আরাধ্য বিবেক, অবরুদ্ধ দেশপ্রেম এই দুইয়ের দোলাচলে দাঁড়িয়ে আত্মসমীক্ষার সময় এসেছে। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে এসে, প্রশ্নটি আজ কেবল দার্শনিকতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আমরা কি কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছি, কেন আজও কেবল অভিযোগের আঙুলে অন্যকে বিদ্ধ করছি? চারদিকে অস্থিরতার বিষবাষ্প। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রতিটি সেক্টর যেন ভিন্নমত আর বিভাজনের চোরাবালিতে আটকে গেছে। অথচ আমাদের চোখের সামনে, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছে গেল। আমরা যখন একে অপরের পায়ের শিকল টানতে ব্যস্ত, তারা তখন আগামীর মানচিত্র আঁকায় মগ্ন। যখন বলি ‘দেশটা গোল্লায় গেল’, তখন কি একবারও ভাবি এই গোল্লায় যাওয়ার পথে আমার ছোট একটি অনিয়ম কিংবা নীরবতা কতটা জ্বালানি জুগিয়েছে? আমরা এক অদ্ভুত দ্বিচারিতার মধ্যে বাস করছি। সকালে উঠে যে নাগরিক সিঙ্গাপুরের পরিচ্ছন্নতার প্রশংসা করেন, বিকেলেই হয়তো তিনি নিজের বাড়ির আবর্জনা রাস্তার পাশের ড্রেনে ফেলছেন। এই যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংস্কারের অভাব, এটিই সমষ্টিগতভাবে জাতীয় ব্যর্থতার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। নির্বাচিত সরকার এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমাদের চাওয়ার তালিকা দীর্ঘ নয়। শুধু স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আর জনকল্যাণ। কিন্তু বাস্তবে ভোটের বাক্সে যে স্বপ্নগুলো আমরা জমা দিই, ক্ষমতা আর দাপটের ভিড়ে সেগুলো প্রায়ই শূন্যে মিলিয়ে যায়। রাজনীতির মাঠে চোখ ফেরালে দেখা যায়, আমাদের ভিন্নমত আজ আর গঠনমূলক নেই, বরং তা ব্যক্তিগত রেষারেষিতে রূপ নিয়েছে। অথচ ‘রাজনীতি’ হওয়ার কথা ছিল নীতি ও আদর্শের লড়াইয়ের নাম। অতীতে দেখেছি, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যারা সংসদে বসেন, তাদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা এমন এক বলয়ের সৃষ্টি করেছি, যেখানে পক্ষ-বিপক্ষের দোহাই দিয়ে মেধাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
এই বিভাজন কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পাড়ার ক্লাব পর্যন্ত। যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি রন্ধ্রে দলীয় পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের অধিকারগুলো অবরুদ্ধ দেশপ্রেমের ফ্রেমে আটকা পড়ে। কৃষিপ্রধান এ দেশে কৃষক আজও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে জিম্মি। যে কৃষক রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ফসল ফলায়, তার ভাগ্যের পরিবর্তন যতটুকু হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে ফড়িয়ারা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সিন্ডিকেট সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে। এখানেই প্রশ্ন জাগে, আমাদের বিচারিক ব্যবস্থা ও আইনের শাসন নিয়ে। যেখানে বিচার পেতে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়, সেখানে সাধারণ মানুষের আস্থা টলে যাওয়াই স্বাভাবিক। মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের পেছনে শক্তিশালী বিচার বিভাগ ও আইনের সমপ্রয়োগ ছিল অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এদেশে আইন যেন মাকড়সার জাল, যেখানে ছোটরা আটকে যায় আর বড়রা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত দুর্নীতিবাজ ও সমাজবিরোধীদের আশকারা দিচ্ছে। মালয়েশিয়ার উন্নয়নের কারিগর ড. মাহাথির মোহাম্মদ যখন তার দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করেছিলেন, তখন তিনি ক্ষুদ্র স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আসলে আমাদের দেশে অভাব সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের দৈন্যদশা আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার ক্ষত। যে দেশে জিপিএ-৫ এর বন্যায় মেধার মূল্যায়ন হয় না, কিংবা যেখানে চিকিৎসার জন্য মধ্যবিত্তকে জমি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি দিতে হয়, সেখানে ‘সুশাসন’ কেবল একটি শব্দ ছাড়া আর কিছুই নয়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজ কেবল সার্টিফিকেট তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে, যা সৃজনশীল মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ। অথচ সিঙ্গাপুরের মতো ছোট একটি দেশ তাদের মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছিল, প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ জনশক্তি বড় সম্পদ। আমরা সেই উপলব্ধিতে আজও পৌঁছাতে পারিনি, বরং কোচিং বাণিজ্য আর প্রশ্ন ফাঁসের মহোৎসবে মেধার অপমৃত্যু ঘটাচ্ছি। দায় নেওয়ার সংস্কৃতি আমাদের দেশে প্রায় বিলুপ্ত। যেকোনো দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। পদত্যাগের সংস্কৃতি বা নৈতিক দায় স্বীকার, আমাদের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে নেই বললেই চলে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। যে সংবাদপত্রের কাজ ছিল সমাজের দর্পণ হওয়া, তার বৃহৎ অংশই দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত। সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস যেখানে কমে যায়, সেখানে দেশপ্রেমের পথ রুদ্ধ হওয়া অনিবার্য। নাগরিক সমাজ যখন ব্যক্তিগত সুবিধার লোভে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে, তখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর আরও ক্ষীণ হয়ে আসে। অথচ সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ তার জাতির নৈতিক ভিত্তি গঠনে নাগরিক সমাজ ও সংবাদমাধ্যমকে শৃঙ্খলার অধীনে এনে এক বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এরই সঙ্গে যোগ হয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৈন্য। আমরা আজ বিজাতীয় সংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে নিজের শেকড়কে ভুলতে বসেছি। একটি জাতির মেরুদণ্ড কেবল তার অর্থনীতি নয়, তার সংস্কৃতিও। অথচ আমরা নিজের ভাষা ও ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা করে এক ধরনের ‘হাইব্রিড’ পরিচয় নিয়ে গর্ব করি। দেশপ্রেম কেবল মানচিত্রের সুরক্ষা নয়, বরং নিজের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকেও বিশ^ দরবারে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরা। যখন কোনো জাতি তার নিজস্বতাকে হারিয়ে ফেলে, তখন তার উন্নয়নও পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা আমাদের ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠছে। ‘আমি নই, দোষ অন্যের’ এই সংস্কৃতি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন দুর্নীতি করেন, তিনি ভাবেন এটি তার অধিকার। একজন শিক্ষক যখন ক্লাসে না পড়িয়ে প্রাইভেটে ব্যস্ত থাকেন, তিনি ভাবেন এটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনৈতিকতা যখন একীভূত হয়, তখন তা পাহাড়সম দুর্নীতির রূপ নেয়। আমরা কথায় কথায় সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার উদাহরণ দিই, কিন্তু তাদের শৃঙ্খলা জীবনে ধারণ করি না। সেখানে ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে কর পরিশোধ সবখানে যে স্বচ্ছতা রয়েছে, তা এসেছে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে। আমাদের দেশে আইনের অভাব নেই, কিন্তু আছে প্রয়োগের বৈষম্য। সহনশীলতা সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষ মিলেমিশে দেশ গড়েছে আর আমরা একে অপরের থেকে হাজার মাইল দূরে সরে যাচ্ছি। জাতীয় ঐক্য ছাড়া কোনো দেশ বড় হতে পারে না এই সহজ সত্যটি আমরা বারবার ভুলে যাই। ডিজিটাল অগ্রগতির এই যুগেও আমাদের চিন্তার দৈন্য কাটেনি। প্রযুক্তির ব্যবহার যেখানে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারত, সেখানে আমরা সাইবার জগৎকে ব্যবহার করছি ঘৃণা ছড়ানো আর ব্যক্তিগত বিষোদগারের কাজে। যে মেধা প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটাতে পারত, তারা আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটছে।
মালয়েশিয়া তাদের ‘মাল্টিমিডিয়া সুপার করিডর’-এর মাধ্যমে যেভাবে প্রযুক্তিনির্ভর জাতি গড়ল, আমরা সেখানে মেধার অপচয় করছি সামাজিক অস্থিরতায়। প্রযুক্তি আমাদের হাতে এলেও এর যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটানো যায়নি। নগরায়ণের নামে আমরা চাষের জমি নষ্ট করছি, নদী দখল করছি। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা যে কতটা ভঙ্গুর, তা প্রতিদিন প্রমাণিত হচ্ছে। অথচ আমরা পরিবেশ রক্ষার চেয়ে ব্যক্তিগত মুনাফাকেই বড় করে দেখি। যুবসমাজের দিকে তাকালে হাহাকার চোখে পড়ে। মেধা পাচার আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কেন একজন মেধাবী তরুণ দেশে থাকার পরিবেশ পায় না? ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পিষ্ট হচ্ছে বড় শিল্পপতিদের দাপটে। ধনী আরও ধনী হচ্ছে, আর দরিদ্র মানুষ তার ন্যূনতম অধিকারটুকু পেতেও হিমশিম খাচ্ছে। জাতীয় উন্নয়নের জন্য আমরা প্রায়ই বিদেশি বিনিয়োগ আর সাহায্যের আশায় চাতকের মতো চেয়ে থাকি। কিন্তু ঘরের সম্পদ যে লুট হয়ে বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে লক্ষ্য রাখার অবকাশ কারও নেই। আমাদেরই এক শ্রেণির মানুষ রক্ত পানি করা টাকা বিদেশের মাটিতে পাচার করে বিলাসী জীবনযাপন করছে। আমাদের এই অদ্ভুত দেশপ্রেমে দেশের সম্পদ বিদেশের ব্যাংকে রাখা যেন এক স্বীকৃত গর্বে পরিণত হয়েছে। আসলে ব্যর্থতার দায় কারও একার নয়। এটি সামষ্টিক ব্যর্থতা। আমরা হয়তো যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে পারিনি, একই সঙ্গে আদর্শ নাগরিক হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া খুব সহজ, কিন্তু নিজের ভুল সংশোধন করা কঠিন। আমরা চাই একজন জাদুকর এসে দেশটাকে বদলে দিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো দেশ জাদুমন্ত্রে বদলায় না; দেশ বদলায় শ্রম, সততা আর ত্যাগের বিনিময়ে।
বর্তমান অস্থিরতার মাঝেও আমরা যদি আমাদের শিকড়কে ভুলে না যাই, তবেই হয়তো ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। এখন প্রয়োজন একটি জাতীয় ‘রোডম্যাপ’, যেখানে দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশ বড় হবে। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি থেকে কৃষি প্রতিটি ক্ষেত্রে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু দেশের উন্নয়নে সবাই একসূত্রে গাঁথা থাকবে। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আর দেশের সম্পদের প্রতি মমতা এই দুইয়ের মিশেলে প্রকৃত দেশপ্রেম তৈরি হয়। বিভেদ ভুলে যদি আমরা অন্তত কয়েকটি জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তবেই আমাদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। বিবেকের জাগরণই হোক আমাদের মুক্তির পথ। আমরা কি পারব নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে, দেশের স্বার্থ দেখতে? মনে রাখতে হবে দেশপ্রেম কোনো শব্দ নয়, এটি একটি পবিত্র দায়বদ্ধতা।
লেখক: সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড
antora00111@gmail.com