ঈদে নতুন জাল নোটের শঙ্কা

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। ঈদের কেনাকাটা ও নতুন নকশার টাকা আনন্দ-খুশিকে আরও বাড়িয়ে দেবে। এই আনন্দের সময়ে জাল নোটের শঙ্কাও বাড়বে। এবার নতুন নকশার টাকা আসছে, যা অনেকেই চিনতে পারবে না। অনেকের কাছে নতুন নকশার জাল নোট কেমন হবে, সে ধারণা নেই। জাল নোটকে নতুন টাকা বলে চালিয়ে দেওয়া হতে পারে। নতুন নকশার জাল নোট তৈরিতে নতুন নতুন কৌশলও অবলম্বন করছে কারবারিরা। জাল নোটের কারবারিদের গ্রেপ্তারে সক্রিয় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ১৫ রোজা পার হয়ে গেলেও জাল নোটের কারবারিদের গ্রেপ্তারের খবর নেই। জানা গেছে, অনলাইন নতুন নকশার জাল নোটে সক্রিয় কারবারিরা। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে জাল নোট বিক্রি করছে অসাধু কারবারিরা। এক লাখ টাকার জাল নোট মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার জাল নোট তৈরি করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল তৎপরতায় নতুন নকশার জাল নোট কারবারিদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, জাল টাকা ছাপানোর জন্য উন্নত মানের ল্যাপটপ, প্রিন্টার, হিট মেশিন, বিভিন্ন ধরনের স্ক্রিন, ডাইস, জাল টাকার নিরাপত্তা সুতা, বিভিন্ন ধরনের দামি কালি, আঠা ও স্কেল-কাটার ব্যবহার করে কারবারিরা। এ ছাড়া গ্রাফিকস কাজের জন্য ওই চক্রে রয়েছে অনেক কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। নিখুঁতভাবে টাকা ছাপতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। এরা টাকার জলছাপ থেকে শুরু করে নিরাপত্তার সবকিছুই হুবহু নকল করছে। চক্রগুলো বছরের অন্য সময় সুপ্ত থাকে। ঈদ ও পূজায় তারা জাল টাকার নোট ছাপে। টাকা ছাড়াও তারা ডলার ও রুপি জাল করছে। জাল নোট তৈরির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দেওয়া হয়। কিন্তু তারা জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের একই কাজ শুরু করে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো ধরনের উৎসব শুরুর আগে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল টাকার কারবারিরা। এ চক্রের সদস্যদের প্রায়ই গ্রেপ্তার করা হয়। তারপরও তারা জামিনে বেরিয়ে ফের একই অপকর্মে লিপ্ত হয়। এবারও ঈদ ঘিরে চক্রের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। তবে পুলিশ তাদের শনাক্ত করছে।’

শুধু ঈদ নয়, অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আগে মার্কেটে মার্কেটে জাল মুদ্রা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। উৎসবের আগমুহূর্তে জাল নোট তৈরির চক্রগুলোর মধ্যে জাল টাকা নিখুঁত করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যে চক্রের টাকা যত নিখুঁত, তার দাম তত বেশি, বিক্রিও বেশি। ১০০ পিস ১০০০ টাকার নোট অর্থাৎ এক লাখ টাকা তৈরিতে খরচ হয় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। সেই টাকা তারা পাইকারি বিক্রেতার কাছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে। পরে পাইকারি বিক্রেতা প্রথম খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়, প্রথম খুচরা বিক্রেতা দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় এবং দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতা মাঠপর্যায়ে সেই টাকা এক লাখ টাকায় বিক্রি করছে বলে জানা গেছে।

রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহরের মার্কেট, শপিং মল, ইফতারি বাজার এবং ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় লেনদেনের সময় জাল নোটের উপস্থিতি বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটে জালিয়াতির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি বলে তারা জানান। ব্যস্ত সময়ে তড়িঘড়ি লেনদেনের কারণে অনেক সময় নোট যাচাই করা সম্ভব হয় না, পরে হিসাব মেলাতে গিয়ে জাল টাকা ধরা পড়ে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এবার নতুন নকশার নোটগুলো এমনভাবে বানানো যে, চেনার উপায় নেই। এতে একদিকে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ক্রেতারাও প্রতারিত হচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে উৎসব এলেই একটি চক্র জাল নোট তৈরি করে এবং সেসব বাজারে ছড়িয়ে দেয়। এটি হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া কোনো সমস্যা নয়। চক্রগুলো মূলত প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের মাঝে জাল নোট ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ চক্রে বিভিন্ন ব্যাংকের অসৎ কর্মকর্তারাও জড়িত থাকে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাল নোটের ছড়াছড়ি : ঈদ উপলক্ষে বিশেষ অফার দিয়ে ফেসবুক, টিকটক ও ইন্সটাগ্রামসহ অনলাইনে বিভিন্নভাবে বিক্রি করা হচ্ছে জাল নোট। অগ্রিম অর্ডার নিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এজেন্টদের মাধ্যমে দেওয়া হয় হোম ডেলিভারিও।

এক লাখ টাকার জাল নোটের দাম মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা : বিভিন্ন সাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, এক লাখ টাকার জাল নোট পেতে সব মিলিয়ে খরচ করতে হচ্ছে ১০ হাজার টাকা। তবে ১০ হাজার টাকা একবারে দিতে হয় না। প্রথম ধাপে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা অগ্রিম পাঠালেই দুদিনের মধ্যে কুরিয়ারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয় লাখ টাকার জাল নোট। সেগুলো হাতে পাওয়ার পর বাকি টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।

তিন ভাগে কাজ করেন কারবারিরা : রাজধানীসহ সারা দেশে অর্ধশতাধিক গ্রুপ জাল টাকা তৈরি ও বিপণনে জড়িত। জাল টাকা তৈরি ও বিপণনের কাজে জড়িত চক্রের সদস্যরা তিন ভাগে বিভক্ত। একটি গ্রুপ অর্ডার অনুযায়ী জাল নোট তৈরি করে, অন্য গ্রুপ টাকার বান্ডিল পৌঁছে দেয়, আরেক গ্রুপ টাকা বাজারে ছড়িয়ে দেয়।

ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ঈদ বা কোনো বড় উৎসব এলেই জাল নোটের কারবারিরা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। অনলাইনেও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেয়। কিন্তু এর ৯০ শতাংশই ভুয়া।