রাজশাহী বিভাগে বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের প্রার্থী খুবই সামান্য ভোট পেয়েছেন। এখানে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২৭টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২১টি দলের ভোটের সংখ্য ৮ হাজারের নিচে। বিএনপি বা জামায়াত জোটের বাইরের দলগুলো কেউই জামানত রক্ষা করতে পারেননি। জাতীয় পার্টি প্রার্থীদের এবারের ভোটপ্রাপ্তি খুবই সামান্য।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের তথ্য মতে, এবারের সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ২১৫ প্রার্থী। ২৭টি দলের মোট প্রার্থী ছিলেন ১৯১ জন। স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন ২৪ জন। ভোটের লড়াইয়ে ২৮টি আসনে বিএনপি এবং ১১টি আসনে জামায়াতের প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
রাজশাহী বিভাগের ফলাফলে দেখা গেছে প্রথম অবস্থানে আছে বিএনপি। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জামায়াত, তৃতীয় অবস্থানে এনসিপি, চতুর্থ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, পঞ্চম অবস্থানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং ৬ষ্ঠ অবস্থানে আছে জাতীয় পার্টির ভোটের সংখ্যা। বিএনপির ৩৯ প্রার্থী মোট ভোট পেয়েছেন ৬০ লাখ ৯২ হাজার ৩১৪। জামায়াতের ৩৬ প্রার্থী পেয়েছেন ৪৪ লাখ ৫০ হাজার ৩১২ ভোট। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজশাহী বিভাগের ২টি আসনে তাদের প্রার্থী দিয়েছিল। ১১ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে এই দুই আসনে জামায়াত কোনো প্রার্থী দেয়নি। আসন দুটিতে এনসিপি ভোট পেয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৯১টি ভোট। এরমধ্যে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এনসিপি প্রার্থী এসএম সাইফ মোস্তাফিজ ১ লাখ ৩ হাজার ৮৮৪ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও নাটোর-৩ আসনে এনসিপি প্রার্থী এস এম জার্জিস কাদির হারিয়েছেন জামানত। জামায়াতের সমর্থন পেয়েও তিনি পেয়েছেন ২০ হাজার ৭০৭ ভোট। জামায়াত জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রাজশাহী বিভাগের একটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহা: আব্দুর রউফ সরকার ১ লাখ ১৬ হাজার ৮০২ ভোট পেয়েছেন। এই বিভাগে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে সব থেকে বেশি একক প্রার্থী দিয়েছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তারা ৩১টি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেয়েছে মোট ৯৫ হাজার ৯২৮ ভোট। এবারের নির্বাচনে এ অঞ্চলে তেমন ফলাফল দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে জাতীয় পার্টি। তারা রাজশাহী বিভাগে ২৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৫৫ হাজার ৫১৫। তাদের সবগুলো আসনের প্রার্থীই জামানত হারিয়েছেন।
অন্য দলগুলোর মোট ভোটের সংখ্যা ৮ হাজারের নিচে। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৬১৭। বাংলাদেশ সমাজকান্ত্রিক দল (বাসদ) ৯টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৭ হাজার ১৬২। এবি পার্টি ৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৬ হাজার ৯৯৩, বাংলাদেশ কংগ্রেস একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৫৭৯, গণফোরানের তিনজন প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৮০৪। নাগরিক ঐক্য ৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৪ হাজার ৪৮১, বাংলাদেশ সমাজত্রান্ত্রিক দল (জেএসডি) ৩টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ১ হাজার ৮০৩, বাংলাদশে মুসলিম লীগ একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৫৩৬ ভোট পেয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ১ হাজার ৫৭৯, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৫৫৭, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবি ৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৭ হাজার ৭১৩টি, গণঅধিকার পরিষদের ৮ প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৪ হাজার ১৪৮। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফ্রন্ট একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ১৯৫। বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির একজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছেন ৫৫১ ভোট। লেবার পার্টি একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৩৮৭, আম জনতার দল দুটি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেয়েছে ৯৪৮ ভোট, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি দুটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ২ হাজার ৩৫৮, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ২৯৬ ভোট, গণসংহতি আন্দোলন ২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৭৪৫ ভোট এবং জনতার দল একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেয়েছে ১৮১ ভোট। এরই মধ্যে ফল বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করেছে দলগুলো। দল গোছানোর কাজও শুরু করেছে কোনো কোনো দল।
এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাজশাহী জেলা সভাপতি মুফতি মুরশিদ আলম ফারুকী বলেন, আমাদের দল আসলে ছোট না। এ পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে কোনো দল থেকে ইসলামী আন্দোলন খুব পিছিয়ে নেই কারণ দলটি এককভাবে ২৫৭ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। আমরা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি এবং ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড এবং ইউনিয়ন টু ইউনিয়ন কর্মীদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে দল কীভাবে গোছানো যায় সেই চেষ্টা করছি।
নাগরিক ঐক্য রাজশাহী মহানগরের আহ্বায়ক ডা. সামছুল আলম বলেন, আমরা যারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে আছি এসবে যারা নেতৃত্বে আছেন তারা তৃণমূল লেভেলে কোনো নজর দেননি। ফলে জনগণের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি। কম ভোট পেয়েছি।
এনসিপি রাজশাহী মহানগরের সাবেক আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলী বলেন, জনগণ তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন অনুযায়ী দুটি বড় দলকে পাওয়ারে দেখতে চেয়েছে। ফলে ইনডিভিজুয়াল যারা এখানে নির্বাচনে আসছেন তারা আসলে ভালো করতে পারেননি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারা ছোট দলগুলোর ফল বিপর্যয়ের একটি কারণ। এছাড়া এবারের নির্বাচনে ক্ষমতায় কারা আসতে পারে এমন ভাবনা মাথায় রেখে অনেকেই ভোট দেওয়ার কারণে বিএনপি এবং জামায়াতের ভোটের পাল্লা ভারী হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাসুদুল হাসান খান মুক্তা বলেন, মূল কথা হলো এই দেশে যদি কেউ রাজনীতি করতে চান তাহলে তাদের এই দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করতে হবে। যদি দেশের কল্যাণে দেশের জনমানুষের কল্যাণে কাজ না করে কেউ বা কোনো দল বা গোষ্ঠী যদি নিজেদের কল্যাণে কাজ করার চিন্তা করেন তাহলে তারা এরকম ভাবে হারিয়ে যাবেন রাজনীতি থেকে।