পাকির আলী। আশি-নব্বই দশকে ঢাকার মাঠ মাতানো শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি ফুটবলার। বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ার ছাড়ার পর কোচ হিসেবে যশ কামিয়েছেন। বাংলাদেশে আবাহনী, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের মতো দলকে কোচিং করিয়েছেন। ৭৩ বছর বয়সে এখন পেশাদার কোনো ক্লাবের দায়িত্বে নেই। তবে নিজের ফুটবল একাডেমিতে গড়ে তুলছেন ভবিষ্যতের তারকা। মেয়েদের এশিয়ান কাপ কভার করতে অস্ট্রেলিয়ার পথে দেশ রূপান্তর-এর সুদীপ্ত আনন্দ, লম্বা ট্রানজিটে কলম্বোর একটি হোটেলে তার সঙ্গেই আড্ডায় মেতেছিলেন এক সময়ের সেন্টার ব্যাক। জানা গেল, বাংলাদেশে খেলতে খেলতে শেখা বাংলা এখন তার কাজে লাগছে অন্য ভূমিকায়।
প্রশ্ন: পাকির ভাই, শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন। আমরা জানি অনেক বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় জাতীয় দলে যোগ দিয়েছেন এবং তারা দলকে শক্তিশালী করেছেন। অতীত এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দলের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান অবস্থাটা কেমন?
পাকির আলী: জাসওয়ার উমর শ্রীলঙ্কা ফুটবল ফেডারেশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের শ্রীলঙ্কায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা হাতে নেন। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা অনেক এবং বাইরে তাদের খেলার প্রতিযোগিতার মান অত্যন্ত উঁচু। এই খেলোয়াড়রা আসার পর আমাদের শ্রীলঙ্কা জাতীয় দল অনেক শক্তিশালী হয়েছে এবং আমরা বেশ কিছু ম্যাচ জিতেছি। এমনকি আমাদের ফিফা র্যাংকিংও উন্নত হয়েছে। সামনে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আছে। সেখানে আমরা বুঝতে পারব যে এই পরিকল্পনা কতটা ইতিবাচক হয়েছে এবং দল আসলে কোন পর্যায়ে। দিনশেষে সাফ টুর্নামেন্ট এখানকার সব দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এশিয়ান কাপ বাছাইয়েও তারা খুব ভালো খেলেছে। সবচেয়ে ইতিবাচক হলো আরও অনেক খেলোয়াড় শ্রীলঙ্কা স্কোয়াডে যোগ দিতে চায়। আশা করি সব ঠিকঠাক হবে। একই সঙ্গে ফেডারেশন ভবিষ্যতের জন্যও করছে যাতে বিদেশি খেলোয়াড়দের পাশাপাশি স্থানীয় খেলোয়াড়রা উন্নতি করতে পারে।
প্রশ্ন: আপনার বাংলাদেশে কাজ করার বিশাল অভিজ্ঞতা আছে। ভিন্ন ভিন্ন ক্লাবের হয়ে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের শীর্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করেছেন। এখন বাংলাদেশও কিছু বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় নিয়ে এসেছে। হামজা চৌধুরী, সামিত শোম এবং আরও অনেকে। আপনাকে যদি বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বর্তমান মানের তুলনা করতে বলা হয়, কী বলবেন?
পাকির আলী: এটা বলতে পারি বর্তমান শ্রীলঙ্কা দল বাংলাদেশ দলের সঙ্গে লড়াই করতে পারবে। মানে, এই বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার একটি ভালো প্রতিযোগিতা হবে। কারণ আমাদের লেভেল এখন ওপরে উঠেছে এবং তারা ভালো খেলছে। তবে আবার এখানে একটি বিষয় আছে, যেমন চৌধুরী (হামজা চৌধুরী)। সে অনেক উঁচু মানের খেলোয়াড়। সে লেস্টার সিটিতে খেলছে, তাই আমি মনে করি সে একাই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
প্রশ্ন: কিন্তু ফুটবল তো একজনের খেলা নয়।
পাকির আলী: এটা ঠিক, এটি একটি সম্মিলিত খেলা। তবে চৌধুরী (হামজা) এমন একজন খেলোয়াড়, যার অভিজ্ঞতা অনেক এবং সে যে মানের লিগে খেলছে তা অনেক উঁচুতে। সে এমন একজন যে একাই তিনজনের সমান খেলতে পারে।
প্রশ্ন: শ্রীলঙ্কা ফুটবল ফেডারেশন এত বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় কীভাবে খুঁজে বের করল?
পাকির আলী: আমাদের একটা স্কাউটিং গ্রুপ আছে। তারাই মূলত এই খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করার কাজটা করে এবং তারা এখনো এটি করে যাচ্ছে।
প্রশ্ন: আপনি শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের সঙ্গে কাজ করেছেন। নিশ্চয় জানেন ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর এই ক্লাবটি বন্ধ হয়ে গেছে...
পাকির আলী: দেখুন, আমি সত্যিই যা অনুভব করি তা হলো রাজনীতি কখনোই খেলাধুলার ভেতরে আসা উচিত নয়। আরেকটি বিষয় যা ঘটেছে। সে বছর আবাহনী ক্লাব যেভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে এবং মানুষ গিয়ে সব ট্রফি লুট করেছে, সেটা দেখে খুব খারাপ লেগেছে। আমরা যখন আবাহনীতে খেলতাম, আমরা সমর্থকদের বা দর্শকদের আনন্দ দিতাম। বিনিময়ে আমরা অর্থ পেতাম, বেতন পেতাম সেটা ছিল আমাদের সার্ভিসের জন্য। তবে আমাদের কাছে স্মৃতি হিসেবে শুধু একটি ট্রফি। শুধু একটি ট্রফি নয়। এটা দর্শকদের ভালোবাসা। যখনই বাংলাদেশে যাই এবং ট্রফি রুমে গিয়ে দেখি তখন অনেক স্মৃতি ফিরে আসে। মনে পড়ে, আরে, এটা তো সেই কাপ যা আমি খেলে জিতেছিলাম। এখন যদি দেখি সেটি আর নেই, তখন আমার কেমন লাগবে? আমি ভাবব, হায়, কোথায় আমার কাপটা? আমি তো এখানেই রেখেছিলাম। এর সঙ্গে আমাদের রক্ত লেগে আছে। কেবল আমি নই, সব দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়, আমরা মাঠে ঘাম ঝরিয়েছি, এমনকি দর্শকদের আনন্দের জন্য রক্তও ঝরিয়েছি। বিনিময়ে আমরা যা পাই তা হলো এই ছোট ট্রফি বা মেডেলগুলো।
প্রশ্ন: বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশকে এখনো অনেক মিস করেন। অনেক খবরও রাখেন...
পাকির আলী: আরে বাপ রে! প্রচুর, প্রচুর ভাই! একটা গল্প বলি। শেখ জামালে আসার আগে আমার মায়ানমারের একটা প্রফেশনাল টিমে যাওয়ার কথা ছিল। আমার ভিসাও হয়ে গিয়েছিল, আমি শুধু টিকিটের অপেক্ষায় ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আমিনুল (সাবেক গোলরক্ষক ও বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী) আমাকে ফোন করল। ও বলল- ওস্তাদ, কই আপনি? আমি বললাম, আমি তো টিকিটের জন্য বসে আছি, মায়ানমার যাচ্ছি। ও বলল, না না, আপনি তো যাইতে পারবেন না! আমাদের দলের দায়িত্ব নিতে হবে। যখনই বাংলাদেশের কথা আসল, আমার মনে হলো যে ওখানে (মিয়ানমারে) না যাওয়াই আমার জন্য ভালো হবে। আমি মায়ানমারের ক্লাবের টেকনিক্যাল ডিরেক্টরকে (যিনি আমার ভালো বন্ধু) মিথ্যা বলতে বাধ্য হলাম যে, আমার ফেডারেশন আমাকে ছাড়পত্র দিচ্ছে না। এভাবেই আমি বাংলাদেশে চলে আসলাম। বাংলাদেশের জন্য আমার মনে অন্যরকম একটা জায়গা আছে।
প্রশ্ন: এখন তো আমিনুল ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী...
পাকির আলী: হ্যাঁ, ও আমার ছাত্র ছিল, খুব ভালো একটা ছেলে এবং খুব ভালো ফুটবল খেলেছে। এখন একজন ফুটবলার প্রতিমন্ত্রী হয়েছে এটা আমার জন্য অনেক বড় গর্বের বিষয়। আমি চাই সে ফুটবলের জন্য ভালো কিছু করুক। বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন খুব ভালো করছে। আমার অনুরোধ থাকবে আমিনুল যেন ফুটবলকেও সেই উচ্চতায় নিয়ে যায়। তার কাছে আমার চাওয়া একটাই সে এমন কিছু করুক, যাতে অতীতের মতো মাঠ হাউজফুল থাকে। আমি চাই সেই উন্মাদনা আবার ফিরে আসুক।
প্রশ্ন: এই বয়সেও আপনি অনেক সামর্থ্যবান আছেন। চাইলেই তো পেশাদার ক্লাবগুলো নিয়ে কাজ করতে পারেন...
পাকির আলী: অবশ্যই পারি। তবে আমি এখন সেটা করতে চাই না। এখানে সবাই শুধু ওপরটা নিয়ে ভাবে। কিন্তু নিচটা শক্ত না হলে ওপর কখনোই শক্তিশালী হবে না। তাই আমি তৃণমূলে কাজ করতে বেশি আগ্রহী। আমি বিদেশে গিয়ে যেটা শিখেছি সবাই মনে করে তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ কোচ দিয়ে কাজ চালানো যায়। এটা ভুল। গ্রাসরুট লেভেলেই সবচেয়ে সেরা মানের কোচের প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কায় আমি এখন গ্রাসরুট নিয়ে কাজ করছি। আমরা শুধু ফুটবল খেলানো শেখাই না, ফুটবল দিয়ে তাদের যদি শিক্ষিত করতে পারি তবে তারা কেবল ভালো খেলোয়াড় নয়, বুদ্ধিমান খেলোয়াড় হবে।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে কি বাংলাদেশে কাজ করার কোনো আগ্রহ আছে?
পাকির আলী: এটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ থেকে ডাকলে তো আসবই। আপনারা তো জানেনই, এটা তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই (হাসি)। একটা কথা একটু বলতে চাই। আমি কিন্তু এখানে বাংলা ভাষার দোভাষী হিসেবে একটা কাজ করছি।
প্রশ্ন: সেটা কেমন?
পাকির আলী: আসিরি সেন্ট্রাল হসপিটাল নামে কলম্বোর একটি বেসরকারি হাসপাতাল, যেখানে অনেক ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। তারা চাচ্ছে আন্তর্জাতিক রোগীরাও যাতে এ দেশে এসে চিকিৎসা নেয়। সেখানে আমরা স্ত্রীও কাজ করেন। এই হাসপাতালে একবার আমার মেয়ের চিকিৎসা করিয়েছিলাম। তখন তারা আমাকে প্রস্তাব দেয় শুভেচ্ছা দূত হিসেবে থাকার এবং একজন বাংলা দোভাষী হিসেবে কাজ করার। আমি সানন্দে রাজি হয়ে যাই। আমি তাদের সঙ্গে চুক্তি করি। তবে কেবল টাকার জন্য নয়। আমি কাজটা করেছি বাংলাদেশের মানুষ ও বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি বলেই। তাই বলতে পারেন নিজ দেশে এখন আমি বাংলা দোভাষী (হাসি)।