দফায় দফায় তারিখ পরিবর্তন আর প্রকাশকদের বিভক্তি মিটিয়ে অবশেষে পর্দা উঠল বইপ্রেমী মানুষের প্রাণের অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ এর। দেরিতে হলেও লেখক, প্রকাশক আর পাঠকদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটল। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এবারের বইমেলার প্রতিপাদ্য ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’।
বিকেল ৩টা ১৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে ফিতা কেটে মেলার দ্বার উন্মুক্ত করেন। উদ্বোধন শেষে তিনি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। ঘোষণার পরই সর্বসাধারণের জন্য মেলা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
এর আগে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫ বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ-গদ্যে সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদে আলী আহমদ, গবেষণায় মুস্তাফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞানে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখালেখিতে মঈদুল হাসান পুরস্কার পেয়েছেন।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি... আমি কি ভুলিতে পারি’ গান পরিবেশিত হয়। অনুষ্ঠানে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ও কন্যা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক, বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মিলিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত (ছুটির দিন ছাড়া) মেলাপ্রাঙ্গণ খোলা থাকবে। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারবেন না। ছুটির দিনে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, বেশ কিছু স্টলের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। বেশ কিছু স্টলের হাতুড়ি-পেরেকের টুং টাং শব্দে কাজ চলমান রয়েছে। অধিকাংশ স্টলেই পর্যাপ্ত বই আনা হয়নি ও গোছানো শেষ করেননি আয়োজকরা। অনেক স্টল কালো কাপড়ে মুড়িয়ে রাখতেও দেখা গেছে। প্রথম দিনে শুরু হয়নি বই বিক্রিও। ক্রেতা এসেছেন খুবই কম। যারা এসেছেন প্রায় সবাই দর্শনার্থী। তারা মেলায় এসে বই নেড়েচেড়ে দেখে বিদায় নেন।
মেলায় ঘুরতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারিক বলেন, ‘প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির শুরুতে বইমেলা হলেও এবার শেষদিকে হচ্ছে। প্রতিবছর বইমেলায় বেশ কয়েকবার আসি, ঘুরেফিরে দেখি ও বই কিনি। এবারও ব্যতিক্রম হবে না। তবে আজ বইমেলায় ঘুরতে এসেছি।’
প্রকাশক ও বিক্রেতাদের বক্তব্য রমজান মাস হওয়ায় এবারের বইমেলায় তুলনামূলকভাবে লোকসমাগম কম হতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার আগে খুব কম ক্রেতাই মেলায় আসার আগ্রহ দেখাবেন। তবে সন্ধ্যার পর ও ছুটির দিনগুলোতে বইমেলায় দর্শনার্থী ও ক্রেতা বাড়বে।
আদর্শ প্রকাশনীর এক বিক্রেতা বলেন, ‘লেখক, প্রকাশক আর পাঠকদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। আমরা আশা করব পাঠকরা আসবেন, বইমেলা ঘুরবেন এবং বই কিনবেন। আজ কেউ এখনো বই কেনেনি। তবে আগামীকাল (শুক্রবার) লোকসমাগম হবে এবং ক্রেতারা বই কিনবেন বলে আশা রাখছি।’
বাতিঘর প্রকাশনীর প্রকাশক দীপঙ্কর দাশ বলেন, ‘অনেক প্রতিবন্ধকতার পর বইমেলা শুরু হয়েছে। রমজান মাস হওয়ায় লোকসমাগম কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমরা আশাবাদী যারা পাঠক তারা সন্ধ্যার পরে হলেও এসে বই কিনবেন।’
এ বছর বইমেলায় ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে; বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৪৬৮টি। মোট ইউনিট ১ হাজার ১৮টি। গত বছর অংশ নিয়েছিল ৭০৮টি প্রতিষ্ঠান, ইউনিট ছিল ১ হাজার ৮৪টি।
বাংলা একাডেমি ও অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে; সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্ধারিত কমিশনে বই বিক্রি করবে। বাংলা একাডেমির নিজস্ব বই বিক্রির জন্য দুই অংশেই স্টল থাকবে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চসংলগ্ন গাছতলায় ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে ‘লিটল ম্যাগ চত্বর’ সাজানো হয়েছে। শিশুপ্রহর হিসেবে প্রতি শুক্রবার ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিশেষ আয়োজন থাকবে। শিশু কর্নারে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান ১০৭টি ইউনিটে অংশ নিচ্ছে।
প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত মূলমঞ্চে সেমিনার এবং ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। একুশের কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।