একুশের বইমেলা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সবচেয়ে ফলপ্রসূ অংশ। একুশের বীর ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই প্রকাশ নয় এই উপস্থাপন দেশ ও জাতির মানবিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সেরা পথ বলে বিবেচনা করা যায়। আর বই পড়া হচ্ছে, চিন্তাকে অবমুক্ত করে দিয়ে জানাকে জ্ঞানে পরিণত করা। আবার মননকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হলে প্রয়োজন নিবিড় চর্চা ও গবেষণা। গবেষণা ছাড়া কোনো ইনোভেটিভ অর্জন সম্ভব নয়। ঠিক এসব পরিপ্রেক্ষিতকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলা উদ্বোধন করেছেন, পুরস্কার প্রদান করেছেন এবং একুশের পদক বিতরণ করেছেন। উল্লেখ্য, জাতীয় ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়া এই পদক প্রদানের সূচনা করেন। চিন্তা আর আকাক্সক্ষার দ্বৈরথ নির্মাণ করে জাতির চিন্তা ও কর্তব্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে প্রণোদনা দানের অন্য কোনো বিকল্প নেই।
বইমেলাকে আন্তর্জাতিক করা যায় কি না এ প্রশ্ন জনমনে থাকলেও তারেক রহমান সেই প্রস্তাব করেছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি যেহেতু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে, সে সূত্র ধরে আমাদের একুশের মেলাকেও আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করা যায়। সেটা হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ ও সুপরিসরে আয়োজন। এ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে, এই মেলার ডিজাইন ও অংশগ্রহণকারী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তা পরিণত করা যায়। আমাদের ভাবতে হবে, কেবল দেশের শিল্প-সাহিত্যই পাঠ্য নয়, আন্তর্জাতিক সাহিত্যের রূপরেখাও দেখা, জানা ও বোঝা উচিত। আমাদের জ্ঞানচর্চায় ঘাটতি আছে। ইন্টারনেটের সাহায্যে কিছু জ্ঞানার্জন সম্ভব হলেও, তার স্বাদ পাতায় মুদ্রিত গ্রন্থ ছুঁয়ে-ছেনে দেখে ও পড়ে যে স্বাদ নেওয়া যায়, তার মতো নয়। এজন্য আমাদের বই যেমন আন্তর্জাতিক ভাষায় অনূদিত হওয়া জরুরি, তেমনি আন্তর্জাতিক ভাষার বই বাংলায় অনূদিত হওয়াও উচিত। তাহলেই আমরা ইন্টারেকটিভভাবে চেতনার আদান-প্রদান করতে পারব। আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নবরূপায়ণ পৌঁছে দিতে পারব বিশ^সাহিত্যের আঙিনায়। তারা পড়ে জানুক, আমাদের বৃহত্তর লোকসাহিত্যের নবতর অর্জনগুলো। যে জাদুবাস্তবতার গুণ দেখিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার সাহিত্য আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে, তা যে আমাদের লোকগল্পের মধ্যে শত শত বছর আগে থেকেই ছিল, তা জানানো দরকার। এটা একমাত্র সম্ভব অনুবাদের মাধ্যমে।
এ বছর একুশের বইমেলায় বেশ ঝক্কি গেছে। এর মূল কারণ দুটি। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং ১৮ তারিখ থেকে পবিত্র রমজান। এ দুটি কারণে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরু করা যায়নি। আবার ২০ তারিখে মেলার তারিখ ঠিক করেও স্টল বরাদ্দ নিয়ে দ্বিমত, প্রকাশক মহলকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলে। পরে অবশ্য জোড়াতালি দিয়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলা উদ্বোধন হবে। ইতিমধ্যে উদ্বোধন হয়েছে মেলা, কিন্তু অধিকাংশ স্টল ঠিকমতো করতে পারেনি। রোজার মধ্যে বইমেলা জমবে না, ঈদের পরে গেলে ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কায় ভুগতে ভুগতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তা পরিত্যাগ করা যেত। যাই হোক, মেলা এখন নতুন গতি পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বই-পোকাদের মন পড়ে থাকে বইয়ের পঙ্ক্তিতে। শিশুদের মনও অনেক বিস্ময় জাগানিয়া কাহিনির অলৌকিক ছবিতে ভাসতে থাকে। স্বপ্নবাস্তব আর কল্পবাস্তবের মিশেলে আমাদের গণসাহিত্য নতুনভাবে ফুল্ল হয়ে উঠুক, সেটাই চাই। এক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনার বিশেষ পদক্ষেপ জরুরি। গ্রন্থকে একেবারে প্রান্তিক জনগণের স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মননকে সমৃদ্ধ করতে পাঠাতে হবে সেই এলাকায়। প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা স্তর বই প্রমোশনের আওতায় আসুক। তাহলে গরিব মানুষের সাংবিধানিক অধিকার পূরণ করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, বই কেবল নগরবাসীর জন্য নয়।