হিলি বন্দর সমস্যা

‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোটো সে তরী/ আমারই সোনার ধানে গিয়াছে ভরি...’ হিলি স্থলবন্দরের গুদামগুলোর অবস্থা অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতার ওই পঙ্ক্তির মতো। দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে খালাসের অপেক্ষায় বছরের পর বছর পড়ে আছে ভারত থেকে আমদানি করা কয়েক কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের পণ্য। আইনি জটিলতার কারণে, ওই সব পণ্য নিলামে তোলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে গুদাম দখল করে রেখেছে ওই পণ্য। নতুন আসা পণ্য, গুদামে ঠাঁই পাচ্ছে না। খোলা আকাশের নিচে শেডে জমে আছে অনেক অখালাসকৃত পণ্য। সিএনএফ এজেন্ট ও বন্দর কর্র্তৃপক্ষ এই সংকটে প্রায় দিশেহারা। আমদানিকারকরা যেসব কারণ দেখিয়ে মাল ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে না, সেটা কাস্টমস এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন। অনেক পণ্য গুদামে পড়ে আছে যেগুলো ৩-৫ বছর আগে আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে যেন কমিশনারের মাথাব্যথা নেই। অতিসম্প্রতি কমিশনার বলেছেন, নিলাম ও ধ্বংসযোগ্য পণ্য যাচাই হচ্ছে। ঈদের পরেই এই সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, হিলি কমিশনারেটে সব মিলিয়ে ১৫টি গুদাম আছে। সব গুদামই পণ্যে ভরা। হিলি পোর্ট অথরিটির কিছু গুদামের পাশাপাশি কিছু প্রাইভেট গুদামও আছে। এসব গুদাম ভর্তি পণ্য থাকার পরও কর্র্তৃপক্ষ আমদানিকারকদের খালাসের তাগাদা দিয়েছেন কি না, সে তথ্য নেই।

আমদানিকারকরা যদি যথাসময়ে পণ্য খালাস না করে, কেবল ডেমারেজ দিলেই কি এই সমস্যার সমাধান হবে? না, হবে না। বিগত পাঁচ বছরে হিলি কাস্টমস কমিশনারেট কেন পণ্য খালাস করতে পারেনি বা নিলাম করতে পারেনি, তার জবাবদিহি করতে হবে। আইনি জটিলতা বলে যে টার্ম ব্যবহার করা হয়, তার সমাধানের পথও খোলা আছে। সে পথে কেন তারা যায়নি? এ সমস্যা কেবল হিলি স্থলবন্দরের নয়, সব স্থলবন্দর ও নৌবন্দরগুলোতেও কমবেশি বিদ্যমান। ভুয়া ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি করা হলে সঙ্গে সঙ্গে সেই পণ্য নিলাম করা উচিত। কর-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে আইনি প্রক্রিয়াকে সহজ ও দ্রুত করার নিয়ম। কিন্তু দেখা যায়, বছরের পর বছর ওই শ্রেণির পণ্য পড়ে থাকছে। আবার কিছু আমদানিকারক আছে, যারা ভুয়া ঘোষণার মাধ্যমে পণ্য আনার পর ঘুষ দেওয়ার বিনিময়ে ছাড় করিয়ে নেয়। কেউ কেউ নামমাত্র দামে নিলামে কিনে নেয়, তারই আমদানি করা পণ্য। অসৎ কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশেই এমনটা হচ্ছে। কাস্টমসের কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নিলেই জানা যাবে তাদের অনৈতিক কাজের পাহাড় কতটা জমেছে। কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটের সব শ্রেণির কর্মকর্তাদের নৈতিক অধঃপতন এতটাই প্রকাশ্যে চলে যে, তারা সরকারের রাজস্ব আদায়ের চেয়ে ব্যক্তিগত আয়ের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন। তাদের এই ওপেনসিক্রেট ঘুষ বাণিজ্যের টুঁটি চেপে ধরলে সরকার তার রাজস্ব বাজেটের সিংহভাগ অর্জন করতে পারবে।

কয়েক বছর আগে কোরবানি ঈদের সময় আমরা ‘ছাগলকান্ডে’র হোতা হিসেবে পেয়েছিলাম একজন কাস্টমস অফিসারকে। তার আয়সূত্র ধরেই সরকার ও জনগণ জেনে যায়, কতটা অসততার সঙ্গে তিনি এবং তার সহকর্মীরা সরকারের রাজস্ব ভোগদখল করে নিয়েছেন। রাজস্ব সেক্টরের ঘুষ-দুর্নীতি সর্বজনবিদিত। সরকারের প্রতিটি রাজস্বসংক্রান্ত অফিসের লোকেরা ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। প্রশাসনের আমলারা এ ক্ষেত্রেই কেবল নয়, তাদের অসততার জন্যই দেশে উন্নতির গতি বাড়ে না। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর একটি সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে। প্রচলিত ধারায় কাজ করে, জনগণকে আর সেবা দেওয়া যাবে না। কর্মকর্তাদের সৎ হতে হবে। অসৎ হলে চাকরিচ্যুতিই কেবল নয়, জেল-জরিমানাও জুটবে। তারা হেয় হবেন সমাজের চোখে। অন্যায় ও দুর্নীতির পথ পরিহার করাই হবে শ্রেয়।