে গত মঙ্গলবার পিলখানা হত্যাকাণ্ডে সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) সাকিল আহমেদের ছেলে ব্যারিস্টার রাকিন আহমেদ বলেছেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেই বলা আছে ক্ষমতায় গেলে তারা পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করবে। ফলে আমরা এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চাই। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার বিচারের নামে যেভাবে শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে প্রহসন করেছে এর পুনরাবৃত্তি আর যেন না হয়।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) ঢাকার পিলখানা সদর দপ্তরে বিদ্রোহের নামে তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।