ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল আচরণ জরুরি

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে ইসলামবিষয়ক লেখালেখি যে কয়জন আলেম লেখকের মাধ্যমে ব্যাপকতা লাভ করেছে মুফতি এনায়েতুল্লাহ তাদের অন্যতম। দুই যুগের বেশি সময় ধরে তিনি জাতীয় দৈনিকগুলোতে ইসলাম বিষয়ে লেখালেখি করছেন। বর্তমানে তিনি বার্তা২৪.কম-এর যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরামের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মুফতি এনায়েতুল্লাহ রমজান মাসের তাৎপর্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারসহ সমসাময়িক বিষয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহসান সিরাজ

দেশ রূপান্তর : পবিত্র রমজানে ঝগড়া-ফ্যাসাদ থেকে বিরত থাকার যে নির্দেশনা রয়েছে, তা আমাদের সামাজিক আচরণে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : ইসলাম যে বিষয়গুলো খুব অপছন্দ করে তার একটি হলো ঝগড়া-ফ্যাসাদ। নবী কারিম (সা.) ঝগড়াটেদের সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহর কাছে সেই লোক সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত, যে অতি ঝগড়াটে। সুতরাং রোজাদারকে সর্বাবস্থায় সবধরনের ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে যেতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন রোজা পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। কেউ যদি তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার।’ (বুখারি)

দুঃখজনক হলেও সত্য, রোজাদারের জন্য দেওয়া ইসলামের নির্দেশনার প্রভাব সমাজে খুব একটা দেখা যায় না। রমজানে প্রায়ই দেখা যায়, মানুষ ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝগড়া ও হাতাহাতিতে লিপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে রোজার সময় ক্ষুধার প্রভাবে দিনের শেষ বেলা মানুষের মেজাজ একটু খিটখিটে থাকে। ওই অবস্থায় মানুষ রিকশাওয়ালা, বাস কন্ডাক্টর, ক্ষুদ্র দোকানি, গৃহকর্মী ও ড্রাইভার-দারোয়ান থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এবং অধস্তনদের প্রতি খারাপ ব্যবহার করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রোজা রেখে ঝগড়া থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা এবং সহনশীল আচরণ করা ইমানের দাবি।

দেশ রূপান্তর : ভিন্নমত হলেই ব্যক্তিগত আক্রমণে নেমে পড়া, এই মানসিকতার পেছনে আপনি কী কারণ দেখেন?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : এটা অত্যন্ত দুঃখজনক আচরণ। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থায় ভিন্ন মত প্রকাশের সুযোগ যতটা রয়েছে, তা সুখকর নয়। রাজনৈতিক মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নিজ মতের বিরোধী হলে আক্রমণের শিকার হতে হয়, তা দিন দিন বাড়ছে। আর এটা হচ্ছে, পড়াশোনার অভাব ও সহনশীনলতার ঘাটতি থেকে। একদিকে আমরা দাবি করছি, এখনকার তরুণরা আগের চেয়ে সচেতন, বেশি শিক্ষিত। কিন্তু সামান্য মতের অমিল হলেই দেখছি ঝগড়া, গালিগালাজ, চরিত্র হনন, এমনকি ঘটনা সহিংসতা পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। ঠুনকো বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে চরিত্রহনন চলে, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো।

দেখুন, ইমান-ইসলামের বাইরে দেশ-দুনিয়া, রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ ও সমর্থন ইত্যাদির বাইরে আমি আপনার মতের সঙ্গে দ্বিমত হতে পারি, আপনার বিশ্বাসকে ভুলও মনে করতে পারি, কিন্তু এজন্য আপনাকে অপমান ও সহিংসতার লক্ষ্য বানানোর অধিকার আমার নেই। আপনি ভিন্ন দলের, অন্য চিন্তার, তবু আপনি একজন মানুষ, এ স্বীকৃতি থেকেই সহনশীলতা শুরু। এটা যখনই নষ্ট হবে, সমাজ ভেঙে পড়বে। আমি মনে করি, রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক হবে, সেটা যেন শত্রুতা সৃষ্টি না করে, নিজের মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলবে, কিন্তু সেটা কাউকে পদদলিত করে নয়। একটি দেশে বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন শ্রেণি ও মতাদর্শের মানুষ একসঙ্গে থাকবেন, এটাই বাস্তবতা। ভিন্নমত মানেই শত্রুতা, এমন মনোভাব ক্ষতিকর। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল মনোভাব পোষণ করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : ইসলামকে বিষয় নির্ধারণ করে মিডিয়ায় কাজ করতে গেলে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কী?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : অনেক বড় প্রশ্ন। সংক্ষেপে যদি এটা নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে আমি বলব, মিডিয়াকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বর্তমানে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে টিভি দেখে না, খবর শোনে না, খবরের কাগজ পড়ে না এবং অনলাইনে ঢুঁ মারে না। বলতে গেলে মিডিয়া এখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ইন্টারনেটের কারণে। এমতাবস্থায় ইসলামের বার্তা ও আদর্শের কথা মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে। অনেক কিছুর ভিড়ে ইসলাম যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আশার কথা হলো, যুগের এ প্রয়োজনকে সামনে রেখে মিডিয়ার সব মাধ্যমেই ইসলামি কন্টেন্ট, আলোচনা, লেখা থাকছে। ইসলামি লেখার প্রচুর পাঠক, এটা বিবেচনায় প্রায় পত্রিকায় ইসলাম আয়োজন আছে। এসব আয়োজনে নেতিবাচক বিষয় ও অযথা বিতর্ক সৃষ্টির পরিস্থিতি এড়িয়ে সত্য-সুন্দর, ইতিবাচক কথাগুলো প্রচার করতে হবে। মানুষ যেন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়, ভালো কাজে উৎসাহ পায়, ইবাদত-বন্দেগিতে আগ্রহী হয়, সেগুলো উপস্থাপন করতে হবে। সেভাবেই ইসলামি কন্টেন্ট সাজানো, ইসলামি লেখা উপস্থাপন বেশি জরুরি।

দেশ রূপান্তর : মতপার্থক্যকে শত্রুতায় রূপ দেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে কী ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : প্রথমে মতপার্থক্য বিষয়ে একটি কথা বলে নেওয়া দরকার। আমরা এখানে মতপার্থক্য বলতে রাজনৈতিক বিষয়ের ভিন্নতাকে ধরছি। ইসলামের মৌলিক আকিদা ও অকাট্য বিষয়ে মতভেদের কোনো সুযোগ নেই। হ্যাঁ, দ্বীনের শাখাগত বিষয়ে দলিলভিত্তিক মতভেদ হতে পারে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শ নিয়ে মতভেদ হতে পারে।

ইসলাম পারস্পারিক ঐকমত্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। আল্লাহ নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য গঠনে বিবাদ ও মতভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আপস-মীমাংসার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আশা করা যায়, তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।’ (সুরা হুজরাত ১০)

দেশ রূপান্তর : মানুষ কেন খুব দ্রুত নেতিবাচক ও উত্তেজনাকর তথ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় বলে আপনি মনে করেন?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : কৌতূহল, ভয়, উদ্বেগ ও প্রত্যাশা থেকে মানুষ নেতিবাচক, মুখরোচক ও উত্তেজনাকর জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এটা মানুষের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের অংশ। একে দমন নয়, বরং বোঝা ও সঠিকভাবে পরিচালনা করাই সভ্য সমাজের চ্যালেঞ্জ। কারণ, কৌতূহলই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর সেই কৌতূহলেরই এক অবিচ্ছেদ্য রূপ হলো নেতিবাচক বিষয়ের প্রতি অনিবার্য টান। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হলো, বিষয়টি কেন নেতিবাচক, তার যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দেওয়া। বিকল্প পথ দেখানো। স্বচ্ছতা ও খোলামেলা আলোচনা করা। কোনো বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলে সেটি আর রহস্যময় থাকে না। আর রহস্য যত কমে, আকর্ষণও তত কমে।

দেশ রূপান্তর : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামি ব্যক্তিত্বদের পারস্পরিক বিতর্ক কি সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ইসলামি ব্যক্তিত্বদের অনাকাক্সিক্ষত কিছু বিতর্ক সমাজে শুধু নেতিবাচক প্রভাবই ফেলছে না, বরং এটা সমাজকে বিভিন্নভাবে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। এক পক্ষের অনুসারীরা ভিন্ন মতাবলম্বীদের গালাগালি করছে, মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে, এগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ইসলাম মানুষের মর্যাদার গুরুত্ব দেয়। কিন্তু ধর্মীয় নেতাদের পারস্পরিক বির্তকের মাধ্যমে মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে, নানা ক্ষতি হচ্ছে। হাদিসে আছে, মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি, তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি। অহেতুক বিতর্কের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, লজ্জিত করা, ছিদ্রান্বেষণ, উপহাস, তুচ্ছ জ্ঞান করা, মন্দ অনুমান ইত্যাদির মাধ্যমে তার ক্ষতিসাধন হয়। এর কোনোটাই ইসলাম সমর্থন করে না।

দেশ রূপান্তর : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে ‘বাতিল’ বা ‘গোমরাহ’ বলে ট্যাগ দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা কি উম্মাহর মধ্যে অনৈক্য ও ঘৃণা বাড়াচ্ছে?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : কারও প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ থাকায় শুধুমাত্র তাকে ঘায়েল করতে বাতিল বা গোমরাহ বলে ফতোয়া দেওয়া উচিত নয়। এটি একটি গুরুতর বিষয়, যা কেবল সুনির্দিষ্ট দলিলের ভিত্তিতে যোগ্য ওলামায়ে কেরাম বলতে পারেন। যেখানে হক-বাতিল নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে সেখানেই হক নিরূপণের জন্য শরিয়তের মানদণ্ড ব্যবহার করতে হবে। এর বাইরে কোনো কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। এর মাধ্যমে অনৈক্য বাড়ছে, এ পথ পরিহার করতে হবে। ধর্মীয় নেতাদের উচিত, নিজে সতর্ক থাকার পাশাপাশি তার অনুসারীদের এ বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করা।

দেশ রূপান্তর : সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংশোধনের জন্য আপনার প্রত্যাশা কী?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংশোধনের জন্য সর্বাগ্রে দরকার নৈতিক শিক্ষার বিস্তার ঘটানো। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের দায়িত্বশীলদের ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি করা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। পরকালের বিশ্বাস ও জবাবদিহির কথা মানুষের মনে জাগ্রত করার ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তন আসবে ইনশাআল্লাহ।