পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের তালেবান সামরিক বাহিনীর মধ্যে চলমান লড়াই অব্যাহত আছে। গতকাল শনিবার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতের তৃতীয় দিনেও দুই দেশ সীমান্তে একে অপরের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রেখেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জরুরি আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। গত শুক্রবার পাকিস্তানের বিমান কাবুল ও কান্দাহারসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে তালেবান সামরিক স্থাপনা ও সীমান্ত চৌকিতে আঘাত হেনেছে। পাকিস্তানের দাবি, তাদের অভিযানে আফগানিস্তানে ৩৩১ তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। এদিকে, আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরে পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানের পাইলটকে জীবিত অবস্থায় আটক করা হয়েছে। গতকাল শনিবার আফগান সামরিক বাহিনী ও পুলিশ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পাইলট প্যারাসুট দিয়ে অবতরণ করেন। এর পরই তাকে আটক করা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও একই দাবি করেছে। যদিও এ বিষয়ে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি আসেনি।
গত কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিবেশী দেশটির এত গভীরে পাকিস্তান আর কখনো হামলা করেনি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছে, তালেবানরা তাদের ভূখণ্ডে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানে নানা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত। তবে তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তান তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে আফগানিস্তানকে দায়ী করছে। তারা ইসলামাবাদের হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে। লড়াই থামানোর লক্ষ্যে শুক্রবার রাত থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা গতি পেয়েছে। আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলাপ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, রাশিয়া ও চীন উভয় পক্ষকে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, পাকিস্তান এই পরিস্থিতিতে ‘আগ্রাসনকারী’ নয় বরং নিজেদের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চাপের মুখে রয়েছে। এর মধ্যেও সীমান্তে রাতভর গোলাগুলি অব্যাহত ছিল। পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, তাদের ‘গজব লিল হক’ অভিযানে তালেবানের একাধিক চৌকি ও ক্যাম্প ধ্বংস হয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করার দাবি করেছে, তবে রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে সেসব দাবি যাচাই করতে পারেনি। পাকিস্তান বলছে, তাদের ১২ জন সেনা এবং তিন শতাধিক তালেবান সদস্য নিহত হয়েছে। বিপরীতে তালেবান দাবি করেছে, তাদের ১৩ জন যোদ্ধা এবং পাকিস্তানের ৫৫ জন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে। এর বাইরে খোস্ত ও পাক্তিকায় ১৯ বেসামরিক নাগরিক নিহতেরও খবর দিয়েছে তালেবান। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেছেন, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়েছে।
এদিকে, জালালাবাদে পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের দাবি করেছে আফগানিস্তান। যুদ্ধবিমানটির পাইলটকে জীবিত আটকের কথা জানিয়েছে আফগান কর্র্তৃপক্ষ। পুলিশের মুখপাত্র তায়েব হাম্মাদ বলেন, জালালাবাদ শহরে পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। এটির পাইলটকে জীবিত আটক করা হয়েছে। পূর্ব আফগানিস্তানের সামরিক মুখপাত্র ওয়াহিদুল্লাহ মোহাম্মদী বলেন, আফগান বাহিনী পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করেছে। পাইলট এখন তাদের হেফাজতে রয়েছেন। বার্তা সংস্থা এএফপির এক সাংবাদিক বলেন, তিনি জালালাবাদের আকাশে একটি যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনেন। এর কিছুক্ষণ পরই শহরের বিমানবন্দরের দিক থেকে দুটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর পরপরই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘোষণা আসে। এ ঘটনার বিষয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বা তথ্য মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে এএফপির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।