যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৩৭০ কোটি ডলার

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহ পার হলেও, এর শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত। এরই মধ্যে এ যুদ্ধ ঘিরে ব্যাপক রণপ্রস্তুতির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের সপ্তম দিন গতকাল শুক্রবার এ সংঘাতে প্রথমবারের মতো বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত এ ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পেছনে আসলে কত ব্যয় হচ্ছে? পেন্টাগন এখন পর্যন্ত এ অভিযানের ব্যয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব জানায়নি। এমনকি যুদ্ধের খরচ মেটাতে কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত কোনো বিশেষ বরাদ্দের আবেদনও এখনো করেনি তারা। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এক বিশ্লেষণে এ যুদ্ধের ভয়াবহ খরচের চিত্র ফুটে উঠেছে। যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ওয়াশিংটনের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার। প্রতিদিন খরচ হচ্ছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার।

ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজ-এর ‘ন্যাশনাল প্রায়োরিটিস প্রজেক্ট’-এর পরিচালক লিন্ডসে কোশগারিয়ান বলেন, এ পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর প্রকৃত ব্যয় জানা সম্ভব নয়। তিনি এ যুদ্ধকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে আখ্যা দিয়ে জানান, এ অর্থ দিয়ে সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য অন্যান্য জনকল্যাণমূলক নীতি গ্রহণ করা সম্ভব ছিল। ইরাক যুদ্ধের উদাহরণ টেনে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরাক যুদ্ধের ব্যয় শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে ঠেকেছিল। ফলে এ যুদ্ধের খরচও খুব সহজেই আকাশচুম্বী হয়ে উঠতে পারে। তবে সিএসআইএস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ব্যয়বহুল অস্ত্রের পরিবর্তে ‘সাশ্রয়ী গোলাবারুদ’ ব্যবহার শুরু করবে এবং ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমে আসবে, তখন এ খরচ কিছুটা কমে আসবে। সিএসআইএস তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ভবিষ্যৎ ব্যয় মূলত নির্ভর করবে অভিযানের তীব্রতা এবং ইরানের পাল্টা হামলার কার্যকারিতার ওপর। সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিমান, নৌ ও স্থল অভিযানই হবে খরচের প্রধান উৎস। প্রতিদিন বিমান অভিযানে ৩০ মিলিয়ন ডলার এবং নৌ অভিযানে ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। আর স্থল অভিযান চালালে দৈনিক খরচ হতে পারে ১৬ লাখ ডলার। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে যে হামলা চালানো হয়েছিল, তার তুলনায় বর্তমান অভিযানের খরচ অনেক বেশি। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রজেক্টের গবেষণা অনুযায়ী, গত বছরের ওই হামলায় ২.০৪ থেকে ২.২৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। ওই অভিযানে প্রধান খরচের খাত ছিল ৪০টি এমওপি (৩০ হাজার পাউন্ডের বোমা), ৭টি বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান এবং ২৪টি টমাহক মিসাইল। উল্লেখ্য, গত বছরের সেই অভিযান স্থায়ী হয়েছিল মাত্র আড়াই ঘণ্টা।

এ অভিযান কতদিন চলবে তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কখনো দুই সপ্তাহ, কখনো চার বা ছয় সপ্তাহের কথা বলছে। গত বুধবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ‘আমরা শুধু যুদ্ধ শুরু করেছি।’ তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাদের অভিযানের গতি আরও বাড়াবে। পেন হোয়ার্টন বাজেট মডেলের ফ্যাকাল্টি ডিরেক্টর কেন্ট স্মেটার্স বলেন, যুদ্ধের ধরন এবং গোলাবারুদ সরবরাহের গতির ওপর ভিত্তি করে দুই মাসের এই যুদ্ধে ৪০ থেকে ৯৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। তবে তিনি একটি ভিন্ন যুক্তিও তুলে ধরেন। স্মেটার্স বলেন, আমরা যে বিনিয়োগের কথা বলছি, তা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা ব্যবহারের ফলে হতে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় নগণ্য। তার মতে, ইরান পারমাণবিক শক্তিধর হলে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারত।

মধ্যপ্রাচ্যে দূত পাঠাচ্ছে চীন : ইরানের সামরিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন। দেশটি বলছে, যুদ্ধ বা শক্তি প্রয়োগ করে কোনো বিরোধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিশেষ দূত ঝাই জুনকে পাঠাচ্ছে বেইজিং। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানান, ইতিমধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রাশিয়া, ইরান, ওমান, ফ্রান্স, ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। ওয়াং ই সব পক্ষকে দ্রুত বৈঠক ও আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সব দেশকে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলা এবং বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করা এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শাসন পরিবর্তন করার প্রচেষ্টাকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছে চীন।