পবিত্র রমজান মাস অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে রমজান মাসে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করা হলো।
ওহি নাজিল : নবুয়তের প্রথম বছরের রমজান মাসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহি নাজিল শুরু হয়। মহান আল্লাহ তার সৃষ্টিজগৎকে সম্মানিত করার ইচ্ছা পোষণ করেন, তাই তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার ঐশী নুর, হেকমত এবং তার বাণীর অবতরণস্থল হিসেবে নির্বাচিত করেন। এর মাধ্যমে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার পথ সুগম হয়। ফলে এই ঘটনাটি মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল : নবুয়তের দশম বছরের রমজান মাসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রথম স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। তিনি প্রথম মুসলিম নারী এবং নবীজির সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন। শিয়াবে আবি তালিবের কঠিন অবরোধের সময় তার সমর্থন ও ধৈর্য ছিল অপরিসীম। তার ইন্তেকালের একই বছরে আবু তালিবও ইন্তেকাল করেন, যা নবীজির জন্য আমুল হুজন (দুঃখের বছর) নামে পরিচিত।
আজানের প্রবর্তন : হিজরি প্রথম বছরের রমজান মাসে নামাজের জন্য আজানের বিধান প্রবর্তিত হয়, তবে আরেক বর্ণনায় রবিউল আউয়াল মাসের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেই সময়ে মুমিনদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঠিক সময় জানা কঠিন ছিল, তাই তারা এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেন। সেই রাতে আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলেন, যিনি তাকে আজানের শব্দাবলি ও পদ্ধতি শিখিয়ে দিচ্ছেন। সকালে তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে স্বপ্নের কথা জানালেন। তিনি বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ, এটি একটি সত্য স্বপ্ন। তুমি বেলালের সঙ্গে দাঁড়াও এবং যা দেখেছ তা তাকে বলে দাও, যেন সে আজান দেয়, কারণ তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে বেশি উচ্চ ও সুমধুর।’ (তিরমিজি ১৮৯) সেই মুহূর্ত থেকে আজ অবধি বিশ্বের প্রতিটি মসজিদে নামাজের জন্য আজান ধ্বনিত হয়ে আসছে।
বদর যুদ্ধ : হিজরি দ্বিতীয় সালের ১৭ রমজান ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং আবু জাহেলের নেতৃত্বে মক্কার মুশরিকদের মধ্যে এই যুদ্ধ হয়। মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম যোদ্ধা কুরাইশদের হাজারেরও বেশি সেনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অসাধারণ বিজয় অর্জন করেন। আবু জাহেলসহ কুরাইশদের অধিকাংশ নেতার নিধন হয় এই যুদ্ধে।
এই বিজয়ের ফলে মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেন, যা কুরাইশদের মনে তাদের প্রতি সমীহ ও ভীতি তৈরি করে। এই যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত গনিমত মুসলমানদের সচ্ছলতা আনে এবং ইসলামী পতাকাকে সমুন্নত করে সত্যের বাণীকে আজ অবধি দেদীপ্যমান রাখতে সহায়তা করে।
মক্কা বিজয় : হিজরি অষ্টম সালের রমজান মাসে ইতিহাস এক অনন্য ঘটনার সাক্ষী হয়। কুরাইশরা হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করায় মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয়ের জন্য দশ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন। এই বাহিনী মক্কায় পৌঁছলে কোনো রক্তপাত বা যুদ্ধ ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে শহরটি জয় করে। এই মহান বিজয়ের ফলে মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং মক্কার কুরাইশদের আধিপত্যের অবসান ঘটে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার বাহিনীর ক্ষমা ও মহানুভবতা দেখে মক্কাবাসীরা মুগ্ধ হন এবং দলে দলে লোক ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করেন।
কাদেসিয়া যুদ্ধ : হিজরি ১৫ সালের রমজান মাসে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কাদেসিয়া যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। এই যুদ্ধে পারস্যের রাজধানী মাদাইনের পথ উন্মুক্ত হয় এবং ইরাক অঞ্চলে ইসলামের প্রসার ঘটে। এটি রমজানে মুসলিমদের অসাধারণ সাহস ও ইমানের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর ইন্তেকাল : হিজরি ২১ সালের ১৮ রমজান ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক সেনাপতি হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ইন্তেকাল করেন। তিনি ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ইরাক ও সিরিয়া বিজয়ে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইয়ারমুক যুদ্ধসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নিয়েও তিনি কখনো পরাজিত হননি।
আলী (রা.)-এর শাহাদাত : হিজরি ৪০ সালের ২১ রমজান চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) কুফায় ফজরের নামাজের সময় খারিজি ইবনে মুলজামের বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই ও জামাতা ছিলেন।
আন্দালুস (স্পেন) বিজয় : হিজরি ৯২ সালের রমজান মাসে মুসলমানরা আন্দালুস জয় করে। এরপর সেখানে প্রায় আটশ বছর মুসলিমরা শাসন করে। এই অভিযানের সূচনা হয় যখন মুসা বিন নুসায়ের আন্দালুস বিজয়ের লক্ষ্যে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান। তারা একটি প্রণালি পার হয়ে সেখানে পৌঁছান, যা পরবর্তী সময় তারিক বিন জিয়াদের নামানুসারে ‘জিব্রাল্টার প্রণালি’ (জাবাল আল-তারিক) নামে পরিচিতি পায়। উপকূলে পৌঁছানোর পর তারিক বিন জিয়াদ নিজের বাহিনীর সমস্ত জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে কারও মনে পিছু হটার চিন্তা না আসে। এরপর তিনি এক তেজোদীপ্ত ভাষণ দেন, যা সৈন্যদের মনোবল তুঙ্গে নিয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে তারা দক্ষিণ আন্দালুসে গথ বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং পর্যায়ক্রমে সেভিল ও টলেডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো জয় করে বর্তমান স্পেন ও পর্তুগালের প্রায় পুরো ভূখণ্ডে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
সিন্ধু বিজয় : হিজরি ৯৩ সালের ৬ রমজান মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং হিন্দু রাজা দাহিরের বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই ভয়াবহ যুদ্ধে ভারতীয় রাজকীয় হাতিগুলো অংশ নিয়েছিল এবং টানা পাঁচ দিন ধরে যুদ্ধ চলে। অবশেষে রাজা দাহির নিহত হলে সিন্ধু বিজয় সম্পন্ন হয়। এই বিজয়ের মাধ্যমেই মূলত মুসলমানদের জন্য এ অঞ্চলের প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।
হিত্তিনের যুদ্ধ : হিজরি ৫৮৩ সালের ২৬শ রমজান দখলদার ক্রুসেডার বাহিনী এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনের নাসেরা ও তাবারিয়া শহরের মধ্যবর্তী হিত্তিন গ্রাম ছিল এই চিরস্মরণীয় যুদ্ধের রণক্ষেত্র। এই যুদ্ধে মুসলমানরা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেন। এর ফলে দখলদারদের পতন ঘটে, পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার হয় এবং পূর্বে ক্রুসেডারদের দখলে থাকা অধিকাংশ ভূখণ্ড মুক্ত করা সম্ভব হয়। এই বিজয়ের খবর ইউরোপীয়দের মনে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল, যার প্রতিক্রিয়ায় তারা বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে এবং জেরুজালেমের মুসলমানদের ওপর পুনরায় নৃশংস আক্রমণ শুরু করে।
আইনে জালুত যুদ্ধ : হিজরি ৬৫৮ সালের ১৫ রমজান, শুক্রবার সকালে ফিলিস্তিনের বিসান ও নাবলুসের মধ্যবর্তী ‘আইনে জালুত’ গ্রামে মুসলিম বাহিনী ও মঙ্গোলদের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মিসরের মামলুক সুলতান কুতুজ এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি উচ্চকণ্ঠে ‘ওয়া ইসলামাহ!’ (হায় ইসলাম!) বলে আর্তনাদ করে সৈন্যদের উদ্বুদ্ধ করেন এবং মঙ্গোলদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মঙ্গোলরা প্রাণভয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে যায়। এই বিজয়ের ফলে মিসর ও শাম (সিরিয়া অঞ্চল) একত্রিত হয় এবং ইসলাম ও মুসলমানরা মঙ্গোলদের পৈশাচিক বর্বরতা থেকে রক্ষা পায়।
এ ছাড়াও পহেলা রমজানে মিসরের ইসলামী বিজয়, প্রসিদ্ধ স্কলার ইবনে সিনার ইন্তেকাল, দ্বিতীয় রমজানে আলজেরিয়া বিজয়, বালাতুশ শুহাদা যুদ্ধ, ৭ রমজানে আল-আজহার মসজিদের উদ্বোধন, ১২ রমজানে প্রখ্যাত আলেম ইবনে জাওজির ইন্তেকালসহ আরও বহু ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী রমজান মাস।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, রমজানে আল্লাহর সাহায্য, বিজয় এবং ত্যাগের অসংখ্য নজির রয়েছে। রোজা আমাদের শারীরিকভাবে দুর্বল করলেও আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করে, যেমনটা ইতিহাসের এই ঘটনাবলিতে দেখা যায়। আল্লাহ আমাদের সকলকে রমজানের বরকত লাভের তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক