ইরাক যুদ্ধের ছায়া কি এবার ইরানের আকাশে?

২০০২ সালের অক্টোবর মাস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ টেলিভিশনে আধঘণ্টার এক ভাষণে ইরাক আক্রমণের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে বলেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের শাসনামল যেকোনো দিন অ্যানথ্রাক্স, মাস্টার্ড গ্যাস বা সারিন গ্যাসের মতো রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে পারে। 

বুশের দাবি ছিল, ইরাক পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে এবং এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বোমা তৈরি করতে পারে। মার্কিন জনগণকে আতঙ্কিত করতে তিনি সেই সময় বলেছিলেন, ‘বিপদের স্পষ্ট প্রমাণ সামনে রেখে আমরা চূড়ান্ত প্রমাণের (স্মোকিং গান) জন্য অপেক্ষা করতে পারি না, যা একটি মাশরুম ক্লাউড (পারমাণবিক বিস্ফোরণ) হিসেবেও আসতে পারে।’

পরবর্তীকালে বিশ্ব জানতে পারে, বুশের সেই যুদ্ধ ছিল পরিকল্পিত মিথ্যা আর গোয়েন্দা তথ্যের কারসাজি। ইরাকের কাছে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না। তবে সাদ্দামকে হুমকি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সেই প্রচারণায় কাজ হয়েছিল। ২০০৩ সালে যখন আক্রমণ শুরু হয়, তখন ৭০ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন।

আজ দুই দশক পর বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তবে ২০০৩ সালের মতো এবার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা হুমকির প্রমাণ মার্কিন জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে না। ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এবারই সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ ট্রাম্প বা তার শীর্ষ উপদেষ্টারা স্পষ্ট করছেন না কেন তারা ইরানে বোমা হামলা করতে চান বা তাদের লক্ষ্য আসলে কী।

বিগত কয়েক দশকে আমেরিকানদের মনোভাবও বদলেছে। ২০০৩ সালে ৯/১১-এর ক্ষত ছিল টাটকা, কিন্তু আজ অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক বিদেশি যুদ্ধে জড়ানোর বিরোধী। কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ৭০ শতাংশ ভোটার ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের বিপক্ষে। এমনকি ট্রাম্পের নিজের ‘মাগা’ সমর্থকরাও এতে ক্ষুব্ধ হতে পারেন, কারণ ট্রাম্প নিজেকে ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বন্ধ করার নেতা হিসেবে প্রচার করে আসছেন।

গত এক মাসে পেন্টাগন ইরানের হামলা দূরত্বের মধ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরী, কয়েক ডজন ফাইটার জেট এবং বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে। এই বিশাল বাহিনী সপ্তাহব্যাপী বড় ধরনের সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত। অথচ এই সম্ভাব্য যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো গণবিতর্ক নেই। ডেমোক্র্যাটরা ভোটাভুটির চেষ্টা করলেও রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এখনো নীরব।

গত মঙ্গলবার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্পের কাছে ইরান বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা আশা করেছিল বিশ্ব। কিন্তু দীর্ঘ ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের ভাষণে তিনি ইরানের জন্য ব্যয় করেছেন মাত্র তিন মিনিট। সেখানেও ছিল অস্পষ্টতা। তিনি বলেন, আমরা তাদের সাথে আলোচনা করছি। তারা একটি চুক্তি করতে চায়।’

তবে কিসের চুক্তি বা তার লক্ষ্য কী—তা তিনি খোলাসা করেননি। ট্রাম্পের দাবি, ইরান সন্ত্রাসের মদতদাতা এবং তিনি তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেবেন না।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের নেতারা কখনো বলেননি যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। অথচ তেহরান বারবারই বলছে তাদের এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। এমনকি ভাষণের আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও নিশ্চিত করেছেন যে তারা কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবেন না।

গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরোক্ষ আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। ওমানের মধ্যস্থতায় আগামী সপ্তাহে আবারও আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও ট্রাম্পের ধৈর্য কম। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানকে চাপে ফেলে নতি স্বীকার করাতে তিনি সীমিত পরিসরে সামরিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন।

ইরানের বর্তমান সঙ্কটের শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে, যখন ট্রাম্প একতরফাভাবে পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ওবামা আমলের সেই চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর সীমা আরোপের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল। চুক্তিটি ভেঙে যাওয়ার পর ইরানের সামনে আর কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না।

২০২৫ সালের শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে অন্তত ছয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। তবে গোয়েন্দাদের মতে, ইরান এখনো বোমা তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং একটি কার্যকর ওয়ারহেড তৈরিতে তাদের আরও এক বছর সময় লাগতে পারে।

গত বছরের জুনে ইসরায়েল ইরানে আকস্মিক বিমান হামলা চালায় এবং যুক্তরাষ্ট্রও তাতে যোগ দিয়ে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা ফেলে। ট্রাম্প তখন দাবি করেছিলেন, ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলো তিনি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটেও এখনো সেই দাবি ঝুলছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে- যদি পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসই হয়ে গিয়ে থাকে, তবে কেন মধ্যপ্রাচ্যে আবার বিশাল রণতরী পাঠানো হচ্ছে? কেন অঞ্চলটিকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? গত ১৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটকে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি শুধু বলেছেন, প্রেসিডেন্ট সবসময় আমেরিকার স্বার্থের কথা চিন্তা করেন, তাই জনগণের উচিত তাকে বিশ্বাস করা।

কিন্তু দুই দশক আগে একজন প্রেসিডেন্টকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করার করুণ পরিণতি বিশ্ব দেখেছে। ট্রাম্প এখন কোনো শক্তিশালী যুক্তি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি বিপর্যয়কর যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন কি না, সেই আশঙ্কাই এখন প্রবল।