চেয়ার রক্ষা হলো না এমদাদ উল্লাহর

সরকার গঠনের পর থেকেই প্রশাসনকে নতুন করে সাজানো শুরু করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। মন্ত্রিপরিষদ গঠনের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের শীর্ষ পদে চলছে রদবদল। অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিতর্কিত এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এদের একজন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। গত রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনস্বার্থে তাকে চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কাজের চেয়ে চেয়ার বাঁচানোয় বেশি দৌড়ঝাঁপ, সিন্ডিকেট তৈরি করা, আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের সুবিধাজনক পদে রাখা, সংকট তৈরির চেষ্টা করে সারের দামে অস্থিরতা জিইয়ে রাখা, সার আমদানির খরচ বাড়িয়ে দেওয়া এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে রাখার দীর্ঘ অভিযোগ ছিল এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। শেষ সময়েও তিনি ২৫ বছরের পরিকল্পনা তৈরি করছিলেন শুধু চেয়ার রক্ষার জন্য।

গত রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সরকার জনস্বার্থে তাকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং ৪৫ ধারায় এই কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এই কর্মকর্তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই অধীনস্থ দপ্তরগুলো পরিচালনায় অদক্ষতা, ভুলনীতি গ্রহণ, দপ্তরগুলোয় কর্মকর্তাদের মধ্যে দলাদলি তৈরি করা, সিন্ডিকেট ভাঙার কথা দিয়ে নতুন সিন্ডিকেট তৈরি, প্রয়োজনীয় প্রকল্প বন্ধ করা, অদক্ষ কর্মকর্তাকে বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ার মতো কাজগুলো করেছেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। সাবেক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম নামমাত্র কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও সচিবের মতের বাইরে যেতেন না।

এসব কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একাধিকবার এই সচিবকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয় নিয়ে প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা ছিল। কিন্তু একাধিক উপদেষ্টার সুপারিশের কল্যাণে তাকে চেয়ার ছাড়তে হয়নি। বরং সে সময়গুলোয় আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন তিনি। এবারও নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই নানাভাবে চেষ্টা করছিলেন চেয়ার রক্ষার, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-এর ১৪ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে যোগ দেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। এর পরপরই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একটি নির্দেশনা পাঠানো হয় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের কাছে। চিঠিতে বলা হয়, কিছু কর্মচারীর প্রাধিকার-বহির্ভূত গাড়ি ব্যবহারের কারণে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অপচয়ের কারণ ঘটছে। অন্যদিকে নৈতিকতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে সমাজে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে সংস্থাগুলোর গাড়ি ব্যবহার না করতে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। কিন্তু এখান থেকেই নির্দেশনা অমান্য করা শুরু করেছিলেন সাবেক এই সচিব। সরকারের বরাদ্দ করা গাড়ি নিজে ব্যবহার না করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস প্রকল্পের একটি জিপ গাড়ি ব্যবহার শুরু করেন। ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-৩০৩৬ নম্বরের গাড়িটিতে চড়ে শেষদিনও অফিস করেছেন তিনি।

জানা যায়, তিনি সচিব হিসেবে যোগ দেওয়ার মাস-তিনেক পরই শুরু হয় বোরো মৌসুম। সে সময় সারের সরবরাহ সংকটের অভিযোগ ওঠে। সারা দেশের কৃষককে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া-নন-ইউরিয়া সার কিনতে হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

অভিযোগ রয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই সচিব গত আমন মৌসুমে ইচ্ছাকৃতভাবে সারের সরবরাহ সংকট তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। সিন্ডিকেট করে একজনকে বেশি আমদানির সুযোগ দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যাতে করে মৌসুমে সার সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়। এ ছাড়া দেরিতে সার আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামও বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রায় হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সরকার।

এ ছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের নতুন পরিচালক নিয়োগ দিয়েও বরাদ্দে ৫২৮ কোটি টাকা ব্যবহার করতে দেননি তিনি। প্রকল্পটি বন্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসা হয়েছে যেসব সরবরাহকারী অনিয়ম করেছেন তাদের বাঁচানোর জন্য। চলমান একটি প্রকল্প বন্ধ করে সেখানে পরিচালককে চাপ দিয়ে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প তৈরির জন্য চাপ দিতেন এই সচিব। একইভাবে অনিয়ম ও অদক্ষতার ব্যাপক অভিযোগ থাকার পরও তিনি যোগ দেওয়ার পর ডিএইর পার্টনার প্রকল্পের তৎকালীন প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মিজানুর রহমানকে দায়িত্বে রেখেছিলেন। পরে এই কর্মকর্তা সারা দেশের প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ডিএইতে নগদ টাকা তুলতে গিয়ে ধরা পড়ায় তাকে বরখাস্ত করা হয়। পরে সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয় সচিবের এলাকা গাজীপুরের কৃষি কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদকে। এই কর্মকর্তাও অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই অদক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, সচিবের ভুল তথ্যের কারণে চলতি মৌসুমের আগে পেঁয়াজের দাম ৭০-৮০ থেকে বেড়ে ১২০-১৩০ টাকায় উঠেছিল। কারণ তিনি পেঁয়াজের মজুদ পর্যাপ্ত থাকার কথা বলে আমদানির অনুমতি বন্ধ রেখেছিলেন। কর্মকর্তারা বলছেন, সচিব দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই চাল, গম, ভুট্টা, আলুসহ আটটি কৃষিপণ্যের প্রকৃত উৎপাদনের তথ্য প্রস্তুতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন না করে ফাইলবন্দি করে রেখেছিলেন তিনি। সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এটি বাস্তবায়ন করতে পারেননি বলে দেশ রূপান্তরকে জানান এমদাদ উল্লাহ মিয়ান।

এই পরিকল্পনার বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃষি একটা সমন্বিত বিষয়। এখন কোনো পরিকল্পনা হলে সেখানে শুধু শস্য নয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে একসঙ্গে করতে হবে। এটা আমরা বারবার বলেছি, কিন্তু সচিব এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দেননি।’

দায়িত্ব থেকে সরানোর আগে দেশ রূপান্তরকে সাবেক এই সচিব বলেছিলেন, ‘সরকার না চাইলে পুরনো পেশায় ফিরে যাব। গবেষণার কাজে আমার দক্ষতা বেশি, সেটা নিয়েই কাজ করব।’