১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বাগেরহাটের খান আকরামকে খালাস দিয়েছেন আপিল বিভাগ। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করেন।
২০১৫ সালে ১১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একই মামলায় খান আকরামকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে সর্বোচ্চ আদালত আপিল গ্রহণ করে শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্ত দেন।
এর আগে ২০১৫ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাগেরহাটের শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারকে মৃত্যুদণ্ড এবং খান আকরাম হোসেনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
মোড়েলগঞ্জ থানার তেলিগাতীতে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে আটকের পর নির্যাতন চালিয়ে হত্যার ঘটনায় আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয় আকরামকে। তিনি এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন।
সিরাজুল হক ও খান আকরাম হোসেনের সঙ্গে এ মামলায় আব্দুল লতিফ তালুকদার নামে আরেকজন অভিযুক্ত হন। কিন্তু রায়ের আগেই ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় মৃত্যু হওয়ায় তার নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এর আগে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই তিন আসামির যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় মোট সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২০১৭ সালের ৩১ মে অভিযোগগুলো আমলে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অভিযোগগুলোর সারসংক্ষেপ
মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৬ মে বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ থানার চাপড়ী ও তেলিগাতী এলাকায় ১৫-২০ জন রাজাকার এবং ২৫-৩০ জন পাকিস্তান দখলদার সেনাবাহিনীর সদস্য হামলা চালায়। এতে ৪০-৫০টি বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। দুইজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখম করা এবং ১০ জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
৭ জুলাই কচুয়া থানার হাজরাখালী ও বৈখালী রামনগর এলাকায় হামলা চালিয়ে চারজনকে আটক ও অপহরণের পর আবাদের খালের ব্রিজে হত্যা করে মরদেহ খালে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
১৩ নভেম্বর মোড়লগঞ্জ থানার ঢুলিগাতী গ্রামে দুইজন নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাকে আটক, নির্যাতন ও গুলি করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
১৭ নভেম্বর কচুয়া থানার বিলকুল ও বিছট গ্রামে চারজনকে আটক করে কাঁঠালতলা ব্রিজে নিয়ে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা এবং মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
৩০ নভেম্বর বিলকুল গ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধা মুনসুর আলী নকীবকে আটক করে দৈবজ্ঞহাটির গরুর হাঁটির ব্রিজে নিয়ে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
১৬ অক্টোবর উদানখালী গ্রামে হামলার ঘটনায় স্বাধীনতার পক্ষের উকিল উদ্দিন মাঝিকে আটক ও হত্যার পাশাপাশি তার মেয়ে তাসলিমাকে অপহরণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, তাকে কচুয়া রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে দীর্ঘদিন আটক রাখা হয় এবং সেখানে ও আশপাশের ক্যাম্পে চারজনকে নির্যাতন করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা তল্লাশি চালিয়ে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেন।
এ ছাড়া গজালিয়া বাজারে হামলা চালিয়ে শ্রীধাম কর্মকারকে হত্যা এবং তার স্ত্রী কমলা রানী কর্মকারকে আটক করে কচুয়া রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগও মামলায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। দীর্ঘদিন আটকে রাখার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখান থেকে তিনি পালিয়ে যান বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
উল্লেখ্য, আপিল বিভাগের এ রায়ের মাধ্যমে খান আকরামের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের পূর্বের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল হয়ে তিনি খালাস পান। অন্য আসামিদের বিষয়ে পৃথক আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।