জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

দক্ষিণ সুদানে আবারও ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা

বিশ্বের নবীনতম রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান আবারও একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের একটি তদন্তকারী সংস্থা। দেশটিতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে কমিশন অন হিউম্যান রাইটস ইন দক্ষিণ সুদান (সিএইচআরএসএস) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনটি পেশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ সুদানের সাধারণ মানুষ বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হত্যা, পদ্ধতিগত যৌন সহিংসতা, নির্বিচার আটক এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মতো ঘটনা সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র এই দেশটিতে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হচ্ছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক সুরক্ষাকবচগুলো ভেঙে পড়ায় দেশটিতে নতুন করে গণ-নৃশংসতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে কঠোর কূটনৈতিক চাপ এবং অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আহ্বান জানানো হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাতদের দায়ী করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের শান্তি চুক্তির শর্ত পরিবর্তনের চেষ্টা এবং বিরোধী নেতাদের দমনের ফলে স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। গত বছর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট রিয়েক মাশারকে আটক এবং তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার কারণে শান্তি চুক্তির মূল ভিত্তিটিই দুর্বল হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট সালভা কির (ডিংকা জাতিগোষ্ঠী) ও রিয়েক মাশারের (নুয়ের জাতিগোষ্ঠী) মধ্যকার দ্বন্দ্ব থেকেই দেশটিতে প্রথম গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল।

জাতিসংঘের তদন্তে উঠে এসেছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক অভিযানে এক বিপজ্জনক পরিবর্তন এসেছে। এখন জনবহুল বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশ উগান্ডার সেনাবাহিনী দক্ষিণ সুদানের সরকারি বাহিনীকে সরাসরি সহায়তা করছে, যা জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার স্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশেষ করে বিরোধী দল প্রভাবিত এলাকাগুলোতে এই যৌথ বিমান হামলা চালানো হচ্ছে, যেখানে সাধারণ নুয়ের জনগোষ্ঠীর মানুষ চরম ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

প্রতিবেদনে যৌন সহিংসতাকে সংঘাতের একটি ‘স্থায়ী বৈশিষ্ট্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত এক দশকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে এবং সামাজিক ঐক্য বিনষ্ট করতে ধর্ষণকে একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্তমানে দেশটির অধিকাংশ নারী ও শিশু প্রতিনিয়ত যৌন নিপীড়নের হুমকির মুখে দিন কাটাচ্ছে। তা সত্ত্বেও জ্যেষ্ঠ কমান্ডার বা রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, যা দেশটিতে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে গেঁথে দিয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ সুদানে প্রায় ১ কোটি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। গত ডিসেম্বর থেকে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় প্রায় ২ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে। 

ইউনিসেফ সতর্ক করেছে যে, শুধুমাত্র জংলেই রাজ্যেই প্রায় ৪ লক্ষ ৫০ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং ত্রাণ লুটপাটের ঘটনাও ঘটছে। কমিশন অবিলম্বে এই সহিংসতা বন্ধ এবং ২০১৩ সাল থেকে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ আদালত গঠনের জোর দাবি জানিয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা