পেকুয়ায় লবণ পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ সড়ক

কক্সবাজারের পেকুয়ায় লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত পিচঢালা সড়কগুলো লবণবাহী ট্রাক থেকে পড়া নোনা পানিতে ক্ষতির মুখে পড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের সাদা সোনা খ্যাত লবণ এই অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও পরিবহনের চরম অব্যবস্থাপনায় ধ্বংস হচ্ছে শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ট্রিপলবিহীন কিংবা নামমাত্র পাতলা পলিথিন দিয়ে লবণ পরিবহনের ফলে সড়কের ওপর দিয়ে অবিরত পড়ছে তীব্র ক্ষারীয় পানি, যা বিটুমিনকে গলিয়ে রাস্তার পিচ অনেক ক্ষেত্রে পিচ্চিল হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, মাল ও যাত্রীবাহী গাড়ির স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন হচ্ছে।

পেকুয়া কুতুবদিয়া উপজেলার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম বানৌজা সাব মেরিন সড়ক। পেকুয়া বাজার ও চৌমুহনী এলাকায় যানজটে আটকে পড়লে লবণবোঝাই ট্রাক থেকে পড়া নোনা পানিতে সড়কের বিটুমিন গলে পিচ উঠে যায়। শত শত কোটি টাকায় নির্মিত সড়কটি এখনও বুঝিয়ে দেয়নি। অথচ পিচ উঠে যাচ্ছে। এছাড়া উজানটিয়া করিম দাদ মিয়ার ঘাট থেকে কাটা ফাঁড়ি সড়ক, মালেক পাড়া থেকে সোনালী বাজার সড়কের পিচও উঠে যাচ্ছে। রাজাখালী মগনামার প্রধান ও আভ্যন্তরীন সড়কগুলো লবনবাহী ট্রাক থেকে পড়া পানিতে রাস্তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

সড়কের এই ভয়াবহ দশা নিয়ে কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও এর কোনো প্রতিকারের ব্যবস্তা নিতে দেখা যায়নি।

ছবি: প্রতিনিধি

এ বিষয়ে কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন বলেন,  আমরা বিষয়টি জেলা প্রশাসকে (ডিসি) জানিয়েছি। এরপর ডিসি সাহেব পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে লবণ ব্যবসায়ীরা এই নির্দেশনা তোয়াক্কাই করছেন না।

তিনি বলেন, আসলে আমাদের তো নিজস্ব কোনো ম্যাজিস্ট্রেট নেই যে সরাসরি অভিযান চালাব। আমি আবারও ডিসি সাহেব ও পেকুয়া ইউএনওর সঙ্গে কথা বলব। এভাবে চলতে থাকলে রাস্তার মারাত্মক ক্ষতি হবে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মগনামা ও রাজাখালী মাঠ থেকে লবণ তুলে রাস্তার পাশেই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। এসব স্তূপ ঢাকা দেওয়ার জন্য লোকদেখানো পাতলা পলিথিন ব্যবহার করা হলেও লবণের বড় একটি অংশ রাস্তার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকছে। মূলত এসব পয়েন্ট থেকেই ছোট ডাম্পারে লবণ তুলে বড় ট্রাকের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র লক্ষ্য করা গেছে বানৌজা সাবমেরিন সড়কের মগনামা অংশে। মগনামার বিভিন্ন পয়েন্টে বড় ট্রাকগুলো দাঁড়িয়ে থাকে এবং সেখানেই ছোট ডাম্পার থেকে লবণ ট্রাকে তোলা হয়। এই লোডিং প্রক্রিয়ায় মানসম্মত কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। লবণ থেকে পড়া পানি আর ছড়িয়ে পড়া লবণে পুরো সড়ক একাকার হয়ে আছে। একই চিত্র দেখা গেছে রাজখালী সড়কেও। সেখানে বড় ট্রাক ঢোকার সুযোগ থাকায় রাস্তার ওপরই সরাসরি দীর্ঘ সময় ধরে লোডিং চলে। পাতলা পলিথিনের আস্তরণ ভেদ করে লোনা পানি সরাসরি পিচঢালা পথে মিশে যাচ্ছে।

মগনামা থেকে লবণ বোঝাই করার পর ট্রাকগুলো যখন বরইতলী রাস্তার মাথা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এবং মগনামা থেকে বাঁশখালী সড়ক দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় তখন বিপদ আরও ঘনীভূত হয়। লবণ সঠিকভাবে পানি নিরোধক ট্রিপল বা মোটা পলিথিন দিয়ে ঢাকা না থাকায় চলন্ত ট্রাক থেকে অনবরত লোনা পানি চুইয়ে সড়কে পড়তে থাকে।

এই লবণ পানি পিচঢালা সড়কের বিটুমিন স্তরকে যেমন আলগা করে দিচ্ছে তেমনি পুরো রাস্তা জুড়ে একটি অদৃশ্য পিচ্ছিল আস্তরণ তৈরি করছে। এর ফলে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী অন্যান্য যানবাহনের চাকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও ছোট গাড়িগুলো ব্রেক করলেই  উল্টে যাচ্ছে।

পকুয়া বাজারের ব্যবসায়ী রিয়াজুদ্দিন বলেন, মগনামা থেকে বাঁশখালী ও বরইতলী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত এই দীর্ঘ জনপথ এখন লবণের লোনা পানির কারণে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজারের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাহাত আলম জানান, লবন পানি বিটুমিনের আঠালোভাব দ্রুত নষ্ট করে ফেলে। ফলে পাথরগুলো আলদা হয়ে যায় এবং ভারী যানবাহনের চাপে রাস্তা দ্রুত ভেঙে পড়ে।  হালকা কুয়াশায় মাটি বালি এই লবন পানিতে মিশে রাস্তা সাবানের মতো পিচ্ছিল হয়ে যায়, যার ফলে মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহনগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ছে।

ছবি: প্রতিনিধি

তিনি জানান, লবন চাষীদের নিজস্ব অনেক খালি জায়গা রয়েছে। তারা ইচ্ছা করলে সেইসব খালি জায়গায় লোড আনলোড করতে পারে।

গত এক সপ্তাহে পেকুয়ার গোঁয়াখালী, রাজাখালী ও মগনামা সড়কে অন্তত ডজনখানেক ছোট-বড় দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

স্থানীয়রা জানায়, লবণশিল্প এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ হলেও সড়ক অবকাঠামো রক্ষা করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে তা বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হবে। তদারকি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করছে সচেতন মহল।

এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। সরকারি সম্পদের ক্ষতি করে ব্যবসা করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। আমরা দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা ও জরিমানা নিশ্চিত করব।