ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার বাস্তবতার নিরিখে প্রত্যাশা নির্ধারণের কথা বলে গেলেন আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে। এর ঘন্টাখানেক বাদে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়াল বললেন, দলের ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখার কথা। নারী এশিয়ান কাপে আজ অভিষেক হবে বাংলাদেশের। দলকে অনুপ্রেরণা দিতে ব্যক্তিগত খরচে স্বপরিবারে সিডনিতে হাজির তাবিথ। ৯ মার্চ গ্রুপের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত দলের সঙ্গী হয়ে থাকবেন। বাফুফের নির্বাহী কমিটির আর কেউ এখনো পৌঁছাননি সিডনিতে। আজ ম্যাচের আগে হয়েতো দু'একজন আসবেন। তবে তাবিথ দেরী করেননি। আগেই এসে উপস্থিত হয়েছেন, দেখা করেছেন মেয়েদের সঙ্গে, সাহস জুগিয়েছেন। সোমবার দুপুরে খাবার টেবিলে নির্ভার থেকে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। এরপর উপস্থিত ক্রীড়া সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আফঈদা খন্দকারদের ওপর শতভাগ আস্থার কথা। অগাধ বিশ্বাস আছে বলেই এত দূরে চলে আসা এবং এতটা সময় দলকে উজ্জীবিত করতে থেকে যাওয়া।
তাবিথের প্রত্যাশা ছিল বাফুফের অনেকেই এখানে এসে মেয়েদের সাহস দেবেন। সেটা হয়নি বলে একটু হতাশ, তবে অন্যের অপেক্ষা না করে নিজের দায়িত্বটা ঠিকই পালন করছেন তাবিথ। থাকছেন ভিন্ন হোটেলে। পড়ে থাকছে টিম হোটেলে। তাই তো দেশে ভীষণ ব্যস্ত তাবিথ সিডনির পুরো সময় বরাদ্দ রেখেছেন দলের জন্য। বাফুফের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই্ মেয়েরাই যে তাকে বারবার চওড়া হাসি উপহার দিয়েছেন। তাদের কারণেই সভাপতির আসনে তিনি এখনো সফল। তাই ইতিহাসের সন্ধীক্ষণে তাবিথ দেশে বসে থাকতে চাননি। একটু অনুপ্রেরণায় মেয়েরা ভালো ফুটবল উপহার দেয়, সেটাই যে পরম আরাধ্য।
না, বাস্তবতা বিবর্জিত কোন প্রত্যাশা করেননি তাবিথ। তবে বিশ্বাসটা রেখেছেন শতভাগ, 'আগামীকাল (আজ) নারী দল চীনের বিপক্ষে মাঠে নামবে। তবে আগেই আমরা ইতিহাস রচনা করছি। আশা করি আগামীকাল আরেকটা ইতিহাস আমরা সৃষ্টি করতে পারব। তারা প্রথমে র্যাংকিংয়ে অনেক উন্নতি করেছে। এখন এশিয়ার সেরা দলগুলোর সঙ্গে খেলছে। চীন কেবল এশিয়া নয়, বিশ্ব ফুটবলেও বড় নাম। তবে আমার বিশ্বাস, চীনের সঙ্গে আমরা ভালো খেলবো। আর ভালো খেললে ফল যে কারো পক্ষে যেতে পারে।' চীন, উত্তর কোরিয়ার কাছে বিপর্যয়ের শিকার হওয়ার সমূহ সম্ভাবণা থাকা সত্যেও হাল ছাড়ছেন না তাবিথ। বরং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে মেয়েদের আরও চাঙ্গা করতে বললেন এই কথাটা- 'আমি একজন ফুটবল ভক্ত বলেই বাংলাদেশ থেকে ছুটে এসেছি সিডনিতে, তাদের খেলা দেখার জন্য। যদি দলের প্রতি আমার আস্থা-বিশ্বাস না থাকতো তাহলে আমি, যারা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে এসেছেন এবং দর্শক যারা খেলা দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের কিন্তু খুঁজে পাওয়া যেতো না। হার জিত তো থাকবেই আমি চাই যাতে মেয়েরা হৃদয় জিতে নেয় এবং অবশ্যই কোন খেলোয়াড় যদি বড় কোন ক্লাবের কন্ট্রাক্ট পায় সেদিকে যাতে আমাদের দৃষ্টি থাকে।'
এশিয়ান কাপের মর্যাদার মঞ্চে খেলা মানে আর পেছন ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। সভাপতি হিসেবে মেয়েদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিতে না পারার দায় নিয়ে তাবিথ এটাও বলেছেন একার পক্ষে সফলতার চূড়া ছোঁয়া সম্ভব নয়, এর জন্য চাই সামগ্রিক পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা। মেয়েরা তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখলে একদিন এই আক্ষেপটুকু ঘুঁচে যাবে বলেই বিশ্বাস তার, 'মেয়েরা বিশ্বাস করে, ইতিমধ্যে যতটুকু পথ পেরিয়েছি, এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ওরা বিশ্বাস করে ওরা সামনে আরো এগিয়ে যেতে পারবে। এটা ঠিক প্রস্তুতিতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মত শীর্ষ দলগুলোর সঙ্গে আমরা খেলিনি। তবে সামর্থ্য যতটুকু ছিল সেটা দিয়ে চেষ্টা করেছি। দলের প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি সবাই ভীষণ ইতিবাচক।' তাবিথ এও বিশ্বাস করেন গ্রুপের শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ তৃতীয় সেরা দুই দলের একটি হয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে পারে, 'টুর্নামেন্ট শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যাবে না। তৃতীয় সেরা দল হিসেবে দুটি দল কোয়ার্টারে যাবে। আমাদের শেষ খেলা না হওয়া পর্যন্ত সবসময় একটা সুযোগ থাকবে। মেয়েরা ভালো খেললে এবং টেকনিক্যাল পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারলে নিশ্চয়ই প্রশংসা এবং পুরস্কারের ভাগীদার হবে।'
সিডনিতে এত বড় আয়োজন দেখে তাবিথের উপলব্ধি এমন- মেয়েদের যদি আরও একটু সুযোগ সুবিধা দেওয়া যায়, তবে তারা বারবার সবাইকে সম্মানিত করবে, 'দেখুন, অতীতে আমরা চাইনি বলেই এ পর্যায়ে আসতে পারিনি। এবার চেয়েছিলাম বলেই পেরেছি। আমাদের মেয়েদের উপরে বিশ্বাস রাখতে হবে এবং মেয়েদের পেছনে অবশ্যই আরও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাদের পিছনে যত আমরা সময়, অর্থ বিনিয়োগ করবো, তারাও সমপরিমান ফল দেশকে উপহার দিতে পারবে। এটাকে কেবল অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছি না। আমি মনে করি এটা এতদিনের কঠোর পরিশ্রমের ফলাফল। আর এরকম ফলাফল আমরা বারে বারে পেতে চাই।'
তাবিথের বার্তাটা পরিস্কার। নারী ফুটবল নিয়ে তার স্বপ্নটাও বড়। এবার নিজেদের প্রমাণের পালা ঋতুপর্ণাদের। জয়-পরাজয় এক পাশে রেখে তাবিথ আউয়ালের মতো সবারই হৃদয় জয় করা ফুটবল তাদের কাছে একমাত্র প্রত্যাশা।