ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং পরে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করা এবং সংগঠন বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় বিএনপির প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে দলীয় পদসহ প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এনিয়ে তিতাস উপজেলার বিএনপির অঙ্গসংগঠনে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, নব্বই দশকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের হাত ধরেই বৃহত্তর দাউদকান্দি তথা কুমিল্লা উত্তরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে দাউদকান্দি থেকে আলাদা হয়ে তিতাস উপজেলা হয়। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিতাস উপজেলা হোমনা উপজেলার সঙ্গে কুমিল্লা-২ আসনের অধীনে চলে যায়। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার চাপা দ্বন্দ্ব নির্বাচনের আগে থেকেই বিভিন্ন সভা সমাবেশের বক্তব্যে প্রকাশ পায়। সেই দ্বন্ধের রেশ ধরেই তিতাসের বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপির তৃণমূলের নেতাদের দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি বা সরাসরি বহিষ্কার করা হচ্ছে বলে একাধিক বহিষ্কৃত নেতা জানান।
গত দুই মাসে উপজেলার কড়িকান্দি সদ্য ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড সভাপতি আহসান ওরফে পাশান মোল্লা, বলরামপুর ইউনিয়নের সহ-কোষাধ্যক্ষ আলী আকবরসহ নারান্দিয়া ইউনিয়নে তিনজন, মজিদপুর ইউনিয়নে চারজন, ভিটিকান্দি ইউনিয়নে চারজনসহ গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তিতাস উপজেলায় বিএনপির অন্তত ৩৫-৫০ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।
বহিষ্কৃত উপজেলার কড়িকান্দি সদর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আহসান মোল্লা ওরফে পাষান মোল্লা বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট আমলে অনেক যন্ত্রণা পোহাইছি। আর এখন দলের সুদিনে তিতাসে আমাকে দিয়েই বহিষ্কার শুরু করেছে। নির্বাচনে অন্য উপজেলার লোককে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার কারণে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। বহিষ্কার করায় আমি বিচলিত না। তবে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে দলীয় গঠনতন্ত্র মানা হয়নি।
বহিস্কৃত ভিটিকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো.ফরিদ সরকার বলেন, আমাকে কোনো প্রকার নোটিশ না করে হঠাৎ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকালে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সেলিম ভূঁইয়া তার ফেসবুক আইডিতে আমাকে বহিষ্কার মর্মে দলীয় প্যাডে চিঠি দেখতে পাই। আমাকে কারন দর্শানোর নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি বহিষ্কার দলীয় গঠনতন্ত্র পরিপন্থী।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৬ বছরে হামলা-মামলার শিকার হয়েছি। পুলিশের ভয়ে ঠিক মতো নিজের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারি নাই, তার পরও দলের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি হইনি।
তিনি জানান, ১৯৯১ সাল থেকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্যারের হাত ধরে বিএনপির রাজনীতিতে আসি এবং একই বছর বৃহত্তর ভিটিকান্দি ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। পর্যায়ক্রমে যুবদলের সভাপতি এবং পরবর্তীতে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ২০২৫ সালে ইউনিয়ন কমিটি গঠনের সময় উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওসমান গনি ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সেলিম ভূঁইয়া আমাকে পুনরায় সভাপতি করতে আমার কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা নিয়েছে। টাকা নেওয়ার বিষয়টি আমি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে জানালে ওই ক্ষোভ থেকে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি বলে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং আমার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করার জন্য বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের নবনির্বাচিত এমপি অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এ বিষয়ে তিতাস উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান সেলিম বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বহিষ্কারের সংখ্যা ৩৫-৫০ জনের মতো। যারা বহিস্কার হয়েছে শুধু তারাই না, তিতাসে আমরা সবাই ড. মোশাররফ স্যারের লোক। ভিটিকান্দি ইউনিয়নের বহিস্কৃত সভাপতি ফরিদ সরকারসহ একটি চক্র দলীয় পোস্ট পদবী থাকা সত্বেও দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচন করেছে যা আমাদের কাছে প্রমাণ আছে। আর ফরিদ সরকারকে ১৭ লাখ টাকার বিনিময়ে সভাপতি বানানো হয়েছে এমন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, একবছর পর এখন বহিষ্কার হওয়ার পর এই মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার বাইরে আমরা আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আক্তারুজ্জামান বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং পরে তিতাসে উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা কর্মীদের দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার অভিযোগে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে অবগত নই।
অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া দলীয় মনোনয়ন পাওয়া এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের লোকজনদের বহিষ্কার করা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তিতাসের বিএনপির সকল নেতাকর্মী মোশাররফ স্যারের অনুসারী, সেলিম সাহেব আসছে অল্প কয়েকদিন। এখন উপজেলা এবং ইউনিয়নের নেতারা সেলিম সাহেবের সম্মতিতেই এসব (বহিষ্কার) করছে।
কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই, উপজেলা বা ইউনিয়নের নেতা যারা বহিস্কার করেছে তারা বলতে পারবে।