ঘুষ কেলেঙ্কারিতে বাতিল ৩৭৭ ইজারা

যশোর জেলা পরিষদের জমি ইজারা প্রদান ও নবায়ন ঘিরে একের পর এক ঘুষ কেলেঙ্কারির তথ্য-উপাত্ত বেরিয়ে আসছে। কর্র্তৃপক্ষ প্রথমদিকে কয়েকটি অভিযোগ তদন্ত করে কর্মচারী আলমগীর হোসেনের যোগসাজশে এমন অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলে প্রমাণ পায়। গত ২ মার্চ তার নামে যশোর কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়। আর গতকাল বুধবার ৩৭৭ জনের নামে দেওয়া ইজারাকৃত জমির বরাদ্দ বাতিলের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জেলা পরিষদ, যা স্থানীয় পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।

জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, যশোরের আট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জেলা পরিষদের খণ্ড খণ্ড জমি রয়েছে। ২০২৪ সালের আগপর্যন্ত কয়েক বছর ধরে ইজারা প্রদান বন্ধ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই জমিগুলো নবায়নের নামে জালিয়াতি করা হয়।

একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ইশারায় উচ্চমান সহকারী আলমগীর হোসেন নির্ধারিত ফির বাইরে মোটা অঙ্কের ঘুষ না নিয়ে কিছু কিছু আবেদনের বিপরীতে ইজারা দিয়েছেন। অনেক আবেদনের ফাইল অনুমোদন, চুক্তিপত্র, ডিসিআর রসিদ জালিয়াতি করা হয়েছে। কিছু আবেদনই করা হয়নি। কিন্তু ডিসিআরের রসিদ বইয়ে টাকা নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। আবার সেই টাকা সরকারের রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার তথ্য মিলছে না। গত বছর ২৬ অক্টোবর যশোরে দুদকের গণশুনানিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। ৫ নভেম্বর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত শুরু করে জেলা পরিষদ।

৫০ বছরের ইজারা, নবায়নে ২ লাখ টাকার দাবি : শার্শা উপজেলার বাঘাছড়া রাজাদের কাছাড়া পটিতে অবস্থিত একটি দোকানঘর প্রায় ৫০ বছর আগে জেলা পরিষদ থেকে ইজারা নেওয়া হয়। ভুক্তভোগী আবদুল গফুর জানান, ২০১৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত নবায়ন করলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ আছে, ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিল সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে ৭ হাজার টাকা ঘুষ নেন। পরে ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪-এ পুনরায় আবেদন করলে অফিসে ডেকে ৩৪ হাজার টাকার ডিসিআর প্রস্তুত করা হয়। তবে রসিদ দিতে ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় আরেক জনের নামে একই দোকানঘর ২ লাখ টাকার বিনিময়ে ইজারা দেওয়া হয়।

৭ শতকের বদলে ৩ শতক, তাও কৃষিজমি : শার্শা থানার রাড়ীপুকুরিয়া মৌজার এসএ ১৪১৩ নম্বর দাগের ৭ শতক সরকারি জমি ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী আবদুল গফুরের দাবি, প্রথমে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। দরকষাকষির পর ৩০ হাজার টাকা প্রদান করা হলেও ৭ শতকের বদলে মাত্র ৩ শতক কৃষিজমি হিসেবে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। অভিযোগকারী আবদুল গফুর বলেন, জমিতে তার অস্থায়ী বসতবাড়ি থাকলেও কৃষিজমি হিসেবে বন্দোবস্ত দেওয়ায় ভবিষ্যতে উচ্ছেদের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

৪ লাখ টাকার দাবি, না দিলে অন্যের নামে ডিসিআর : একই জমি ডিসিআর করে দেওয়ার নাম করে ৪ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী ১ লাখ টাকা দিতে রাজি হলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরে অধিক টাকার বিনিময়ে অন্য ব্যক্তির নামে ডিসিআর প্রদান করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমিতেও ‘লেনদেন’ : চৌগাছা উপজেলায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্দেশ্যে জমি লিজের আবেদন করা হলে প্রথমে ১ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ৫৫ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। বিকাশে ৫ হাজার ও নগদে ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও এখনো ইজারা প্রদান করা হয়নি বলে অভিযোগ।

কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও অবস্থান : জমি লিজ ও নবায়ন নিয়ে পদে পদে জালিয়াতি করা হয়েছে। এ কারণে জমি লিজ ও নবায়ন করা সব (৩৭৭টি) বাতিল করা হয়েছে। জেলা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল ৪ মার্চ স্থানীয় পত্রিকায় লিজ বাতিলের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) এসএম শাহীন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জেলা পরিষদের মালিকানাধীন বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় উচ্চমান সহকারী (সাময়িক বরখাস্তকৃত) আলমগীর হোসেন কর্র্তৃক যেসব জমি ইজারা ও নবায়ন করা হয়েছে, তা অনিবার্য কারণবশত বাতিল করা হলো।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আলমগীর হোসেন অবৈধভাবে অজ্ঞাতনামা প্রিন্টিং প্রেস থেকে নকল বিবিধ আসায় রসিদ (ডিসিআর) বই ছাপিয়ে এখনো অবৈধভাবে ইজারা নবায়ন করে যাচ্ছে, যা প্রতারণার শামিল ও দণ্ডনীয় অপরাধ। এজন্য যশোর জেলা পরিষদ কর্র্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।