ধসের পর ঘুরে দাঁড়াল শেয়ারবাজার

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নেতিবাচক প্রভাবে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস গত রবিবার দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। তবে এর এক দিন পর গতকাল সোমবার আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে সূচক। মূলত যুদ্ধাবস্থায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির শঙ্কা থেকে দেশে দেশে শেয়ারবাজারে প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। চলতি সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া সংঘাতের প্রভাব দেশের শেয়ারবাজারে পড়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তবে, সরকারের পক্ষ থেকে চলতি মার্চ মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হবে বলে ঘোষণার পর থেকে শেয়ারবাজারে চাঙ্গাভাব দেখা দেয়। এক দিন বড় পতনের পরই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বাজার।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের বড় উত্থানের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। গতকার ডিএসই ও সিএসইতে আগের কার্যদিবসের চেয়ে টাকার পরিমাণে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। একই সঙ্গে উভয় পুঁজিবাজারে লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম বেড়েছে।

জানা গেছে, অনেক দিন ধরে পুঁজিবাজারে লেনদেনের শুরুতে সূচকের উত্থান দেখা গেলেও লেনদেনের শেষদিকে তা পতনে রূপ নেয়। তবে গতকাল সকাল থেকেই সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় লেনদেন শুরু হয়। এরপর আর সূচক পতনমুখী হয়নি। লেনদেন শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত উভয় পুঁজিবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত ছিল।

শেয়ারবাজারে বিদ্যমান পরিস্থিতির বিষয়ে ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনো দেশের অস্থিরতা অন্য দেশে পড়তে পারে। আর সেটি যদি হয় যুদ্ধাবস্থা তাহলে তো কথাই নেই। কারণ একটি অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হলে, সেটি যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। আর যদি কোনো দেশে এর প্রভাব না পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে দেশের অর্থনীতি কোনো অর্থনীতি না। বা দেশটি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন।

তিনি বলেন, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে অস্থিরতার প্রভাব ভালোভাবে আমাদের শেয়ারবাজারে পড়বে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ আমাদের অর্থনীতি বিকাশমান অর্থনীতি। যেকোনো সমস্যা আমাদের প্রভাবিত করবে। এজন্য আমি সরকারকে সাধুবাদ জানাই, কারণ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেই সরকার চলতি মাসে তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বেড়েছে এবং বাজার চাঙ্গা হয়েছে। তবে এটাও সত্য, বিশ্বের অন্যান্য শেয়ারবাজার থেকে আমাদের শেয়ারবাজার অনেকটা ব্যতিক্রম। এখানে শুধু নেতিবাচক প্রভাব লেগেই থাকে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৭২ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৫৩৪ দশমিক ০৪ পয়েন্টে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১০ দশমিক ০৬ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯৯ দশমিক ৭১ পয়েন্টে এবং ডিএস৩০ সূচক ১৮ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৩৫ দশমিক ৮৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

ডিএসইতে ৩৯৪টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ৩৪০টি কোম্পানির, কমেছে ৪২টির এবং অপরিবর্তিত আছে ১২টির।

এদিন ডিএসইতে ৭৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৭৭৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ৭৬ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৯ হাজার ৪৯৮ দশমিক ৬১ পয়েন্টে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৪৮ দশমিক ৭৭ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৫০০ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট বেড়ে ৯২৭.২৭ পয়েন্টে এবং সিএসই ৩০ সূচক ৪১.২৩ পয়েন্ট বেড়ে ১৩ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

সিএসইতে ১৯৭টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ১৩৯টি কোম্পানির, কমেছে ৪৪টির এবং অপরিবর্তিত আছে ১৪টির।

এদিন সিএসইতে ১৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১২ কোটি ৭৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।

বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে পুঁজিবাজারে স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ কম থাকলেও ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুদ্ধাবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। সেই সময় ডলারের দাম হু হু করে বেড়েছে। যদিও ইউক্রেনের সঙ্গে আমাদের সেই অর্থে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল না।

এখন ইরানের সঙ্গে মার্কিন সংঘাতে এশিয়া জুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে তেলসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহনে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। তবে কিছুদিনের মধ্যে এ যুদ্ধ থেমে গেলে প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আর যদি দীর্ঘ মেয়াদে হয়, তবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বলছিলেন সাইফুল ইসলাম।