আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি, তারা বেশ চিন্তিত ছিলাম নির্বাচনের আগে। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা, কল্পিত ক্ষমতার স্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে, বাংলাদেশে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই ফলাফল মোটামুটি অনুমিতই ছিল। তারেক রহমান হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বলার অপেক্ষা রাখে না, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দীর্ঘ ১৮ বছর গৃহবন্দি বেগম খালেদা জিয়া ও প্রবাসে নির্বাসিত তারেক রহমানের প্রতি ভিন্নরকম সহানুভূতি কাজ করেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। আবার এর মধ্যে খালেদা জিয়ার মৃত্যু, সেই আবেগকে উঠিয়েছিল তুঙ্গে। দীর্ঘ ১৭ বছর ইউরোপের সভ্য সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশে থেকে, তারেক রহমান বর্তমানে আরও পরিণত। লোহা আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়েছে, এমনটাই আপামর জনসাধারণ ভাবছে। একজন সাধারণ বাংলাদেশি বাঙালি হিসেবে, দীর্ঘদিনের কিছু প্রত্যাশা সরকারের কাছে তুলে ধরছি। জানি, উন্নয়নশীল দেশের সরকারের নানা রকম সীমাবদ্ধতা আছে। তবু দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যা থেকে বের হওয়া দরকার। প্রথমেই সর্বত্র মামা-চাচা জোরের সংস্কৃতি বদলাতে হবে। অনেক সাধারণ বাঙালির সরকারি অফিস আদালতে যেতে অথবা সেবা পেতে, একে তাকে ধরতে হয়। অমুক অফিসে পরিচিত কে আছে, সেটি দেখতে হয়। পরিচিতরাও সবসময় কাজে সহযোগিতা করে না। এই জায়গাতেই চলে আসে ঘুষের কারবার। প্রতিটি সরকারি সেক্টরে ঘুষের অবাধ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। আমাদের মতো যারা ঘুষ দেওয়া-নেওয়াকে ঘৃণা করে, তারা পড়ি বড় ধরনের বিপদে। নিজের বিবেকের সঙ্গে যুদ্ধ করে অন্যায় কাজে মাথা নত করতে পারি না, ফলে কাজটা ঝুলে থাকে।
মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষদের ঘুষ দেওয়ার মতো এত টাকার জোর কোথায়? এই অসহায় জাতিকে উদ্ধারের জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ আশা করছি। সরকারি কোনো কোনো অফিসের পিয়ন, দারোয়ান, ড্রাইভার থেকে শুরু করে মিটার রিডার প্রত্যেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা তোলেন। এমনও দেখেছি, হোল্ডিং ট্যাক্সের টাকা তুলতে আসা কর্মকর্তা গৃহকর্ত্রীর অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ৬৫ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। যেখানে ট্যাক্স ছিল মাত্র তিন হাজার টাকা। টানাটানির সংসারে এই শ্রেণির লোকের জন্য রাখতে হয় আলাদা করে টাকা। এটা যেকোনো ধরনের একটা যন্ত্রণা, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। যে কারণে মনে হচ্ছে, প্রতিটি সরকারি অফিসে দুর্নীতি পর্যবেক্ষণের জন্য রেগুলেটরি কমিটি রাখা যেতে পারে। যারা প্রকৃত অর্থেই, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন না। কিন্তু সেখানেও যদি বেড়ায় ক্ষেত খায়, তাহলে কোনো লাভ হবে না। সরকারের প্রথম ও দৃঢ় অবস্থান হোক দুর্নীতির বিরুদ্ধে। এই একটি জায়গায় কঠোর নেওয়া সম্ভব হলে, বাকি জায়গাগুলো অনেকটাই ঠিক হয়ে যাবে। দেশের অন্যতম বড় সমস্যা হচ্ছে বেকার সমস্যা। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় টিকে, প্রত্যেকের পক্ষে চাকরির বাজারে সুযোগ পাওয়া সম্ভব না। তা ছাড়া সবাই প্রচ- মেধাবীও হয় না। যে কারণে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মধ্যম মানের মেধাবী আর একটু কম মেধাবী, এভাবে শ্রেণিবিভাগ করে মান অনুযায়ী শিক্ষিত তরুণ সমাজের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন। এ ছাড়া উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য ক্যাম্পেইন ও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থীও ঘরে বসে না থাকে। যারা বিদেশে যেতে চাচ্ছে, তাদের জন্য বিদেশ যাওয়ার ধাপগুলো সহজ করা যেতে পারে। কারণ এই প্রবাসী রেমিট্যান্সই বাংলাদেশের প্রধান আয়। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা সমভাবে উন্নত হওয়া উচিত। এই জায়গাটায় বাংলাদেশের সঙ্গে বিদেশের একটা বড় পার্থক্য। শুধু ঢাকা শহরে কিছু ভালো স্ট্রাকচারাল হাইরাইজড বিল্ডিং, ফ্লাইওভার, শপিং মল, বিনোদন কেন্দ্র দেখা যায়, যা অন্য জেলাগুলোতে নেই বললেই চলে। ধীরে ধীরে দেশব্যাপী অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে এগোতে হবে। প্রয়োজনে মেধাবী ছেলেমেয়েদের বিদেশের সমান সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ধরে রাখতে হবে। তারা যদি সবাই বিদেশমুখী হয়, তাহলে দেশের উন্নতি করবে কারা?
আজ থেকে দেড় থেকে দুইশ বছর আগে ইউরোপে, মাটির নিচে পাঁচ-ছয়তলা বিল্ডিংয়ের সমান শপিং মল, স্টেশন, মেট্রোরেল তৈরি হয়েছে। তাহলে বাংলাদেশে এখনো সেটা সম্ভব নয় কেন? পূর্বে যারা দুর্নীতি করেছে, দেখা গেছে তারা একাই কয়েকটা পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল তৈরির সমান টাকা চুরি করেছে। একই সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে বিদেশের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। প্রথমত, সব সমস্যার মূলে জনসংখ্যা, দ্বিতীয়ত শিক্ষাক্ষেত্রে। বিভিন্ন সরকার এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। শিক্ষাক্রম এবং পড়াশোনার পরিবেশকে নতুন এবং কঠোরভাবে সাজাতে হবে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই, স্বাধীনতা দিবস কবে আর বিজয় দিবস কবে তা বলতে পারে না। তাই আগের মতো কঠোরভাবে বইয়ের লাইন বাই লাইন পড়ার পদ্ধতি অনুশীলন করতে হবে। একই সঙ্গে সেই পড়া শিক্ষকদেরই আদায় করতে হবে।
জাপানিদের মতো নিয়মানুবর্তিতা, সৎ ও সুশৃঙ্খল জীবন বিধান চালু করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অবদান অপরিসীম। কলমের আঁচড়ে সহজেই অন্যায় কিছু লেখা যায়। তবে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে আজ হোক বা কাল হোক, লক্ষ্য স্থির করে অগ্রসর হতে হবে। চলার পথ যত কঠিনই হোক না কেন, সময়ের প্রেক্ষিতে সফলতা আসতে বাধ্য। আমাদের সামনে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে শিখরে ওঠার। সম্মিলিত রাজনৈতিক শক্তি এই প্রশ্নে একমত হোক যে আমরা চাই, জ্ঞানে ও মানে উন্নত বাংলাদেশ।
লেখক : কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও লেখক
jahansharmin962@gmail.com