ইফতারের টেবিলগুলো একেকটা গল্পের ঝুলি

তুরস্কের রাজকীয় রুটি থেকে শুরু করে আমাদের পরিচিত মুড়ি মাখানো ভৌগোলিক দূরত্ব আর খাবারের ভিন্নতা থাকলেও ইফতারের প্রতিটি দস্তরখান আসলে একই পরম মমতা আর ভ্রাতৃত্বের গল্প বলে। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

রমজানের চাঁদ আকাশে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো পৃথিবীর চেনা ছন্দটা যেন এক লহমায় বদলে যায়। ভোরের আলো ফোটার আগে সাহরির সেই আধো-ঘুম আধো-জাগরণ দস্তরখান থেকে শুরু করে সূর্যাস্তের প্রতীক্ষায় থাকা ইফতারের টেবিল সবখানেই এক অদ্ভুত মায়া কাজ করে। তবে ইফতার কেবল এক বাটি ছোলা-মুড়ি বা কয়েকটা খেজুরের গল্প নয়; এটি হলো দেশ-কাল-পাত্রভেদে মানুষের রুচি, সংস্কৃতি আর আড্ডার এক বিশাল ক্যানভাস। কোনো দেশে ইফতার মানে রাজকীয় আভিজাত্য, কোথাও বা রাস্তার ধারের হুল্লোড়, আবার কোথাও স্রেফ এক কাপ কফি আর আধ্যাত্মিক নীরবতা। চলুন, আজ পাড়ি জমানো যাক বিশ্বের সেই সব প্রান্তে, যেখানে ইফতারের টেবিলগুলো একেকটা গল্পের ঝুলি সাজিয়ে বসে আছে।

তুরস্কের রাজকীয় দস্তরখান

তুরস্কের ইফতার মানেই এক অন্যরকম নস্টালজিয়া। অটোমান সাম্রাজ্যের সেই পুরনো জৌলুস আজও যেন ইস্তাম্বুলের অলিগলিতে মিশে আছে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে যখন সূর্যটা বসফরাস প্রণালির ওপারে হেলে পড়ে, তখন পুরো শহর এক জাদুকরী নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার ভেতরেও চলে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। তুরস্কের ইফতারের প্রাণ হলো ‘রমজান পিদে’। এটি বিশেষ এক ধরনের গোল ও নরম রুটি, যা সারা বছর পাওয়া গেলেও রমজানে এর কদর আকাশচুম্বী। বেকারির সামনে শত শত মানুষের লাইন আর সেই তপ্ত রুটির গন্ধে চারপাশ ম ম করে।

তুরস্কের মানুষ ইফতার শুরু করে খুব হিসাব করে। প্রথমেই ভারী কিছু না খেয়ে তারা এক বাটি গরম লেন্টিল স্যুপ বা ‘মেরজিমেক চোরবাসি’ দিয়ে পেটকে শান্ত করে। সঙ্গে থাকে জলপাই আর পনির। তুর্কিদের কাছে ইফতার মানেই হলো প্রতিবেশীদের সঙ্গে আদান-প্রদান। সুলতান আহমেদ মসজিদের সামনের বিশাল চত্বরে যখন হাজার হাজার মানুষ রঙিন চাদর বিছিয়ে বসে পড়ে, তখন সেটাকে ইফতারের চেয়ে বড় কোনো পিকনিক মনে হয়। সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ। ইফতারের পর তুর্কি চা আর বাকলাভা না হলে তাদের রাতটা যেন অপূর্ণ থেকে যায়। আভিজাত্য আর সারল্যের এমন মিশেল তুরস্ক ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া ভার।

সৌদি আরবের মরু-সংস্কৃতি

সৌদি আরবের ইফতারের মেজাজটা শুরু হয় একদম সাদামাটাভাবে, কিন্তু শেষ হয় রাজকীয় ভোজের মাধ্যমে। মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদে যখন ইফতারের সময় হয়, তখন সেখানে এক অপার্থিব দৃশ্য তৈরি হয়। মাইলের পর মাইল দস্তরখান বিছিয়ে রাখা হয়, যেখানে বিশ্বের সব প্রান্তের মানুষ একসঙ্গে বসে। এখানকার ইফতারের মূল নায়ক হলো খেজুর আর ‘গাহওয়া’ বা আরব্য কফি। এলাচ আর জাফরানের সুবাস মাখা সেই কফি আর তাজা খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙার পর শুরু হয় আসল উৎসব।

মাগরিবের নামাজের পর সৌদিদের পাতে আসে ‘কাবসা’। বড় থালায় সুগন্ধি চালের ওপর আস্ত খাসি বা মুরগির রোস্ট এটি কেবল খাবার নয়, এটি তাদের ঐতিহ্যের প্রতীক। সৌদি আরবে রমজানে দান করার এক অনন্য প্রতিযোগিতা দেখা যায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে তরুণরা প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। সিগন্যালে গাড়ি থামলেই হাসিমুখে ইফতারি বাড়িয়ে দেয়। সেখানে ইফতার মানেই হলো পরম করুণাময়ের মেহমান হওয়া। জাঁকজমক থাকলেও সৌদি ইফতারে এক ধরনের নিবিড় আধ্যাত্মিক প্রশান্তি মিশে থাকে, যা মনের ভেতর এক গভীর প্রশান্তি এনে দেয়।

মিসরের ফানুস

মিসরে রমজান মানেই হলো আলোর উৎসব। কায়রোর রাস্তাগুলোতে যখন রঙিন কাগজের সাজসজ্জা আর ঝকঝকে ‘ফানুস’ বা লণ্ঠন জ্বলে ওঠে, তখন মনে হয় পুরো শহর যেন কোনো রূপকথার রাজ্যে পরিণত হয়েছে। মিসরের ইফতার সংস্কৃতি পৃথিবীর অন্য সব দেশের চেয়ে আলাদা কারণ তাদের ‘মাওয়াইদ আল-রাহমান’ বা করুণাময়ের টেবিল। রাস্তার ওপর হাজার হাজার ফুট লম্বা টেবিল পাতা থাকে, যেখানে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে যে কেউ বসে ইফতার করতে পারে। এটি তাদের কাছে কেবল দান নয়, বরং সামাজিক সংহতির এক অনন্য নিদর্শন।

মিসরীয় ইফতার টেবিলে কুনাফা আর কাতায়েফ হলো অবিচ্ছেদ্য অংশ। চিনির সিরায় ডোবানো এই মিষ্টিগুলো ছাড়া তাদের ইফতারি যেন প্রাণ পায় না। সঙ্গে থাকে ‘ফুল মেদাদেস’ বা শিমের তৈরি এক বিশেষ পদ। মিসরের মানুষ খুব উৎসবপ্রিয়। ইফতার শেষ করে তারা সারা রাত রাস্তায় আড্ডা দেয়, গান গায় আর জীবনকে উদযাপন করে। মিসরের ইফতার তাই কেবল উপবাস ভাঙার মুহূর্ত নয়, এটি তাদের সংস্কৃতির এক বিশাল বহিঃপ্রকাশ।

মালয়েশিয়ার রঙিন বাজার

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ায় ইফতার মানেই হলো রঙের মেলা। সেখানে ইফতারি প্রস্তুতির চেয়ে বড় আয়োজন হলো ‘বাজার রমাদান’। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ সব ছোট ছোট দোকান, আর সেখান থেকে ভেসে আসা সাতে (শিক কাবাব) বা গ্রিল করা মাছের সুবাসে যে কারও ক্ষুধা বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। মালয়েশীয়রা সাধারণত একটু মিষ্টি আর মসলাদার খাবার পছন্দ করে। তাদের টেবিলে থাকে ‘নাসি লেমাক’ আর হরেক পদের রঙিন পিঠা বা ‘কুইহ’।

আধুনিক মালয়েশিয়ায় এখন মানুষ ঘরে রান্নার চেয়ে বাজার থেকে খাবার কিনে আনা বা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার করাটাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। তবে ঐতিহ্যের ছোঁয়া এখনো গ্রামগুলোতে রয়ে গেছে। সেখানে সবাই মিলে বড় ডেকচিতে ‘বুবুর ল্যাম্বুক’ বা এক ধরনের জাউ রান্না করে পাড়ার সবার মাঝে বিলিয়ে দেয়। মালয়েশিয়ার ইফতার হলো আধুনিক জীবনযাত্রা আর পুরনো ঐতিহ্যের এক চমৎকার মিশেল, যা পর্যটকদের কাছেও দারুণ আকর্ষণীয়।

দক্ষিণ এশিয়ার মসলাদার মুড়ির জাদু

বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের ইফতারি মানেই হলো তেলের খেলা আর মসলার জাদু। আমাদের এই অঞ্চলে ইফতারের ঠিক এক ঘণ্টা আগে থেকে এক অদ্ভুত উন্মাদনা শুরু হয়। পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ আর ডালপুরি ভাজার সেই শব্দ যেন চারপাশের বাতাসের সুর বদলে দেয়। বিশেষ করে চকবাজারের মতো জায়গাগুলোতে যখন হাজার হাজার মানুষ ইফতারি কিনতে ভিড় করে, তখন সেখানে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে।

আমাদের ইফতারের আসল প্রাণ হলো ‘মুড়ি মাখানো’। ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, শসা আর ধনেপাতা দিয়ে যখন সরিষার তেল মেখে মুড়ি তৈরি করা হয়, সেই স্বাদের কাছে পৃথিবীর সব দামি খাবার হার মানে। সঙ্গে থাকে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত বা রুহ আফজা। দক্ষিণ এশিয়ার ইফতার মানেই হলো পরিবারের সবাই মিলে গোল হয়ে বসে কাড়াকাড়ি করে খাওয়া। এখানে ইফতার মানে কেবল পেট ভরা নয়, বরং এটা একটা হুল্লোড় মাখা পারিবারিক মুহূর্ত। জিলাপির প্যাঁচ আর হালিমের স্বাদ আমাদের ইফতারকে এক অনন্য স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।

ইউরোপ-আমেরিকার দস্তরখান

পশ্চিমের দেশগুলোতে ইফতারের দৃশ্যপট একদম ভিন্ন। সেখানে মুসলিমরা সংখ্যালঘু, তাই ইফতারের আয়োজনগুলো মূলত মসজিদকেন্দ্রিক হয়। লন্ডন বা নিউ ইয়র্কের মসজিদগুলোতে যখন ইফতারের সময় হয়, তখন সেখানে এক ছোটখাটো ‘মিনি ওয়ার্ল্ড’ তৈরি হয়। একই টেবিলে বসে হয়তো একজন নাইজেরিয়ান, একজন পাকিস্তানি আর একজন সিরীয় মানুষ ইফতার করছেন। ফলে খাবারের টেবিলেও থাকে বৈচিত্র্যের ছাপ। কেউ নিয়ে আসে সমুচা, কেউ বা হুমুস, আবার কেউ হয়তো নিয়ে আসে তার দেশের বিশেষ কোনো পিঠা।

পশ্চিমা বিশ্বে কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝে রোজা রাখাটা বেশ কঠিন হলেও ইফতারের সময়টা তাদের কাছে শিকড়ের টানে ফেরার মতো। সেখানে ইফতারি মানেই হলো নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পাওয়া এবং ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়া।

ইফতার-পরবর্তী আমেজ

ইফতারের ঠিক পরেই শহরগুলোর চেহারা বদলে যায় এক অপার্থিব শান্তিতে। এক চিলতে পানি আর কয়েকটা খেজুর পেটে পড়ার পরেই শরীরের ক্লান্তি যেন নিমেষেই উধাও হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় ইফতার পরবর্তী আড্ডা। তুরস্কের ক্যাফেগুলোতে তখন ছোট ছোট কাচের কাপে লালচে চা আর ধোঁয়া ওঠা কফির আসর বসে। মিসরের রাস্তায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ফানুস হাতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে, আর বয়স্করা মেতে ওঠেন পুরনো দিনের গল্পে। দক্ষিণ এশিয়ায় ইফতারের পর জিলাপি বা মিষ্টি মুখ করে সবাই যখন মসজিদের দিকে পা বাড়ায়, তখন সাদা টুপি আর পাঞ্জাবির এক বিশাল মিছিল দেখা যায়। ইফতারের সেই ভারী ভোজের পর তারাবিহর নামাজের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার যে শক্তি, তা যেন এক অলৌকিক প্রশান্তি এনে দেয়। ইফতার থেকে সাহ্রি পর্যন্ত এই যে কয়েক ঘণ্টার বিরতি, এই সময়টাই হলো উৎসব আর ইবাদতের এক মেলবন্ধন। এই সময়েই বোঝা যায়, রমজান কেবল ত্যাগের মাস নয়, এটি হলো আত্মিক পুনর্জাগরণের এক সুবর্ণ সুযোগ।

ইফতার এক সেতুবন্ধ

গোটা বিশ্বের ইফতার সংস্কৃতি যদি আমরা একসঙ্গে দেখি, তবে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে ওঠে খাবার এবং পরিবেশ ভিন্ন হলেও মানুষের অনুভূতি কিন্তু একদম এক। তুরস্কের সেই রাজকীয় অটোমান ঐতিহ্য, সৌদি আরবের আধ্যাত্মিক খেজুর-কফি, মিসরের বর্ণিল ফানুস কিংবা আমাদের প্রিয় মুড়ি মাখানো সবকিছুর মূলে রয়েছে সংযম শেষে প্রাপ্তির আনন্দ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ইফতারের ধরন বদলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ এখন অনেক বেশি বাইরে ইফতার করতে পছন্দ করছে, অনেক নতুন নতুন পদের সংযোজন ঘটছে। কিন্তু সেই ইফতারের আগে সবার হাত তুলে প্রার্থনা করা এবং আজানের সঙ্গে সঙ্গে প্রথম ঢোক পানি পানের যে তৃপ্তি, তা কয়েক হাজার বছর ধরে একই রকম আছে। ইফতার আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীটা কত বিশাল এবং বৈচিত্র্যময়, অথচ একটি সাধারণ বিশ্বাস আমাদের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

প্রতিটি দেশের ইফতার যেন সেই দেশের আত্মার প্রতিফলন। তুরস্কের আভিজাত্য, আরবের সারল্য, মালয়েশিয়ার রঙ আর দক্ষিণ এশিয়ার আড্ডাবাজি সব মিলিয়েই তৈরি হয় রমজানের এই অনন্য চিত্রপট। দিনের শেষে যখন সূর্যটা দিগন্তে মিলিয়ে যায়, তখন সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যে একাত্মতা অনুভব করে, সেটাই হলো ইফতারের প্রকৃত সার্থকতা। খাবার কেবল পেট ভরায় না, ইফতারের এই বৈচিত্র্যময় দস্তরখানা আমাদের মনকেও পূর্ণ করে তোলে এক অপার্থিব ভ্রাতৃত্বের শিক্ষায়।