নারীর ক্ষমতায়নের প্রকল্প দিয়েই সরকারের শুরু

‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার : সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’ এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নারীদের নিয়ে নতুন সরকারের ভাবনা কী, এ ব্যাপারে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন নারী ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাপসী রাবেয়া আঁখি

প্রশ্ন : প্রায় ২০ বছর পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি নারীদের নিয়ে নতুন কী ভাবছে?

উত্তর : নারীদের সামাজিকভাবে, পারিবারিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে চাই আমরা। নারীদের যদি সত্যিকার অর্থে ক্ষমতায়িত করা হয়, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল করা হয়, তাহলে সেই পরিবারটি শক্তিশালী পারিবারিক কাঠামো নিয়ে গড়ে উঠে বলে বিশ্বাস করি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নারী শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফ্রি অব কস্ট এডুকেশন, ফ্রি অব কস্ট বই পাওয়া, তারপর মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, উপবৃত্তি এই নামগুলোর সঙ্গে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও বিএনপির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ১২ ফেব্রুয়ারি আবারও জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে বিএনপি দেশ সেবার সুযোগ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতেই অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ফ্যামিল কার্ড চালু করছেন।

কার্ডটি এমন যে, প্রত্যেক পরিবারকে কার্ড দেওয়া হচ্ছে পরিবারের প্রধান নারীর নামে। এতে প্রমাণিত হয় সরকার নারীদের কতটা গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেছে। পরিবারের সব তথ্য থাকবে ওই কার্ডে। ফলে শুরুতেই নারীর ক্ষমতায়নের একটি প্রকল্প দিয়ে সরকার তার যাত্রা শুরু করল।

প্রশ্ন : এবারের নারী দিবস উপলক্ষে বিশেষ কোনো কাজ করছেন?

উত্তর : ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও থানায় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে করে দ্রুত নারী নির্যাতন বা নারীদের ওপর সহিংসতা অ্যাড্রেস করা যাবে এবং সেবা ও আইনি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

প্রশ্ন : গত কয়েক দিনে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার বেশ কয়েকটি ঘটনা এসেছে, সেগুলো নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য কী?

উত্তর : ক্রিমিনাল কেস হিসেবে এই ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখভাল করছে। তারপরও নারীদের ওপর কিছু জায়গায় নির্যাতনের ঘটনায় সেগুলো যাতে দ্রুত আইনের আওতায় আনা যায় সেই উদ্যোগ নিতে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। প্রত্যেকটা কেস সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে। দুটি মন্ত্রণালয় নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এসব দেখভাল করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আমরা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে আক্রান্তদের পাশে আছি। প্রতিটি ঘটনায় আসামিদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ভিকটিম পরিবারের সঙ্গেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

প্রশ্ন : নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী করতে নতুন কর্মসংস্থান নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে?

উত্তর : নারীদের সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল করতে আমরা একটা কাজ করার চিন্তা করছি। গ্রাম বা শহরে যারা কম শিক্ষিত বা সামান্য শিক্ষিত তাদের ডে-কেয়ার পরিচালনা, শিশু রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণ, কেয়ারগিভার হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রমবাজারে প্রতিযোগী করে তুলব। তাতে করে ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত নারীদের এমপ্লয়মেন্ট করার সুযোগ দেওয়া যাবে। পাশাপাশি ডে-কেয়ারগুলো ট্রেইন্ড পারসন দিয়ে পরিচালিত হবে। ফলে সেন্টাগুলোতে থাকা শিশুরা সঠিক পদ্ধতিতে যতœ ও সেবা পাবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা নিজের বাচ্চার মতো করেই তাদের যত্ন নেবে।

প্রশ্ন : এখনো বাল্যবিবাহ প্রচলিত, কেন?

উত্তর : কোনো কোনো জায়গায় স্টিগমার জন্য আর্লি এজে বিয়ে দিয়ে দেয়, এটা বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা কোনোভাবেই নারীদের নিগৃহীত হতে দিতে চাই না। সামাজিকভাবে বাল্যবিবাহ বন্ধ করার আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এটা বন্ধে ভিজিল্যান্স ও মনিটরিং বাড়ানো হবে। সচেতনতা বাড়িয়ে এটা কমানো সম্ভব।

প্রশ্ন : সামাজিক হয়রানি প্রতিরোধে কী করবেন?

উত্তর : আমাদের মেয়েরা যাতে নির্বিঘ্নে স্কুলে যেতে পারে, তারা যাতে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে, রাস্তাঘাটে, প্রতিষ্ঠানে, কর্মস্থলে সহকর্মী বা অন্য কারও দ্বারা হেনস্তা না হয়, যৌন হয়রানি না হয়, অপ্রত্যাশিত কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন না হয় সে জন্য সচেতনতা বাড়ানো জন্য প্রচারণামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। নারীদের প্রতি সম্মান ও হিউম্যানিটি বাড়াতে, নারীদের ভ্যালুজ বোঝাতে জনসচেতনাতামূলক কর্মকান্ডে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম একটা ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষের রাইটস অ্যান্ড প্রিভিলিজ বাড়াতে করণীয় তুলে ধরতে গণমাধ্যম কাজ করতে পারে। অপিনিয়ন বিল্ড আপ করতে পারে। এবারে নারী দিবসের প্রতিপাদ্য আমরা যদি জাস্টিস ও ইক্যুইলিটি এনশিউর করতে পারি, আমরা যদি প্রপারলি যেসব নারীরা অত্যাচারিত হয় তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি, তবে নারীদের এগিয়ে আসা সহজ হবে।

প্রশ্ন : নারী দিবস কী শুধুই উদযাপনের?

উত্তর : আন্তর্জাতিক নারী দিবস হয়তো সারা বিশ্বে উদযাপিত হয় এটাকে উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নে অর্থাৎ নারীর প্রতি যে মমত্ববোধ অথবা যে রেসপেক্ট অথবা নারীর যে অধিকার এটার প্রতি সবাইকে সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্রকে যেমন সচেতনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষকেও এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। সামাজিকভাবে স্কুল-কলেজ, কর্মস্থলে নারীর প্রতি যে সম্মান সেটা যদি আমরা দেখাতে পারি তাহলে একজন শিক্ষিত মানসিকভাবে পরিবারের প্রতি আরও যতœশীল হবে। আমরা যে বলি আগামীর প্রজন্মকে আমরা এমনভাবে গড়ত চাই, যারা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকবে সেই প্রজন্ম গড়তে একজন আগামীর বাংলাদেশ অর্থাৎ একটি বৈষ্যমহীন সমাজ ব্যবস্থার কথা বলছি সেটি বাস্তবায়নে পারিবারিক শান্তি, সন্তুষ্টির লেভেল বাড়ানো যায় বিশেষ করে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তার কন্ট্রিবিউশন এটা যদি একনলেজ করা যায়, তাহলে একজন নারী সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারবে। সবার প্রতি জাস্টিস ও ইকুইলিটি এটা এনশিউর করতে পারলে বিশেষ করে যে নারীরা অফিস করছে, বাসায় কাজ করছে, বাচ্চার টেককেয়ার করতেছে, পুরুষের চেয়ে তারা অনেক বেশি কাজ করছে। এই জিনিস যদি একনলেজ করি সেটা যদি ভার্বালিও হয় তাহলেও সমাজে বড় পরিবর্তন আসবে। আমরা নারীদের অবদান একনলেজ করে কথাবার্তা চালচলনে সেটা যদি প্রকাশ করি তাতেও সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি হয়। এতে দেশ এগিয়ে যাবে।

প্রশ্ন : উপবৃত্তির মতো কোনো নতুন প্রকল্প নিয়ে ভাবছেন?

উত্তর : সব শিক্ষা নিয়ে কাজ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা নতুন করে পরিকল্পনা ঘুছাবে। তবে নারী শিশু ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমরা বিশেষ করে অল্প শিক্ষিত মায়েদের জন্য পরিকল্পনা করছি। প্ল্যানিং আছে কেয়ারগিভার হিসেবে তাদের প্রশিক্ষিত ম্যানপাওয়ার হিসেবে তৈরি করার প্রকল্প নেব। যদি তা পারা যায় তাহলে শ্রমবাজারে চাহিদা তৈরি হবে। দেশে-বিদেশে এ ধরনের প্রচুর ট্রেইনড ম্যানপাওয়ারের প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে নারীরা ভালো করে। ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে তাদের যদি স্কিলড বা হাফ স্কিলিডও করতে পারি তাহলেও কর্মসংস্থান হবে। এডুকেশনে হেল্পের প্রয়োজন হলে আমরা আলদা করে হেল্প করব। নারীদের পুষ্টি নিশ্চিতে সহায়তা করা হবে। গর্ভবর্তী মায়েদের নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট সহায়তা দেওয়া হবে। প্রবীণ নারীদের জন্য ওল্ডহোম চাহিদার তুলনায় অনেক কম। চাহিদা প্রচুর। ওল্ডহোম করে তাদের টেককেয়ারে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের এতিমখানা আছে। এতিমদের পড়াশোনা করানো, পুষ্টি, বয়ঃসন্দিক্ষণে তাদের সাপোর্ট দেওয়া হবে। এতিমখানায় থাকা মেয়েদের নির্দিষ্ট বয়সের পরও পড়াশোনায় সহায়তা দেওয়া ও ফলোআপ করা হবে। কর্মজীবী মহিলাদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য হোস্টেল বাড়ানো হবে এবং সেখানে কর্মজীবী মা-মেয়েরা নিরাপত্তা সহকারে যাতে অবস্থান করতে পারে এটাও আমাদের খেয়াল থাকবে।

প্রশ্ন : মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকরা সহিংসতার শিকার হয়ে প্রায়ই ফিরে আসে, তাদের নিয়ে কী ভাবছেন?

উত্তর : বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় দেখভাল করে। তারপরও কয়েকটা সংস্থা এটা দেখে। তবে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় যারা পাচারের মাধ্যমে বিদেশ গিয়ে ফিরে আসে তাদের পুনর্বাসনের জন্য ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের পরিকল্পনা নেবে।

প্রশ্ন : দুর্যোগে নারীর ভোগান্তি নিয়ে ভাবনা কী?

উত্তর : দুর্যোগে মায়েরা কিন্তু সম্পদ নয়, সন্তান নিয়ে বেশি চিন্তা করে। তাই তারা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাবা নিজের সম্পদ রক্ষা করতে চায়। এটা একটা কালেকটিভ অ্যাপ্রোচ। এক্ষেত্রে দুর্যোগের আগে সবাইকে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া বাড়াতে হবে। মায়েদের বা মেয়েদের যেকোনো ইনজুরিতে যে ধরনের ইনজাস্টিস হয় সেক্ষেত্রে হসপিটালগুলোতে অগ্রাধিকার দিয়ে নারীদের ভর্তি করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করারও পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।

প্রশ্ন : অর্ধেক সংখ্যক নারী ভোটার নিয়ে কিছু বলেন?

উত্তর : নারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে, নারীর ক্ষমতায়ন হলে আসলে দেশেরই মঙ্গল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মঙ্গল। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাব।