দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে খালাসের অপেক্ষায় বছরের পর বছর পড়ে আছে ভারত থেকে আমদানি করা কয়েক কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের পণ্য। আইনি জটিলতায় এসব পণ্য নিলাম না হওয়ায় সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব। একই সঙ্গে পণ্যগুলো গুদাম দখল করে পড়ে থাকায় মাশুল আদায় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। দ্রুতই পড়ে থাকা এসব পণ্য নিলাম দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
পানামা হিলি পোর্ট লিংক লিমিটেড কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বন্দরের ৪টি ওয়্যার হাউজ ও ওপেন ইয়ার্ড শেডে বিভিন্ন পণ্য আটকা পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে থ্রিপিস ১টন ২৯০ কেজি, মোটরসাইকেল পার্টস ৪শ কেজি, আঠা ১১টন, ইয়ার্ন ১টন ১১৪ কেজি, ডেঙ্গু কিট ৭২ কেজি, আয়রন স্ক্রাপ ২টন ৯৩০ কেজি, চাল ১২১ টন, পলিশিং স্টোন ১৪ টন ২০১ কেজি, সুপারি কাটার মেশিনসহ অন্যান্য ৩১ টন ৬শ কেজি, টাইলস ৩ টন ২৫০ কেজি, বিটলবন ৪৯ টন ৩৭১ কেজি, মেডিকেল ইকুইমেন্ট ২ টন ৯০৮ কেজি, চায়না ক্লে ৩০ টন ১শ কেজি, ডেঙ্গু কিট ৩০ কেজি, স্প্রিং ২ ৩টন ৫৯৬ কেজি, পাটবীজ ১৩টন, পোলট্রি হ্যাচারি প্রিমিক্স ৫শ টন। এসব পণ্যের মধ্যে অনেক পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় আনার কারণে কাস্টমস জব্দ করে রেখেছে। আবার অনেক পণ্য বাড়তি শুল্কের কারণে আমদানিকারকরা ছাড়করণ নেননি।
সিআ্যন্ডএফ এজেন্ট সিরাজুল ইসলাম বলেন, মাল আসার পর দেখা যাচ্ছে পার্টি বলে মাল নেবে, কাস্টমস বলে মাল আনলোড করতে হবে। আনলোড করার পর লোড দিতে হবে বাংলাদেশের গাড়িতে। তো আনলোড যে করব গুদামে, কিন্তু সেখানে তো জায়গা নেই। অনেক পণ্য দীর্ঘদিন ধরে আটকা পড়ে থাকায় অল্প জায়গার মধ্যে কাজ করতে হয়। এখন দেখা যাচ্ছে যে গাড়ি নামানোর ক্যাপাসিটি নেই, বর্তমানে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে যেগুলো নামানোর কোনো ক্যাপাসিটি নেই।
সিআ্যন্ডএফ এজেন্ট আব্দুর রহিম বলেন, আগের যে মালগুলো আছে সেই মালগুলো যদি অকশন বা নিলামের মাধ্যমে গুদামগুলো থেকে সরিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে আশা করা যায় গুদামে জায়গা হবে। যে পরিমাণ জায়গা আছে সেই পরিমাণ জায়গাতেই এই মালের কাজ আরামে করা যাবে। মালগুলো তাড়াতাড়ি অকশনে যদি সেল করে দেয় তবে তাড়াতাড়ি গুদামটা খালি হয়ে যায়। তাহলে অন্য মাল ঢোকার জায়গা হবে আরকি।
হিলি স্থলবন্দরের সিআ্যন্ডএফ এজেন্ট জাবেদ হোসেন রাসেল বলেন, বন্দরের ওয়্যারহাউজে ও ওপেন ইয়ার্ড শেডে বেশ কিছুদিন ধরে অনেক পণ্য পড়ে আছে। এটা তো আমাদের বন্দরের জায়গা নিয়ে রাখছে, এটা একটা বড় সমস্যা। এর কারণে আমাদের অনেক আমদানিকৃত পণ্য বন্দরের ওয়্যার হাউজে রাখার জায়গা পাচ্ছি না। হচ্ছে যেসব মাল দুই-চার-পাঁচ বছর পোর্টে রয়ে যাচ্ছে, সেই মালগুলোর ডেট এক্সপায়ার হয়ে যাচ্ছে। সেটা না দেশের কাজে লাগছে, না আমদানিকারকদের কাজে লাগছে। সম্পূর্ণ টাকাটাই আমাদের অপচয় হয়ে যাচ্ছে। তো এই ব্যাপারে যদি সরকার ওয়েস্টেজের দিকে না গিয়ে ইমপ্লিমেন্টেশন কীভাবে করা যাবে, কীভাবে ভালো হবে এই দিকে যদি নজর দিত তাহলে সবারই উপকার হতো।
পানামা হিলি পোর্ট লিংক লিমিটেডের গুদাম কর্মকর্তা শংকর নারায়ণ সাহা বলেন, বন্দরের ৪টি ওয়্যারহাউজ ও ওপেন ইয়ার্ডে বেশ কিছু মালামাল দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। যার কারণে বন্দরে পণ্য রাখার জন্য জায়গার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অনেক পার্টিকে আমরা পণ্য রাখার জন্য জায়গা দিতে পারি না, এসব পণ্যের কারণে নানাবিধ সমস্যা এখানে। এতে সরকারের যেমন রাজস্ব আহরণে ক্ষতি হচ্ছে তেমনি বন্দরের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এই মালামালগুলো যদি এখান থেকে সরানো যায়, তাহলে আমরা অনেকটা পার্টিকে সুবিধা দিতে পারব। এ বিষয়ে কাস্টমসকে একাধিকবার বিভিন্ন সময় চিঠি দ্বারা, মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু তারা এ বিষয়ে কোনো রকম কোনো আগ্রহ দেখায় না। অকশনের মাধ্যমে যে মালগুলো দিয়ে সরকারের কিছু রাজস্ব বা রেভিনিউ আদায় হবে, এ বিষয়ে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকারের রাজস্ব আহরণ যেমন বাড়বে তেমিন বন্দরেরও অনেক মাশুল আদায় করতে পারব। পাশাপাশি ব্যবসায়িকদের একটা সুন্দর পরিবেশও তৈরি হবে।
রংপুর কাস্টমস এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার সফিউর রহমান বলেন, নিলামযোগ্য পণ্যসহ এবং ধ্বংসযোগ্য পণ্যসহ আমাদের এই কমিশনারেটে টোটাল ১৫টা গোডাউন আছে। কিছু কিছু আমাদের নিজস্ব গোডাউন আছে, কিছু কিছু আছে বিভিন্ন পোর্টের যেমন প্রাইভেট পোর্ট আছে পানামা পোর্ট ওদের গোডাউন আছে। আমরা ইতিমধ্যে একটা মিটিং করেছি যে এগুলোকে ইনভেন্টরি করা আছে কিনা, তালিকা করা আছে কিনা। ইতিমধ্যে আমরা সেই তালিকা পেয়ে গেছি। আমরা আশা করছি এই প্রক্রিয়া শুরু করে আমাদের নিলামের এবং ধ্বংসের পুরো প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে ঈদের পরেই। তার আগে আমাদের কিছু টাইম লিমিট আছে যেমন পত্রিকায় অ্যাড দেওয়ার পরে ১৫ দিন সময় দিতে হবে বিডারদের প্রিপারেশনের জন্য বা পণ্য ভিজিট করার জন্য। সেগুলোসহ আমরা আশা করছি ঈদের পরেই যে ধ্বংস হবে যেগুলো ধ্বংসযোগ্যÑ আর যেগুলো নিলামযোগ্য নিলামের কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে।