তারপরও ঋতুদের জন্য সীমাহীন ভালোবাসা

২৮ ফেব্রুয়ারি সিডনি পা রাখার পর থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে একটা অন্যরকম প্রস্তুতি দেখা গেছে। ওমেন্স এশিয়ান কাপে প্রথমবার অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। ঋতুপর্ণা চাকমাদের সমর্থন জানানোর সব প্রস্তুতিই সেড়ে নিয়েছেন তারা। নিজ নিজ কাজ থেকে ছুটি নিয়ে কমব্যাংক স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে এসে উপস্থিত হয়েছেন অনেক বাংলাদেশী সমর্থক। ৩ মার্চ চীন ও শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে দুটি ম্যাচেই গলা ফাটিয়েছেন তারা। সামনে থেকে দলকে হারতে দেখেছেন। তারপরও নারী ফুটবলারদের প্রতি অফুরান ভালোবাসা ও সম্মান এই প্রবাসীদের। তাদের একটাই কথা, অনেক বাধা ডিঙিয়ে এসে এই সুবিধাবঞ্চিত মেয়েরা তাদের সুযোগ করে দিয়েছে দেশের পতাকা ওড়ানোর, জাতীয় সঙ্গীতের সুরে মেলানোর, সর্বপোরি বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে ভীষণ ইতিবাচক করে চেনানোর।

বিশাল অস্ট্রেলিয়া অনেকগুলো শহর। তবে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশীর বসবাস এই সিডনিতে। ক্রিকেট হোক কিংবা ফুটবল, সিডনিতে নিজ দলের খেলা দেখার সুযোগ অবশ্য একটু কমই পায় সিডনিবাসী। দেখা যায় বেশিরভাগ খেলাই পড়ে অন্য কোন শহরে। এবার নিজ আঙিনায় নারী ফুটবলারদের খেলা দেখার সুযোগটা তাই লুফে নিয়েছেন প্রবাসীরা। যা তাদের যান্ত্রিক, রুটিন জীবনের বাইরে দিয়েছে উৎসবের উপলক্ষ্য। একই সঙ্গে নিজের সন্তানদের দেশকে চেনানো-জানানোর সুযোগটাও তারা পেয়েছে এই খেলার মাধ্যমে।

সিডনির মিন্টোতে দীর্ঘদিন ধরে থাকেন মোহাম্মদ মইনুল রেজা। শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দেখতে মাঠে এসেছেন স্কুল পড়ুয়া ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। এর জন্য অনেক দিন ধরেই অপেক্ষায় ছিলেন মইনুল, 'যখন এশিয়ান কাপে মেয়েরা কোয়ালিফাই করলো, জানতে পারলাম দুটি ম্যাচ সিডনিতে হবে- তখন থেকেই আমরা অপেক্ষায় ছিলাম। চীনের বিপক্ষে বাংলাদেশ নিজেদের প্রমাণ করেছে। আজ হয়তো অতটা ভালো হয়নি। তবে এই মেয়েদের এখানে খেলতে দেখে গর্বে বুকটা ভরে উঠেছে।'
সিডনিতে আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তালাত মঙ্গলবার চীনের বিপক্ষে এসেছিলেন স্ত্রী ও দুই কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে। ব্যস্ততা মধ্যেও এই দুটি দিন বরাদ্দ রেখেছেন শুধুই মেয়েদের জন্য গলা ফাটানোর জন্য, 'চীনের বিপক্ষে ওরা অসম্ভব ভালো ফুটবল খেলেছে। যেটা অপ্রত্যাশিত ছিল। যদি আরও বেশি গোলেও হারতো তারপরও আমরা কষ্ট পেতাম না। কারণ এই মেয়েরা যে এ পর্যায়ে খেলার যোগ্যতা অর্জণ করতে পেরেছে, এটাই সবচেয়ে আনন্দের।' প্রবাসীদের মাঝে সন্তানদের সঙ্গী করে মাঠে আসার প্রবণতা দেখা গেছে বেশ। এর ব্যাখ্যায় তালাত বলেন, 'আমাদের সন্তানরাও বাংলাদেশের এই মেয়েদের নিয়ে ভীষণ গর্বিত। তারা ওদের খেলার দারুণভাবে উপভোগ করছে। আসলে আমাদের সন্তানরা জন্মসূত্রে অস্ট্রেলিয়ান হলেও ওরা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক, খাবারের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই অভ্যস্ত।

রাও জানে ওদের শিকড় বাংলাদেশে। তাই নিজের দেশের দল বলেই তারা ঋতুপর্ণাদের নিয়ে এতটা উত্তেজিত। আমার মেয়েটা স্কুল আছে বলে আসতে পারেনি আজ (দ্বিতীয় ম্যাচে)। তবে আমাকে বলেছে, যেন তাকে ম্যাচে ওর দলের মেয়েরা কেমন খেলেছে তার জানাতে। এই খেলার মধ্য দিয়ে দেশের সঙ্গে আমাদের সন্তানদের একটা আত্মিক যোগাযোগ তৈরী হয়েছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আসেফ আলী বলেন, 'সবচেয়ে ভালো লাগছে এই দেখে যে এখানে এত মানুষজন এসছে। ইটস আ গুড গ্যাদারিং। দলের প্রতি সবসময় সমর্থন থাকবে আমাদের। হারলেও-জিতলেও। আমরা এখানে এসেছি সাপোর্ট করার জন্যই।' 

দীর্ঘদিন আগে দেশ ছাড়লেও দেশের মানুষের মতো আবেগটা আছে আগের মতোই। সে কথাই জানালেন সিডনির একটি বহুজাতিক ফ্যাশন হাউজে কর্মরত শাকিলা তাম্মি তৃণা, 'এখানে আমরা শুধুই এসেছি মেয়েদের সমর্থন দিতে। আর ওরা হয়তো ম্যাচ জেতেনি। তবে আমাদের সবার হৃদয় জিতে নিয়েছে। এই মেয়েদের পেছনের গল্প কমবেশি আমরা জানি। তাই ওদের প্রতি আমাদের অনেক শ্রদ্ধা। ওরা প্রমাণ করেছে বাঙালি নারীরা কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। তাই হারজিত এক পাশে রেখে ওদের সমর্থন জানানোই মূখ্য।'

নাহার এ দিশা এসেছেন স্বামী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। শুক্রবার দুপুরের কড়া রোদকে পাত্তা না দিয়ে লাল-সবুজ জার্সি পড়ে উপস্থিত হয়েছে প্যারামাটা স্টেডিয়ামে ।তিনি বলেন, 'এটা অসাধারণ এক অনুভূতি। আমাদের দেশের মেয়েরা এরকম একটা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলছে, যে সুযোগটা সবসময় তারা পায় না। যখন সুযোগ পায়, তখন আমাদের জন্য খুবই গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে। আমরা খুবই গর্বিত যে বাংলাদেশি মেয়েরা এরকম একটা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে খেলছে এবং ওদের কারণে আমরা আমাদের জাতীয় সংগীত  এখানে এই মাঠে শুনতে পাচ্ছি। যখন জাতীয় সঙ্গীত বাজছিল, তখন আবেগে অনেককেই কাঁদতে দেখেছি।' পাশে থেকে রুনা লায়লার কথা, 'বাংলাদেশের মেয়েরা অনেক এগিয়ে গেছে। একজন মেয়ে হিসেবে আমি বলব ওরা যা করতে পেরেছে, আমরা কেউ তা করতে পারিনি। আমরা অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি কিন্তু এতদূর আসতে পারিনি। ওরা যত কষ্ট করে সেই কোন গ্রাম থেকে কত প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে এসেছে। ওদের অভাব ছিল, অনেক অসুবিধা ছিল, কেউ সাপোর্ট করেনি—ফ্যামিলি না, কেউ না। তারপরও যে তারা এতদূর আসতে পেরেছে, ওরা আমাদের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সাহসী।' চিকিৎসক পেশায় জড়িত নাহিদ সিনহা বলেন, 'খুব ভালো লাগছে। আসলে এই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। বাংলাদেশের মেয়েরা যে এতটা এগিয়ে গেছে—আমরা আসলেই খুব ভাগ্যবান। বাংলাদেশ জিতুক আর হারুক, আমরা সবসময় তাদের সাথেই আছি। উই আর প্রাউড ফর বাংলাদেশ।

আইটি সেক্টরে কাজ করেন মোহাম্মদ তালহা। বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখতে এসে বলেন, 'আগে ছেলেদের খেলা তো অনেক দেখেছি, কিন্তু মেয়েদের খেলা দেখতে পারছি এটা একটা অনেক বড় ব্যাপার। ফুটবলে তো আমরা কখনোই ওই লেভেলে পৌঁছাই নাই, তো আমাদের মেয়েরা আমাদের অন্য লেভেলে নিয়ে গেছে—এশিয়ান লেভেলে। সো উই আর সো প্রাউড অফ দ্যাট। আমি মনে করি এটা ওরা একটা নতুন দিগন্তের সূচণা করেছে। রেজাল্ট একদিনে আসবে না। এটা আনতে হলে একটা প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। ওরা যে এই লেভেল পর্যন্ত আসছে এটাও আমরা অনেকে কখনো চিন্তা করিনি। ইনফ্যাক্ট আমাদের ছেলেরা কখনো এই লেভেলে যেতে পারবে কি না আমরা সেটাও জানি না।'

ঋতুরাই সিডনিতে বসবাসরত মানুষদের জন্য একটা উৎসবের উপলক্ষ্য দিয়েছিলেন।  শনিবার দল যাবে পার্থে। সেখানের বাঙালিরাও অপেক্ষায় প্রিয় ফুটবলারদের বরণ করে নিতে। সোমবার উজবেকিস্তানকে হারালে হয়তো আবারও দলকে ফিরতে হবে সিডনিতে। যেখানে তাদের আরেকবার ভালোবাসায় সিক্ত করতে প্রস্তুত হাজারো বাংলাদেশী।