বেসরকারি বিনিয়োগ মন্দা

টানা কয়েক বছর ধরে কমেছে বেসরকারি বিনিয়োগ। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে যেখানে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল সাড়ে ২৪ শতাংশ, বর্তমান তা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে সার্বিক বিনিয়োগ ৩২ শতাংশ থেকে সাড়ে ২৮ শতাংশে নেমেছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে এই চিত্র উঠে আসে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চকর, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ নিয়ে উদ্বেগ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এছাড়া সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দীর্ঘ মেয়াদে রাখার কারণে বেশি পলিসি রেট ও ঋণের ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ সুদের হারের কারণেও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায় খরচ কমানো, চাঁদাবাজি বন্ধ করাসহ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেয়নি সরকার।

বিবিএস-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বিনিয়োগ নিয়ে বড় অগ্রগতি ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাজধানীতে বিনিয়োগ সম্মেলন করে। সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা দেওয়া হয়। কিন্তু বিনিয়োগ পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে গণআন্দোলনের সময় ব্লকেড, কারফিউ এসব কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক কর্মকা- প্রায় থমকে যায়। বিনিয়োগ করার মতো পরিস্থিতিও ছিল না। এর প্রভাব পড়ে ওই অর্থবছরে। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। করোনাভাইরাসের প্রথম বছর ২০১৯-২০ অর্থবছরেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

বিবিএস প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সাড়ে ২৪ শতাংশ ছিল। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই হার ২২ শতাংশ। একইভাবে সার্বিক বিনিয়োগ ৩২ শতাংশ থেকে সাড়ে ২৮ শতাংশে নেমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিনিয়োগের সঙ্গে জিডিপির তুলনায় সঞ্চয়ও কমেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে বিনিয়োগ হয়েছে ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ, দেশজ সঞ্চয় ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ; যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যথাক্রমে ছিল ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ, ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ২৮ দশমিক ১ শতাংশ।

বিবিএস জানিয়েছে, গত অর্থবছরে জিডিপির আকার চলতি মূল্যে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। আর বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

বিনিয়োগ কমার কারণ হিসেবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্বস্তি ছিল। তাই তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হননি। এছাড়া সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দীর্ঘ মেয়াদে রাখার কারণে পলিসি রেট বেশি ছিল। এতে মূল্যস্ফীতি কমলেও অন্যদিকে মূল্য দিতে হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায় খরচ কমানো, চাঁদাবাজি বন্ধ করাসহ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক। এসব কিছুর কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ আসেনি।