মানবজাতির জন্য আল্লাহর সর্বশেষ ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা ইসলাম। এই দীনের মূল উৎস হলো পবিত্র কোরআন, যা মহান আল্লাহর কালাম এবং মানবতার জন্য হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। কোরআনের সঙ্গে একজন মুমিনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তেলাওয়াতের মাধ্যমে। কোরআন তেলাওয়াত এক মহান ইবাদত, যা অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, জীবনকে আলোকিত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ সুগম করে। কোরআন ও হাদিসে তেলাওয়াতের গুরুত্ব ও ফজিলত এত ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, এটি মুমিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তেলাওয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য : তেলাওয়াত শব্দের অর্থ অনুসরণসহ পাঠ করা। অর্থাৎ কোরআন শুধু মুখে পাঠ করাই তেলাওয়াত নয়, বরং বুঝে, হৃদয়ে ধারণ করে এবং জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করাও তেলাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত। তেলাওয়াতের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর বাণীর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয় এবং তার ইমান দৃঢ় হয়।
কোরআনের আলোকে তেলাওয়াতের গুরুত্ব : পবিত্র কোরআনে বারবার তেলাওয়াতের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যা রিজিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করে যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’ (সুরা ফাতির ২৯) এই আয়াতে তেলাওয়াতকে এমন এক আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা কখনো লোকসানের কারণ হয় না, বরং চিরস্থায়ী লাভের পথ খুলে দেয়। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন পথনির্দেশ করে সেই পথে, যা সবচেয়ে সরল।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৯)
তেলাওয়াতে অন্তরের প্রশান্তি : কোরআন তেলাওয়াত মানুষের অন্তরে প্রশান্তি ও স্বস্তি এনে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ ২৮) কোরআন তেলাওয়াত হলো আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির। যে ব্যক্তি নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করে, তার অন্তরে দুশ্চিন্তা, হতাশা ও অস্থিরতা কমে যায় এবং ইমানি শান্তি নেমে আসে।
হাদিসের আলোকে তেলাওয়াতের ফজিলত : হাদিসে কোরআন তেলাওয়াতের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোরআনের সঙ্গে সম্পর্কই একজন মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে। আরেক হাদিসে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআনের একটি অক্ষর তেলাওয়াত করে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে, আর একটি নেকি দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়।’ (সুনানে তিরমিজি) এ থেকে স্পষ্ট হয়, কোরআন তেলাওয়াতের সওয়াব সীমাহীন।
পরকালে কোরআনের সুপারিশ : যারা কোরআন তেলাওয়াত করে কেয়ামতের দিন কোরআন তাদের জন্য সুপারিশ করবে। হাদিসে এসেছে, ‘কোরআন পড়ো। কেননা কেয়ামতের দিন তা তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে।’ (সহিহ মুসলিম) এই সুপারিশ একজন মুমিনের মুক্তি ও জান্নাত লাভের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কোরআন তেলাওয়াতে মর্যাদা বৃদ্ধি : যে ব্যক্তি নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করে এবং তা মুখস্থ রাখে, আল্লাহ তাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেন। হাদিসে এসেছে, ‘কোরআনের অধিকারীকে বলা হবে, পড়ো এবং উঠতে থাকো, দুনিয়াতে যেমন তেলাওয়াত করতে, তেমনই পড়ো। তোমার মর্যাদা হবে শেষ আয়াতের কাছে।’ (আবু দাউদ) এ হাদিস প্রমাণ করে, জান্নাতে মানুষের মর্যাদা কোরআনের সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।
তেলাওয়াত ও আত্মশুদ্ধি : নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে। এটি গুনাহ থেকে বিরত রাখে, তওবার প্রতি উৎসাহিত করে এবং আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে। কোরআন অন্তরের রোগ যেমন হিংসা, অহংকার ও লোভ দূর করে। আল্লাহ বলেন, ‘এই কোরআন মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৮২)
লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদ্রাসা, গাজীপুর