ধরাছোঁয়ার বাহিরে মূল হোতা নূরা

নরসিংদীতে ধর্ষণের পর হত্যা: বিএনপি নেতা আহম্মদ আলীসহ গ্রেপ্তার ৫

নরসিংদীর মাধবদীতে তরুণীকে ধর্ষণ ও পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় এখনো ধরাছোয়ার বাহিরে রয়েছেন ঘটনার মূল হোতা নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা। ঘটনার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও মূল অভিযুক্ত নূরাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এদিকে দুই ধর্ষক ও ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে সালিশ বৈঠকের বিচারক ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

অভিযোগ রয়েছে, ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার হাত থেকে অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নিয়ে কিশোরীকে পুনরায় ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ সরিষা ক্ষেতে ফেলে দেওয়া হয়। শুক্রবার রাতে মাধবদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মহিষাশুড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহাম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহাম্মদ দেওয়ান (৬৫), তার ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান (৩২), হোসেন বাজার এলাকার মৃত মজিবুরের ছেলে গাফ্ফার (৩৪)। ধর্ষক নূরার চাচাতো ভাই ও একই এলাকার মৃত সাহাবুদ্দিনের ছেলে এবাদুল্লাহ (৪০) এবং মো. আজগর আলীর ছেলে মো. আইয়ুব (৩০)।

মামলার প্রধান আসামি ধর্ষক নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা পেশায় একজন রিক্সা চালক।

এদিকে কিশোরীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ জেলা জুড়ে চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সংঘঠন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।

অন্যদিকে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ ও ধর্ষকসহ সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও নরসিংদী সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন। তিনি বলেন, ধর্ষক ও হত্যাকারীসহ সকল অপরাধীদের জন্য আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। অপরাধী যে দলেরই হোক তাদের ছাড় দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। ইতিমধ্যেই ধর্ষক নূরাসহ অপরাধীদের গ্রেপ্তারের জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছেন মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান এর আগে বিগত সময় অওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

পুলিশ, নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা জানায়, নিহতের বাবা আশরাফ হোসেন ময়মনসিংহের শেরপুরের বাসিন্দা। মাধবদী এলাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন। সম্প্রতি নিহত কিশোরীর মা ফাহিমা বেগমকে বিয়ে করেন। স্ত্রী, সৎ কন্যা ও ছেলেসহ মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়ায় বসবাস করতেন। গত ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নূরার নেতৃত্বে ৫-৬ জনের একটি দল এলাকা থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর বিচার চেয়ে নিহতের পরিবার আহাম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহাম্মদ দেওয়ানের দারস্থ হয়। সেখানে ধর্ষক ও তাদের সহকর্মীরা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রফাদফার চেষ্টা করেন। ওই সময় রফদফা না হওয়ায় ধর্ষিতা নিহতের পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন সালিস বৈঠকের বিচারক আহাম্মদ আলী মেম্বার।

এর পর গেল বুধবার রাতে বাবা আশরাফ হোসেন তার কাজ শেষ মেয়েকে নিয়ে তার খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বড়ইতলা এলাকায় পৌছলে নূরার নেতৃত্বে আরও ৫ জন তাদের গতিরোধ করেন। ওই সময় ধর্ষক নূরা নিহতের বাবাকে ছুরি মুখে জিম্মি করে ফেলে। পরে তার কাছ থেকে ভুক্তভোগীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। ঘটনার পর পরিরেরর লোকজনসহ বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুজি করে না পেয়ে বাড়ি ফিরে যায়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে একই এলাকার একটি সরিষা ক্ষেত থেকে গলায় ওড়না পেচানো মরদেহটি দেখতে পায় স্থানীয়রা। পরে মাধবদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করেন সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

শুক্রবার বিকালে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে নিহত তরুণীর মরদেহ মাধবদী স্থানীয় একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এঘটনায় ধর্ষক নূর মোহাম্মদকে প্রধান আসামি করে ৯ জনের নামে মাধবদী থানায় মামলা দায়ের করেন নিহতের মা ফাহিমা বেগম। এঘটনায় পুলিশ বিএনপি নেতাসহ ৫ জনকে আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালতের বিচারক আগামী রবিবার শুনানির দিনে ধার্য করেন। পরে গ্রেপ্তারকৃতদের কারাগারে পাঠানো হয়।

এ ব্যাপারে নিহত মেয়ের বাবা মো. আশরাফ জানান, নূরার নেতৃত্বে ৫-৬ জন লোক আমাকে ছুরির মুখে জিম্মি করে আমার কাছ থেকে আমার মেয়েকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে রাতে আর পাইনি। সকালে আমেনার লাশ পাই। আমার সন্তানকে যারা হত্যা করেছে আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।

সকালে নিহতের বাড়ি ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক জানিয়েছেন, ১০ ফ্রেব্রুয়ারি মেয়েটিকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। কিন্তু ভুক্তভোগীর পরিবার তখন পুলিশের কাছে আসেনি। থানায় আসলে এ ঘটনাটি ঘটতো না। তবে হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার সাথে সাথে পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে মাঠে নামে। ২ ধর্ষকসহ মোট ৫জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মূল অভিযুক্ত নুরাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের কয়েকটি টিম জেলা ও জেলার বাহিরে কাজ করছে। স্বল্প সময়ে মধ্যেই সব আসামীকে আইনের আওতায় আনা হবে।