পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ধসে পড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে কাতার। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’ (এফটি)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-কাবি শুক্রবার (৬ মার্চ) বলেন, ‘যদি এই যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে বিশ্বজুড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং অনেক পণ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেবে। এর ফলে কলকারখানাগুলো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পারবে না, যার একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে।’
গত শনিবার থেকে ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে গত সোমবার কাতার তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন স্থগিত করে। উল্লেখ্য, বিশ্ববাজারের মোট এলএনজি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ একা সরবরাহ করে কাতার। এশিয় ও ইউরোপীয় বাজারে জ্বালানির ভারসাম্য রক্ষায় দেশটির ভূমিকা অপরিসীম।
সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেন, ‘পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সব রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্স মেজার’ (অনিবার্য পরিস্থিতিজনিত আইনি অব্যাহতি) ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। এমনকি আজ যুদ্ধ বন্ধ হলেও কাতারকে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।’
ব্রাসেলস ইনস্টিটিউট ফর জিওপলিটিক্সের এনার্জি ফেলো থিজ ভ্যান ডি গ্রাফ আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ইরাক ইতোমধ্যে তাদের প্রধান দুটি বা তিনটি তেলক্ষেত্রের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। গ্রাফের মতে, ‘তেল উৎপাদন বা সরবরাহ বৈদ্যুতিক সুইচের মতো নয় যে চাইলেই বন্ধ করা বা চালু করা যাবে। এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
মাঠপর্যায়ে যুদ্ধের তীব্রতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইরানের ওপর ‘মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ’ নামিয়ে আনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যা স্থল অভিযানের শঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা সত্ত্বেও ইরান জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইরান অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে নিজের জাতির মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের কোনো দ্বিধা নেই।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মধ্যস্থতার যেকোনো উদ্যোগ নেওয়ার আগে যারা এই সংঘাতের সূচনা করেছে (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল), তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগরের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের যে কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তাতে গভীর উদ্বেগে রয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
সূত্র: আল-জাজিরা